বেলডাঙার ইট ও আস্থা: প্রস্তাবিত ‘বাবরি মসজিদ’ নেপথ্য ইতিহাস, মানুষের গল্প ও রাজনৈতিক প্রভাব
জানে আলম
আমাদের দেশ ভারতবর্ষ আজ এক গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক মেরুকরণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ধর্ম, পরিচয়, দলীয় আনুগত্য এবং কৌশলগত উত্তাপ — সব মিলিয়ে দেশজুড়ে অদৃশ্য বিভাজনরেখা তৈরি হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গও এর ব্যতিক্রম নয়; বরং অনেক সময় এই মেরুকরণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।
ঠিক এই প্রেক্ষাপটে, মুর্শিদাবাদের বেলডাঙা-রেজিনগরে গত ৬ ডিসেম্বর বিধায়ক হুমায়ুন কবীরের উদ্যোগে আয়োজিত বাবরি-ধাঁচের মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন শুধুমাত্র ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি আত্মপরিচয় ও ইতিহাস পুনর্নির্মাণের প্রতীক। ১৯৯২ সালের আঘাত, বহু বছর ধরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বঞ্চনা — সব মিলিয়ে রেজিনগরের এই অংশগ্রহণকে এক সামাজিক ও মানবিক বার্তা হিসেবে দাঁড় করিয়েছে।
ইট-বোঝা মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ: শিশু থেকে প্রবীণ, নারী ও পুরুষ — সবাই মাথা, হাতে বা সাইকেলে ইট বহন করে মসজিদ নির্মাণে অংশ নিয়েছে। অনেকে নিজ খরচে ইট এনেছেন। এরা মূলত দিনমজুর ও স্বল্প আয়ের মানুষ। তাদের বক্তব্য সরল কিন্তু গভীর, ”রাজনীতি বুঝি না। ডাক এসেছে, তাই এসেছি। মসজিদ নির্মাণ আমাদের দায়িত্ব।”
কোনো রাজনৈতিক পতাকা বা স্লোগান ছিল না; ছিল শুধু বিশ্বাস, দায়িত্ববোধ এবং আত্মপরিচয়ের পুনর্নির্মাণের আহ্বান। বহন করা ইট কেবল নির্মাণ সামগ্রী নয়; এটি তাদের ঈমান, আশা, গর্ব এবং ইতিহাসের সঙ্গে সংযুক্ত আত্মসম্মানের প্রকাশ।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট; সিরাজউদ্দৌলা থেকে রেজিনগর: মুর্শিদাবাদ একসময় বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার প্রশাসনিক এবং সাংস্কৃতিক রাজধানী ছিল। নবাব সিরাজউদ্দৌলার শাসনকালে এর সমৃদ্ধি, শিক্ষা ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে লন্ডনের প্রায় সমকক্ষ ছিল। কিন্তু ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় এবং লর্ড ক্লাইভের নেতৃত্বে ব্রিটিশ দখল মুর্শিদাবাদের স্বর্ণযুগের অবসান ঘটায়। রেজিনগর, যা মাত্র ১৩ কিলোমিটার দূরে, এই ঐতিহাসিক ক্ষতির সাক্ষী। ১৭৫৭ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত প্রায় ২৬৮ বছর পার হলেও মুর্শিদাবাদ এখনও বহু ক্ষেত্রে বঞ্চিত ও অবহেলিত। এই দীর্ঘ বঞ্চনা মানুষের মনে আক্ষেপ এবং নীরব প্রতিশোধের অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। রেজিনগরের ইট হাতে নেওয়া অংশগ্রহণ কেবল ধর্মীয় আস্থা নয়; এটি ইতিহাসের ক্ষত সারানো, আত্মপরিচয় পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং মানুষের মর্যাদা ফিরে পাওয়ার প্রতীক।
