সায়েম চৌধুরী ওরফে বাবু: সংগঠন, সংগ্রাম ও সেবার রাজনীতি
নতুন পয়গাম, এম নাজমুস সাহাদাত, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬:
মালদার রাজনৈতিক আঙিনায় এক পরিচিত নাম সায়েম চৌধুরী। তবে অধিকাংশ মানুষ তাঁকে চেনেন ‘বাবু চৌধুরী’ নামেই। বয়স ৪৫। ঠিকানা কালিয়াচক-২ নম্বর ব্লকের মোথাবাড়ি। জাতীয় কংগ্রেস ছাত্র রাজনীতি থেকে শুরু করে জেলা রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তাঁর জীবনগাথা যেন এক দীর্ঘ, বাঁকবদলে ভরা রাজনৈতিক উপাখ্যান। কিন্তু এই গল্প কেবল দলীয় পদ-পদবীর নয়; এর ভেতরে আছে পারিবারিক ঐতিহ্য, সামাজিক দায়বদ্ধতা, মানবিক উদ্যোগ এবং সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনের এক নিরলস প্রচেষ্টা।
পরিবার থেকেই রাজনীতির পাঠঃ
বাবু চৌধুরীর রাজনৈতিক চেতনার বীজ বোনা হয়েছিল পারিবারিক পরিমণ্ডলেই। তাঁর দাদু আব্বাস আলী চৌধুরী ছিলেন এলাকায় সুপরিচিত রাজনৈতিক ও সমাজমনস্ক ব্যক্তিত্ব। এছাড়াও তিনি দারাসাতুল্লাহ মিয়াঁ নামেও পরিচয়। ১৯৫৩ সালে তিনি নিজ জমিদান ও খরচে প্রতিষ্ঠা করেন আব্বাসগঞ্জ হাই মাদ্রাসা—যা আজও স্থানীয় শিক্ষাব্যবস্থার এক গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। সেই সময়ের গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে ব্যক্তিগত উদ্যোগে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা ছিল সাহসী ও দূরদর্শী পদক্ষেপ। দাদুর পাশাপাশি কাকু হুমায়ূন চৌধুরীর সক্রিয় রাজনীতিও ছোটবেলা থেকেই সায়েমের মনে প্রভাব ফেলেছিল। বাড়ির আড্ডায় রাজনীতি, সমাজের সমস্যা, মানুষের দাবি এসব ছিল নিত্য আলোচনার বিষয়। ফলে রাজনীতি তাঁর কাছে কখনও দূরের কিছু ছিল না; বরং বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই এটি হয়ে ওঠে স্বাভাবিক আকর্ষণ।
তরুণ কর্মী থেকে ব্লক রাজনীতির মুখঃ
২০০৯ সালে পরিবারের উৎসাহে সায়েম চৌধুরীর আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক যাত্রা শুরু। সেই সময় রাজ্যের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ছিল পরিবর্তনের দোরগোড়ায়। গ্রামীণ এলাকায় নতুন নেতৃত্বের চাহিদা তৈরি হচ্ছিল। তরুণ সায়েম সেই সময় সংগঠনের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ২০১১ সালে মোথাবাড়ি বিধানসভার জন্ম এবং সায়েম চৌধুরীরা স্থানীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রার্থীর দাবি তুলেছিলেন সেই দাবি পূরণ না-হওয়ায় তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেন। তখন রাজ্যে পরিবর্তনের হাওয়া বইছে, আর সেই সময়েই তিনি নিজেকে প্রমাণের সুযোগ পান। মাঠে-ময়দানে সক্রিয়তা, সংগঠন গড়ে তোলা, কর্মীদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ এই সব কিছুর মাধ্যমে দ্রুতই তিনি হয়ে ওঠেন দলের ভরসাযোগ্য মুখ। ২০১৩ সালে জেলা পরিষদের প্রার্থী হিসেবে দায়িত্ব পান। একই সঙ্গে যুব তৃণমূল কংগ্রেসের কার্যকরী সভাপতি এবং কালিয়াচক-২ নম্বর ব্লকের সাধারণ সম্পাদক পদে আসীন হন। অল্প সময়ের মধ্যে এই উত্থান প্রমাণ করে, সংগঠনের ভেতরে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা কতটা দৃঢ় ছিল। ২০১৮ সালে কোর কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ব্লকের ন’টি অঞ্চল পঞ্চায়েত সমিতি ও দুটি জেলা পরিষদে দলীয় সাফল্য আনতে তিনি সক্রিয় ভূমিকা নেন। গ্রামভিত্তিক সংগঠন মজবুত করা, বুথ স্তরে কর্মীদের সক্রিয় রাখা এই কৌশলেই তিনি কাজ চালিয়ে যান।
