সত্যের আলোয় পুনরাবিষ্কৃত আমাদের ইতিহাস
সফিয়ার সরদার
ভারতের ইতিহাসের যে অধ্যায়টি বহুকাল ধরে রাজনৈতিক প্রচার আর বিভ্রান্তিকর বক্তব্যের ভিড়ে চাপা পড়ে আছে, তা হল মোঘলদের প্রকৃত পরিচয়। তাঁদের সম্পর্কে এমনভাবে প্রচার করা হয়েছে, যেন তাঁরা শুধু তলোয়ার হাতে আক্রমণ চালানো লুটেরা বাহিনী ছিল। কিন্তু ইতিহাসের প্রকৃত নথি ও বিশ্বখ্যাত গবেষকদের কাজ বলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। মোঘল সাম্রাজ্য ছিল কেবল একদল আক্রমণকারীর সাম্রাজ্য নয়; ভারতের প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও স্থাপত্য গৌরবের অন্যতম ভিত্তি।
প্রথম সত্যটি হল, মোঘলরা কেবল যুদ্ধ জিতে এসে চলে যাওয়া যাযাবর দস্যু ছিলেন না। ১৫২৬ সালে পানিপথের প্রথম যুদ্ধে ইব্রাহিম লোদীকে পরাজিত করে মোঘল সম্রাট বাবর দিল্লির সিংহাসনে আসীন হলেও তাঁর পরবর্তী শাসকরা এখানে বসতি গড়েছেন, প্রজাহিতৈষী নীতি গ্রহণ করেছেন এবং এক গভীর প্রশাসনিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করেছেন। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ জে.এফ রিচার্ডসের ভাষায়, মোঘল সাম্রাজ্য ছিল একটি স্থিতিশীল ও সংগঠিত প্রশাসনিক রাষ্ট্র, যেখানে শাসকের লক্ষ্য ছিল শৃঙ্খলা, স্থায়িত্ব ও উন্নয়ন। তাই তাঁরা লুঠ করে চলে যাননি; বরং ভারতকেই নিজেদের মাতৃভূমি করে তুলেছিলেন।
দ্বিতীয়ত, মোঘল যুগ ছিল ভারতের অর্থনীতির সর্বোচ্চ জোয়ার। আজ ভারত যে উদীয়মান অর্থনীতি হিসেবে উঠে আসছে, সেই ভারতের পূর্বসূরি ছিল মোঘল ভারতের অভূতপূর্ব সমৃদ্ধি। বিখ্যাত অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ অ্যাঙ্গাস ম্যাডিসনের গবেষণা দেখায়, ১৬০০ থেকে ১৭০০ শতকের মধ্যেই ভারতের অংশ ছিল বিশ্বের মোট উৎপাদনের প্রায় এক-চতুর্থাংশ। কৃষিতে টোডরমলের রাজস্বনীতি, জমির সুষ্ঠু পরিমাপ, ন্যায্য কর-ব্যবস্থা এবং কৃষক-বান্ধব নীতি — এসবই ভারতের খাদ্য উৎপাদন ও অর্থনীতিকে বিশ্বের শীর্ষে তুলে এনেছিল। বস্ত্রশিল্পে ভারতের মসলিন, সিল্ক, শাল, ধাতুশিল্প বিশ্ববাজারের নিরঙ্কুশ শাসক। ডাচ কোম্পানির নথিতে স্পষ্ট লেখা আছে, ভারতীয় তন্তুবায়দের ওপর আমাদের সম্পূর্ণ নির্ভরতা। এমন অর্থনৈতিক বিস্ফোরণ কি কেবল আক্রমণকারী শক্তির হাতে সম্ভব? ইতিহাস বলে, এটা সম্ভব কেবল রাষ্ট্রনির্মাতা শাসকদের হাতেই।

তৃতীয়ত, মোঘল যুগ ছিল ভারতীয় স্থাপত্য-সংস্কৃতির এক সোনালি পুনর্জাগরণ। তাজমহল, ফতেহপুর সিকরি, লালকেল্লা, শালিমার বাগ — এসব স্থাপত্য ও ঐতিহাসিক নিদর্শন কেবল পাথরের স্তূপ নয়; এগুলো ভারতের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অন্যতম স্তম্ভ। সুইডিশ গবেষক ইব্বা কখ-এর বক্তব্য, মোঘল স্থাপত্য বিশ্বের অন্যতম উজ্জ্বল সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণের উদাহরণ। তানসেন থেকে দৌলত কাজী, আলাওল থেকে ফার্সি ও হিন্দি সাহিত্য মোঘল পৃষ্ঠপোষকতায় শিল্প-সাহিত্য পেয়েছিল নতুন দীপ্তি।