মুসলিম ভোটারদের মানসিকতা; বঞ্চনা ও আত্মপরিচয়: গত এক দশকে পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম ভোটারদের একাংশ তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতি ঝুঁকেছিল, বিশেষ করে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের সময়। তখন বিজেপি এনআরসি বা নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের ভয় দেখানোর চেষ্টা করেছিল। মুসলিম ভোটাররা সেই ভয় এবং নিরাপত্তাহীনতার প্রেক্ষাপটে তৃণমূলকে একচেটিয়া সমর্থন দিয়েছিল। তবে ভোট দেওয়ার পর দেখা গেছে, সামাজিক ও ধর্মীয় অবকাঠামো — মসজিদ, মাদ্রাসা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাক্ষেত্রে সরকারের তরফে উল্লেখযোগ্য সহায়তা বা বিনিয়োগ সেভাবে চোখে পড়েনি।
আরও উদ্বেগজনক হল, ওবিসি তালিকা এবং ওয়াকফ সম্পত্তি সংক্রান্ত নীতি বাস্তবায়নে রাজ্য সরকারের প্রতি মুসলিম সম্প্রদায়ের আস্থা কমে গেছে। ২০২৪ সালে হাইকোর্টের রায়ে পূর্বে ওবিসি হিসেবে তালিকাভুক্ত ৭৭টি মুসলিম গোষ্ঠীর ওবিসি স্ট্যাটাস বাতিল হওয়ায় প্রায় ৫ লাখ মুসলিমের সার্টিফিকেট ঝুঁকিতে পড়ে। ফলে চাকরি, ভর্তিতে সুযোগ এবং শিক্ষা-ভিত্তিক ভর্তুকি বা স্কলারশিপ থেকে অনেক যোগ্য কিন্তু আর্থিকভাবে পিছিয়েপড়া মুসলিমরা বঞ্চিত হয়েছে।
চাকরি ও প্রশাসনিক নিয়োগেও পরিস্থিতি হতাশাজনক। বিশেষ করে মেধাবী কিন্তু গরিব মুসলিমদের জন্য সুযোগ ইদানীংকালে অনেক কমে গেছে। সামান্য ভাতা বা অনুদান পাওয়া কিছু ইমাম ও মোয়াজ্জেনের উদাহরণ হলেও তা পর্যাপ্ত নয়; এমনকি এই সামান্য বরাদ্দও মুসলিম-হিন্দু উভয় সম্প্রদায়কে সমানভাবে সন্তুষ্ট করতে পারেনি। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থার ধীর অবনতি চলতে থাকায় গরিব মুসলিম, দলিত ও আদিবাসী সম্প্রদায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, যার জন্য সরকার কার্যকর সুরক্ষা প্রদানে ব্যর্থ হচ্ছে।
অপরদিকে, সরকারি তহবিল ব্যবহার করে হিন্দু ধর্মীয় অনুষ্ঠান, মন্দির এবং পূজা মণ্ডপে বরাদ্দ বৃদ্ধি পেয়েছে। শিলিগুড়ির মহাকালধাম, দীঘার জগন্নাথ মন্দির, বিভিন্ন কার্নিভাল ও পূজা মণ্ডপের উদাহরণ এই বণ্টনের অমসৃণতার প্রমাণ দেয়। এই অসম বণ্টন মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে সামাজিক ও ধর্মীয় আস্থার সংকট তৈরি করেছে এবং ভোটারের মনে হতাশা ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট অসন্তোষ বাড়ছে।

ফলত, বহু মুসলিম ভোটার শুধুমাত্র নির্বাচনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তাদের রাজনৈতিক আত্মপরিচয় সংরক্ষণ করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তারা যে প্রতিশ্রুতি বা ন্যায্য সুবিধার প্রত্যাশা করেছিলেন, তা যথাযথভাবে পূরণ হয়নি। এই পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে তাদের রাজনৈতিক আস্থা ও আর্থ-সামাজিক মর্যাদা প্রভাবিত করছে।