ঝুঁকির রাজনীতি, আস্থার জয়ঃ
রাজনীতির পথে ২০২২ সাল ছিল বড় এক মোড়। দীর্ঘদিনের তৃণমূলের সঙ্গ ত্যাগ করে তিনি কংগ্রেসে যোগ দেন। এই সিদ্ধান্তে অনেকে বিস্মিত হয়েছিলেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেছিলেন, এটি ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ। কারণ ক্ষমতাসীন দল ছেড়ে বিরোধী শিবিরে যাওয়া মানেই অনিশ্চয়তার পথে হাঁটা।
কিন্তু বাবু চৌধুরী প্রকাশ্যে বলেন দল নয়, মানুষের জন্য কাজ করাই তাঁর লক্ষ্য। তাঁর বক্তব্য ছিল, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও সংগঠনের ভেতরের কিছু প্রশ্ন তাঁকে নতুন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে। ব্যক্তিগত সুবিধা নয়, বরং মানুষের আস্থা বজায় রাখাই তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ। এই সিদ্ধান্তের প্রকৃত মূল্যায়ন হয় ২০২৩ সালের জেলা পরিষদ নির্বাচনে। কংগ্রেসের টিকিটে জয়ী হয়ে তিনি প্রমাণ করেন, দলবদল সত্ত্বেও মানুষের আস্থা তাঁর ওপর অটুট। বর্তমানে তিনি মালদহ জেলা কংগ্রেস কমিটির সম্পাদক, কালিয়াচক-২ নম্বর ব্লকের কার্যকরী সভাপতি এবং বৈষ্ণবনগর বিধানসভার পর্যবেক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
আশ্রয়, সহায়তা ও দায়িত্বের অন্য গল্পঃ
বাবু চৌধুরীর পরিচয় শুধু দলীয় রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়। কোভিড-১৯ মহামারির সময় তাঁর ভূমিকা স্থানীয়দের কাছে বিশেষভাবে স্মরণীয়। ২০২০ সালের লকডাউনে বহু পরিযায়ী শ্রমিক যখন কর্মহীন হয়ে গ্রামে ফিরছিলেন, তখন তাঁদের জন্য থাকার ও খাওয়ার ব্যবস্থা করেন তিনি নিজ উদ্যোগে। ব্যক্তিগত অর্থ ও সংগঠনের সহযোগিতায় অস্থায়ী আশ্রয় ও খাদ্যসামগ্রী সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন রাজ্যে বাংলা ভাষাভাষী শ্রমিকদের হয়রানির অভিযোগ সামনে আসলে তিনি চালু করেন একটি টোল-ফ্রি সহায়তা নম্বর। বিপদে পড়া শ্রমিকরা ফোন করলেই প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এই উদ্যোগ তাঁকে কেবল রাজনৈতিক নেতা নয়, অভিভাবকের আসনে বসিয়েছে বহু পরিবারের কাছে। সবচেয়ে আলোচিত তাঁর আরেকটি পদক্ষেপ পাঁচজন অনাথ শিশুকে নিজের বাড়িতে আশ্রয় দেওয়া। তাঁদের পড়াশোনা, চিকিৎসা এবং ভবিষ্যৎ জীবনের দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়েছেন তিনি। স্থানীয় মানুষ বলেন, “রাজনীতির মঞ্চে অনেক কথা বলা হয়, কিন্তু নিজের ঘরে জায়গা করে দেওয়া বড় সাহসের কাজ।
দুর্যোগের সময় মাঠে থাকা এক মুখঃ
মালদহের ভৌগোলিক বাস্তবতায় বন্যা ও নদীভাঙন এক বড় সমস্যা। প্রতিবছর বহু পরিবার ঘরছাড়া হয়। বাবু চৌধুরী এই বিষয়টি নিয়ে বারবার প্রশাসনের উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন। নদীভাঙন রোধে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ, ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন ও দ্রুত ক্ষতিপূরণের দাবি তুলেছেন। দুর্যোগের সময় ত্রাণসামগ্রী বিতরণ, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির পাশে দাঁড়ানো এসব কাজেও তাঁকে সক্রিয় দেখা যায়। তাঁর বক্তব্য, প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করা সহজ নয়, কিন্তু প্রশাসনিক উদ্যোগ ও জনসচেতনতা থাকলে ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমানো যায়।
মোথাবাড়িতে ডিগ্রি কলেজের দাবিতে এক নেতৃত্বঃ
বাবু চৌধুরীর আগামী দিনের স্বপ্ন স্পষ্ট। তিনি চান মোথাবাড়িতে একটি ডিগ্রি কলেজ স্থাপন হোক। তাঁর যুক্তি, উচ্চশিক্ষার সুযোগের অভাবে বহু ছাত্রছাত্রী দূরে যেতে বাধ্য হয়, ফলে অনেকেই মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে দেয়। স্থানীয়ভাবে কলেজ হলে শিক্ষার হার বাড়বে, পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হবে। এছাড়া বুথ স্তর থেকে সংগঠনকে শক্ত ভিত্তি দেওয়া তাঁর রাজনৈতিক পরিকল্পনার অংশ। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও তৃণমূল পর্যায়ে নেতৃত্ব গড়ে তোলার ওপর জোর দিচ্ছেন তিনি। তাঁর মতে, রাজনীতি যদি মানুষের জীবন বদলাতে না পারে, তবে সেই রাজনীতির মূল্য নেই।
মানুষের দরজায় পৌঁছে যাওয়া রাজনীতিঃ
মোথাবাড়ি ও আশপাশের এলাকায় তাঁর জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ সহজপ্রাপ্যতা। সাধারণ মানুষ সরাসরি তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। স্থানীয় সমস্যা রাস্তা, পানীয় জল, রেশন, স্বাস্থ্য এসব বিষয়ে দ্রুত হস্তক্ষেপের চেষ্টা করেন তিনি। শাসক দলের সমালোচনা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরব অবস্থানও তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের অংশ। তবে তিনি নিজেকে কেবল বিরোধিতার রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ রাখতে চান না। উন্নয়নমূলক প্রস্তাব ও বিকল্প পরিকল্পনাও সামনে আনতে চান।
ক্ষমতার নয়, সেবার রাজনীতিঃ
বাবু চৌধুরী নিজে বলেন, আমি রাজনৈতিক পরিবারে জন্মেছি। কিন্তু শুধুই রাজনীতি করাই আমার উদ্দেশ্য নয়। মানুষের পাশে থেকে তাঁদের অভাব-অভিযোগ সমাধান করাই আমার সত্যিকারের লক্ষ্য। এত বছর ধরে রাজনৈতিক ময়দানে রয়েছি তবুও কেউ কোন দুর্নীতি ও অপশাসনের দাগ দিতে পারেনি সর্বদা স্বচ্ছতার রাজনীতিতেই বিশ্বাসী। তাঁর জীবনপথে দলবদল এসেছে, সমালোচনা এসেছে, চ্যালেঞ্জ এসেছে। কিন্তু জনসমর্থনই তাঁকে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি দিয়েছে। স্থানীয়দের মতে, দল যাই হোক, বাবু মানুষের জন্য কাজ করেন। রাজনীতির মাটিতে একনিষ্ঠ পরিশ্রম, সমাজসেবার মানসিকতা আর মানুষের জন্য অকৃত্রিম ভালোবাসা এই তিন স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে উঠেছে তাঁর বর্তমান অবস্থান। ভবিষ্যতে তিনি বড় রাজনৈতিক মঞ্চে কতদূর পৌঁছবেন, তা সময়ই বলবে। তবে আজকের দিনে তিনি নিঃসন্দেহে মালদহের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক উল্লেখযোগ্য নাম যিনি রাজনীতিকে কেবল ক্ষমতার সিঁড়ি নয়, মানুষের সেবার প্রকৃত মাধ্যম হিসেবে দেখতে চান।








