কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা-২০২৬
ড. রতন ভট্টাচার্য্য:কলকাতার শীত তার সবচেয়ে উজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত রূপটি খুঁজে পায় আন্তর্জাতিক বইমেলায়। এটি কেবল একটি সাহিত্যিক অনুষ্ঠান নয়; বরং এক ধরনের ঋতুভিত্তিক অনুভূতি। যখন শহরের বাতাস ঠান্ডা ও সহনীয় হয়ে ওঠে, তখন বইমেলা শব্দ ও ভাবনার উৎসব হিসেবে জেগে ওঠে। পাঠক, লেখক, প্রকাশক ও কৌতূহলী দর্শকদের মিলনে কলকাতার শীত যেন পূর্ণতা পায়। বইমেলা ছাড়া কলকাতার শীত অসম্পূর্ণ বলেই মনে হয়, যেন পাতার ওল্টানো ছাড়া ঋতুটির আগমনই সম্পূর্ণ হয় না।
মৃদু শীত বইমেলায় দীর্ঘ সময় হাঁটার আনন্দ এনে দেয়। পরিবার-পরিজন নিয়ে মানুষ ধীরে ধীরে আসে, ছাত্র-ছাত্রীরা হাতে তালিকা ও চোখে স্বপ্ন নিয়ে স্টল থেকে স্টলে ঘোরে, আর প্রবীণ পাঠকেরা অভ্যাসের মতোই পরিচিত পথে হাঁটেন। গরমের অনুপস্থিতি সময়কে দীর্ঘ করে তোলে; মানুষ থামে, বই উল্টে দেখে, মলাট নিয়ে তর্ক করে, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই প্রথম কয়েক পৃষ্ঠা পড়ে ফেলে। শীত বইমেলাকে তার স্বাভাবিক গতি দেয়, আর বইমেলা শীতকে তার প্রাণ দেয়।
বইমেলাকে কলকাতার শীতের প্রধান আকর্ষণ করে তোলে তার গণতান্ত্রিক চরিত্র। এখানে দুর্লভ গবেষণামূলক গ্রন্থের পাশে থাকে জনপ্রিয় উপন্যাস, লিটল ম্যাগাজিন, শিশুসাহিত্য, অনুবাদ ও রাজনৈতিক বই। বইমেলা হয়ে ওঠে বাঙালির বৌদ্ধিক জীবনের এক জীবন্ত মানচিত্র। পাঠকেরা স্বচ্ছন্দে ভাষা থেকে ভাষায় চলাচল করেন –বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি ও আরও বহু ভাষায়, যা কলকাতার বহুভাষিক ও বহুমাত্রিক সাহিত্য ঐতিহ্যকে প্রতিফলিত করে। শীত কৌতূহলকে তীক্ষ্ণ করে তোলে, আর বইমেলা সেই কৌতূহলকে উদারভাবে তৃপ্ত করে।
শীতের সন্ধ্যায় বইমেলার মোহ আরও বেড়ে যায়। দিনের আলো দ্রুত ফুরিয়ে গেলে সারি সারি আলো জ্বলে ওঠে, স্টলগুলোকে এক আলাদা শহরের রূপ দেয়। কবিতা পাঠ, আলোচনা সভা, বই প্রকাশ ও অনানুষ্ঠানিক বিতর্কের শব্দ ঠান্ডা বাতাসে ভেসে বেড়ায়। সভাঘর ছাড়িয়ে খোলা জায়গাতেও কথাবার্তা চলতে থাকে, যেখানে অপরিচিত মানুষও সাহিত্যের টানে কাছের হয়ে ওঠে। শীত মন দিয়ে শোনার পরিবেশ তৈরি করে, আর বইমেলা সেই মনোযোগেই প্রাণ পায়।
লেখকদের উপস্থিতি বইমেলার আরেকটি শীতের বিস্ময়। সাধারণ টেবিলে বসে লেখকেরা বইয়ে স্বাক্ষর করেন, প্রশ্নের উত্তর দেন, পাঠকদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন। তরুণ পাঠক ও নবীন লেখকদের কাছে এই মুহূর্তগুলো গভীর প্রভাব ফেলে। শীত এই সাক্ষাৎগুলিকে একসঙ্গে গাম্ভীর্য ও উষ্ণতা দেয়, ক্ষণিকের কথোপকথনকে স্মরণীয় করে তোলে। কলকাতায় সাহিত্য দূরের বা অভিজাত কিছু নয়; বইমেলা তাকে সহজ ও ঘনিষ্ঠ করে রাখে।