কেন মসজিদ? কেন হাসপাতাল নয়? একপক্ষের যুক্তি, মসজিদের চেয়ে স্কুল, কলেজ বা হাসপাতাল বেশি জরুরি। ধর্মপ্রাণ মানুষের যুক্তি, মসজিদ শুধু উপাসনালয় নয়; এটি স্বতন্ত্র পরিচয়, ঐতিহ্য এবং সামাজিক নিরাপত্তার কেন্দ্র। বঞ্চনা ও দীর্ঘদিনের অবহেলার মধ্যেও মানুষ রেজিনগরে প্রস্তাবিত বাবরি মসজিদে দান করছে। কারণ, এটি তাদের আত্মপরিচয় ও ইতিহাসের প্রতীক, রাজনৈতিক কৌশল বা মেরুকরণের অংশ নয়।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্র: রেজিনগরের ছবি ও ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় দ্রুত ভাইরাল হয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এটিকে অনুসরণ করেছে নেটিজেন ও সংবাদমাধ্যম। এর আগে ভারতে এমন ধর্মভিত্তিক, সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণকে কেন্দ্র করে একজন মুসলিম নেতার ছবি এত দ্রুত ভাইরাল হয়েছে, তা বিরল।
অনেকে হুমায়ুন কবীরকে উদীয়মান মুসলিম নেতা হিসেবে উল্লেখ করছেন। তার নাম সোশ্যাল মিডিয়ায় মুসলিম সমাজের আত্মপরিচয় ও অংশগ্রহণের প্রতীক হিসেবে উঠে এসেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি বাংলার সংখ্যালঘু রাজনীতিতে নতুন পরিবর্তনের ইঙ্গিত। দীর্ঘদিন ধরে একমুখী ভোটাভ্যাস ভেঙে মুসলিম সমাজ এখন নতুন নেতৃত্ব ও দিশা খুঁজছে।
২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রভাব; সংক্ষিপ্ত মানবিক ও সামাজিক বিশ্লেষণ: রেজিনগরে বাবরি-ধাঁচের মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন কেবল ধর্মীয় নির্মাণ নয়; এটি মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, সামাজিক সচেতনতা এবং ঐক্য-সম্প্রীতির প্রতীক। লাখ লাখ মানুষ আপনা হতেই অংশগ্রহণ করেছে, যা স্থানীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সংহতি, সহযোগিতা ও বহুত্ববাদী সংস্কৃতির প্রতি দায়বদ্ধতা তৈরি করেছে।
তবে, সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া জটিল। কেউ মনে করছে, এটি নতুন নেতৃত্ব ও পরিবর্তনের পথ, আবার কেউ ভয় পাচ্ছে বৃহৎ জনসমাগম সম্প্রদায়িক উত্তেজনা বা বিভাজন তৈরি করতে পারে। মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে এই উদ্যোগ ভিন্নমত ও আবেগের বৈচিত্র্যও তৈরি করেছে। সর্বজনীন অংশগ্রহণের মাধ্যমে মানুষ নিজেদের মৌলিক চাহিদা, ধর্মীয় স্থান এবং ঐতিহ্য রক্ষা করছে। এটি সামাজিক সংহতি এবং ঐক্য-সম্প্রীতি দৃঢ় করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। ভোট বা রাজনৈতিক ফলাফলের পরিবর্তে মানবিক ও সামাজিক সচেতনতা স্থানীয় সমাজে দীর্ঘমেয়াদে প্রভাব ফেলতে পারে।
রেজিনগরের ঘটনা দেখায়, মানুষের আবেগ ও অংশগ্রহণ শক্তি হিসেবে সমাজে পরিবর্তন আনতে পারে। এটি শুধু নির্বাচনী ফলাফলের জন্য নয়; বরং সামাজিক সংহতি, সমাজের সব অংশের ক্ষমতায়ন এবং মানবিক সচেতনতা গড়ে তুলতে সহায়ক। (মতামত লেখকের নিজস্ব)
লেখক: নূর জাহানারা স্মৃতি হাইমাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক








