মুখ্যমন্ত্রীর জনসভায় হতাশ মুর্শিদাবাদ জেলাবাসী
জেলার বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিক্রিয়া
নিজস্ব সংবাদদাতা, নতুন পয়গাম, মুর্শিদাবাদঃ
৪ ডিসেম্বর বহরমপুর স্টেডিয়ামে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জনসভাকে ঘিরে মুর্শিদাবাদ জেলাজুড়ে ছিল প্রবল উত্তেজনা এবং প্রত্যাশা। বহু মানুষই আশা করেছিলেন, এবার হয়তো জেলার জন্য কোনও বিশেষ ঘোষণা আসবে, মিলবে নতুন উন্নয়ন কর্মসূচির রূপরেখা। কিন্তু জনসভায় মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য মূলত এসআইআর, ওয়াকাফ এবং সংগঠনগত মন্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকায় একাংশের মধ্যে হতাশা ছড়িয়েছে। দলের বিধায়ক হুমায়ুন কবিরকে নাম না করে নিশানা করলেও জেলার উন্নয়ন নিয়ে কোনও দিশা দেখাননি বলেই বিভিন্ন মহলের অভিযোগ।
‘জেলা সংগ্রাম সমিতি’-র সম্পাদক হাসানুজ্জামান বাপ্পা তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন “মুখ্যমন্ত্রী এই জনসভা থেকে মুর্শিদাবাদবাসীর জন্য একটিও উন্নয়নমূলক ঘোষণা করেননি। সকলের প্রত্যাশা ছিল জেলার সমস্যাগুলো নিয়ে তিনি কথা বলবেন। কিন্তু তার পরিবর্তে তিনি বললেন এনআরসি, ওয়াকফ, ডিটেকশন ক্যাম্প যা সাধারণ মুসলিম সম্প্রদায়ের ভিতরে ভয় তৈরির চেষ্টা ছাড়া কিছুই নয়।” তিনি আরও বলেন, “প্রশাসনিক সুবিধার্থে আমরা দীর্ঘদিন ধরে মুর্শিদাবাদ জেলা ভাগের দাবি করে আসছি। এবারও মুখ্যমন্ত্রী জেলা ভাগের ঘোষণা করলেন না। আমরা হতাশ। দাবি আদায়ে আমাদের আন্দোলন চলবে।”
সিপিআইএম মুর্শিদাবাদ জেলা সম্পাদক জামির মোল্লা বলেন, “মুখ্যমন্ত্রীর এই সভা থেকে জেলাবাসী অশ্বডিম্ব ছাড়া কিছুই পায়নি। মুখ্যমন্ত্রী সংখ্যালঘুদের সঙ্গে প্রতারণা করলেন। তিনি বলেছিলেন ‘ওয়াকফ নিয়ে গুলোগুলি করবেন না । ওয়াকফ নিয়ে আন্দোলন করতে হলে দিল্লি যান এখানে নয়, এখানে আমি আছি ওয়াকফ লাগু হতে দেব না।’ তারপর তিনি ওয়াকফ বিল মেনে নিয়েছেন। এর থেকে বোঝা যায় চুপিসারে মুখ্যমন্ত্রী আরএসএস বিজেপির এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছেন। মুর্শিদাবাদে এসে এনআরসি, ডিটেনশনক্যাম্প প্রসঙ্গ তুলে সংখ্যালঘুদের মধ্যে বিজেপির ভয় ঢোকাতে চাইলেন। বিজেপি-তৃণমূলের যে সেটিং আছে- সাধারণ মানুষ বুঝে গেছে, আগামী নির্বাচনে মানুষ তা বুঝিয়ে দেবে।”
ছাত্র সংগঠন এসআইও’র মুর্শিদাবাদ জেলা সভাপতি জয়নাল আবেদিন বলেন, “রাজ্যের মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুর্শিদাবাদ সফর করে গেলেন। জেলাবাসীকে বিভিন্ন বিষয়ে বার্তা দিয়ে গেলেন বহরমপুরের জনসভা থেকে। আমরা আশা করেছিলাম জেলার মানুষের দীর্ঘদিনের দাবীকে গুরুত্ব দিয়ে মুর্শিদাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়কে পূর্ণাঙ্গরুপে বাস্তবায়নের ঘোষণা দেবেন। কিন্তু আমরা লক্ষ্য করলাম, ঘোষণা তো দূরের কথা, বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে একটি কথা পর্যন্ত খরচ করেননি তিনি। এটা খুবই দুঃখের, সঙ্গে চিন্তারও বিষয়। আমরা অবিলম্বে জেলার জনপ্রতিনিধিদের জানাতে চাই, আপনারা মুর্শিদাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের জন্য মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বাধ্য করুন, নাহলে সামনের নির্বাচনে মুর্শিদাবাদের জনসাধারণ এর হিসাব বুঝে নেবে।”