খাবারের স্টলগুলোও শীতের বইমেলায় আলাদা আকর্ষণ যোগ করে। গরম কফি, রোল ও নানা জল-খাবার নতুন বই ও কাগজের গন্ধের সঙ্গে মিশে যায়। হাতে বই নিয়ে খাওয়াও যেন এক ধরনের আচার হয়ে ওঠে — শরীর ও মনের আহার একসঙ্গে সম্পন্ন হয়। শীত এই উপভোগকে বাড়াবাড়ি মনে না করে স্বাভাবিক করে তোলে, বইমেলার অলস আনন্দকে আরও গভীর করে।
কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা-২০২৬ আবারও প্রমাণ করেছে যে, এটি কেবল একটি বই কেনা-বেচার অনুষ্ঠান নয়; বরং এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সাহিত্য সম্মেলন। এই মেলায় অংশগ্রহণকারীদের বৈচিত্র্যই তার ব্যাপ্তি ও গুরুত্বকে স্পষ্ট করে তোলে। ২০২৬ সালের বইমেলায় অংশগ্রহণ ছিল কলকাতার বইপ্রেম, বৌদ্ধিক ঐতিহ্য ও বিশ্বসংযোগের এক শক্তিশালী প্রকাশ। আন্তর্জাতিক স্তরে বইমেলা ২০২৬-এ একাধিক দেশের অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা যায়। এ বছরের ফোকাল থিম দেশ আর্জেন্টিনা তার সমৃদ্ধ সাহিত্য, দর্শন ও সংস্কৃতিকে বিশেষ প্যাভিলিয়নের মাধ্যমে উপস্থাপন করে। অনুবাদগ্রন্থ, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আর্জেন্টিনার অংশগ্রহণ বইমেলাকে আন্তঃমহাদেশীয় সংলাপের ক্ষেত্র করে তোলে। ইউরোপ, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার অন্যান্য দেশগুলিও বই ও সাংস্কৃতিক প্রদর্শনীর মাধ্যমে মেলায় অংশ নেয়, যা প্রমাণ করে, সাহিত্য জাতীয় সীমারেখায় আবদ্ধ নয়।
ভারতীয় প্রকাশকরাই ছিলেন বইমেলার মূল ভিত্তি। বড় প্রকাশনা সংস্থার পাশাপাশি ছোট ও স্বাধীন প্রকাশকরাও সমান গুরুত্বে নিজেদের বই তুলে ধরেন। বাংলা প্রকাশকদের উপস্থিতি ছিল স্বাভাবিকভাবেই ব্যাপক — সমকালীন উপন্যাস, কবিতা, প্রবন্ধ, শিশুসাহিত্য ও ক্লাসিক গ্রন্থের নতুন সংস্করণে ভরপুর ছিল তাদের স্টল। একই সঙ্গে হিন্দি, অসমিয়া, তামিল, মালয়ালম, মারাঠি, উর্দু ও অন্যান্য ভারতীয় ভাষার প্রকাশকরাও অংশগ্রহণ করেন, যা ভারতের বহুভাষিক সাহিত্যভূমিকে তুলে ধরে। শিক্ষামূলক ও গবেষণাধর্মী প্রকাশকরাও থাকে।
লেখকেরা ছিলেন বইমেলার সবচেয়ে প্রত্যাশিত অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে অন্যতম। খ্যাতনামা সাহিত্যিকদের পাশাপাশি নবীন লেখক, কবি, অনুবাদক ও সমালোচকেরা পাঠকদের সঙ্গে সরাসরি আলাপচারিতায় অংশ নেন। বই প্রকাশ, পাঠসভা ও আলোচনাচক্রে লেখক-পাঠকের দূরত্ব কমে আসে। বিশেষ করে তরুণ পাঠক ও লেখক-অন্বেষীদের কাছে এই উপস্থিতি অনুপ্রেরণার উৎস।
সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলিও বইমেলা ২০২৬-এ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দেশি ও আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক সংস্থাগুলি সাহিত্য, ইতিহাস, চলচ্চিত্র ও সমাজ ভাবনার সঙ্গে যুক্ত নানা অনুষ্ঠান আয়োজন করে। বিশ্ববিদ্যালয়, সাহিত্যসভা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলি অনুবাদ, পরিবেশ সংকট, ডিজিটাল পাঠাভ্যাস ও প্রকাশনার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করে বইমেলাকে চিন্তার মঞ্চে পরিণত করে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগ্রহণকারী ছিলেন পাঠকেরা। ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক, পরিবার, প্রবীণ নাগরিক ও সাধারণ দর্শনার্থীদের ভিড়ে বইমেলা প্রতিদিন প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছিল। বই দেখা, কেনা, আলোচনা করা ও সুপারিশের মধ্য দিয়ে পাঠকেরা নিজেরাই বইমেলার বৌদ্ধিক আবহ গড়ে তুলেছেন।
আয়োজক, স্বেচ্ছাসেবক, বই বিক্রেতা ও সহায়ক কর্মীরাও বইমেলার অবিচ্ছেদ্য অংশ। লক্ষ লক্ষ দর্শনার্থীর সমাগম সামলানো ও বিপুল কর্মসূচি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার পেছনে তাঁদের অবদান অনস্বীকার্য। তাঁদের নীরব শ্রম বইমেলাকে একটি সফল সাংস্কৃতিক উৎসবে রূপ দিয়েছে।
সব মিলিয়ে, কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা ২০২৬-এর অংশগ্রহণকারীরা এক বৃহৎ সাহিত্যিক জগতের প্রতিচ্ছবি। দেশ ও প্রতিবেশ, প্রকাশক ও কবি, প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ পাঠক — সবার মিলনে বইমেলা কলকাতার শীতকে শুধু ঋতু নয়, এক বৌদ্ধিক ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতায় পরিণত করেছে।
বাণিজ্য বা উৎসবের বাইরে গিয়ে শীতের বইমেলা কলকাতার পাঠকসত্তাকে দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করে। পর্দা-নির্ভর সময়ে হাজার হাজার মানুষের মুদ্রিত বইয়ের জন্য ভিড় করা এক ধরনের নীরব প্রতিবাদ। শীত যেন এই ধীরতার সহচর হয়ে ওঠে, জীবনকে একটু থামিয়ে পড়া, ভাবা ও কল্পনার আনন্দ মনে করিয়ে দেয়।
এই কারণেই বইমেলা কেবল কলকাতার শীতের একটি আকর্ষণ নয়, বরং তার প্রতীক। যতদিন শীত বইয়ের প্রতিশ্রুতি, তর্ক ও যৌথ কৌতূহল নিয়ে ফিরে আসবে, ততদিন কলকাতার সাংস্কৃতিক স্পন্দন অটুট থাকবে। শীত আসে যায়, কিন্তু বইমেলার স্মৃতি থেকে যায় — প্রিয় বইয়ের মতোই, যা বারবার খুলে পড়তে ইচ্ছে করে।
(লেখক: আন্তর্জাতিক রবীন্দ্র পুরস্কারপ্রাপ্ত বহুভাষিক লেখক, ভার্জিনিয়া কমনওয়েলথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধিভুক্ত অধ্যা পক)।