চতুর্থত, সবচেয়ে প্রচলিত ভুল ধারণাটি হল, মোঘলরা নাকি ছিল হিন্দু বিদ্বেষী। অথচ ইতিহাস সিঞ্চিত নথি বলছে একেবারে উল্টো কথা। মোঘল প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের এক বড় অংশই ছিলেন অমুসলিম বা মূলত হিন্দু। রাজা মানসিং, বীরবল, টোডরমল — এরা কেবল নামমাত্র সহযোগী নন; ছিলেন মোঘল প্রশাসনের অন্যতম মূল স্তম্ভ। ইতিহাসবিদ আতহার আলির গবেষণায় দেখা যায়, অনেক সময় হিন্দু আমলারা ছিলেন মোঘল দরবারের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও যোগ্য প্রশাসক। মন্দিরে অনুদান দেওয়া, কর-মুক্ত জমি দান, ধর্মীয় উৎসবে সহযোগিতা — এসবই মোঘল যুগের স্বাভাবিক সামাজিক প্রক্রিয়া। আওরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও গবেষণা বলছে, তিনি রাজনৈতিক বিদ্রোহ দমনে যেসব স্থাপনা ভেঙেছিলেন, তার মধ্যে সুফি দরগাও ছিল। অর্থাৎ তাঁর সিদ্ধান্ত ছিল রাজনৈতিক, ধর্মীয় নিপীড়নমূলক নয়।
মোঘল শাসন ভারতীয় সমাজব্যবস্থাকে ভেঙে দেয়নি; বরং গড়ে তুলেছিল ভারতে ‘গঙ্গা-যমুনা তেহজিব’ যেখানে হিন্দু-মুসলমান উভয়ের সংস্কৃতি মিলেমিশে এক অনন্য সমন্বিত ঐতিহ্য সৃষ্টি করেছিল। ভাষা, পোশাক, সংগীত, খাদ্য সবকিছুতেই এই সমন্বয়ের রেশ আজও ভারতীয় সমাজে গভীর।
কিন্তু রাজনৈতিক স্বার্থের কারণে আজ মোঘলদের নিয়ে ইতিহাসকে এমনভাবে বিকৃত করা হচ্ছে যে, নতুন প্রজন্ম সত্যকে ছেড়ে ভ্রান্ত ইতিহাসের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। মোঘল মানে আক্রমণ, লুঠ ও বিদ্বেষ — এই বদ্ধমূল অন্ধ ধারণা ইতিহাসের নয়, রাজনীতির সৃষ্টি। সত্য হল, মোঘলরা ভারতের রাষ্ট্র, অর্থনীতি, প্রশাসন ও সংস্কৃতি বিনির্মাণের এক বিশাল অধ্যায়।
ইতিহাসকে ভয় করা নয়, ইতিহাসকে জানাই জরুরি। কারণ সত্য আলো দেখায়, বিভ্রান্তি অন্ধকার তৈরি করে। মোঘলদের মূল্যায়ন নিয়ে বিতর্ক হতে পারে, হওয়া উচিতও; কিন্তু সেই বিতর্কের ভিত্তি হতে হবে তথ্য, গবেষণা ও সত্য। সেই সত্যই আমাদের শেখায়, ভারতের বহুত্ববাদ, সহনশীলতা ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের যে ভিত্তি আজো দেশকে শক্তিশালী করে রেখেছে, তার জন্ম হয়েছিল মোঘল যুগের দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরম্পরা থেকে।
আমরা কি এই সত্যকে গ্রহণ করব, নাকি রাজনীতির তৈরি অন্ধকারেই ডুবে থাকব, সিদ্ধান্ত আমাদেরই।