জামাআতে ইসলামি হিন্দের মুর্শিদাবাদ জেলা সভাপতি মোঃ শামসুল আলম বলেন– “৪ ডিসেম্বর ২০২৫ মাননীয় মূখ্যমন্ত্রীর মুর্শিদাবাদ জেলায় আগমনকে কেন্দ্র করে মুর্শিদাবাদ জেলাবাসী হিসেবে কয়েকটি ঘোষণা প্রত্যাশা করেছিলাম। ভেবেছিলাম ২০২৬ এর নির্বাচনের আগে মুর্শিদাবাদ জেলার মানুষকে অনেক আশার কথা শোনাবেন। কিন্তু স্টেডিয়ামের মাঠ থেকে সেই আশার বানী উচ্চারিত না হওয়াতে জেলাবাসী হতাশ। জেলাবাসী হিসেবে আমরা মুখ্যমন্ত্রীর নিকট শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের বিষয়ে সুস্পষ্ট ঘোষণা প্রত্যাশা করেছিলাম। পৃথক জায়গায় মুর্শিদাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীন ক্যাম্পাস গড়ে তোলা হবে এবং একে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিয়ে সমস্ত ফ্যাকাল্টি চালু করার ঘোষণা দিবেন, এই আশা ছিল। কিন্তু মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী এই রকম কোনো ঘোষণা করেননি। এছাড়া মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজের বেডের সংখ্যা আরো বাড়ানো দরকার। বেডের অভাবে রোগীরা সুষ্ঠু ভাবে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আশা করেছিলাম, এ বিষয়েও মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করবেন। কিন্তু জেলাবাসীর সে আশা পূরণ হয়নি। মুর্শিদাবাদ জেলাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি ছিল এজেলায় কোনো শিল্প-কারখানা গড়ে তোলা হোক। যাতে জেলার মানুষের ভিনরাজ্যে কাজে যাওয়ার প্রবণতা কমে। কিন্তু এই ধরণের ঘোষণাও মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী শোনাতে পারেননি। ফলে মুখ্যমন্ত্রীর আগমনে জেলাবাসীর আশা অপূর্ণই থেকে গেল।”
পিআইবির রাজ্য কোর কমিটির সদস্য আনিসুর রহমান বলেন– “মুখ্যমন্ত্রীর মুর্শিদাবাদ সফরে আমরা ওবিসি তালিকা পুনর্বিন্যাসের কার্যকরী পদক্ষেপ আশা করেছিলাম, কিন্তু তাঁর নীরবতায় আমরা গভীরভাবে হতাশ। আমরা মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানাচ্ছি, তিনি যেন অবিলম্বে এই ওবিসি তালিকা পুনর্বিন্যাস করে প্রান্তিক মানুষের অধিকার নিশ্চিত করেন। অন্যথায়, পিআইবি রাজ্যের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষায় বৃহত্তর আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবে।”
শিক্ষক সংগঠন আইটার জেলা সভাপতি জানে আলম বলেন– মুখ্যমন্ত্রী বহরমপুরে মঞ্চে দাঁড়িয়ে নতুন প্রকল্পের ঘোষণা দিলেন, উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি জানালেন। কিন্তু মুর্শিদাবাদবাসীর চোখে এই বক্তৃতা কেবল শব্দের সুর- বাস্তবতা এখনও অনেক দূরে। জল, রাস্তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা- দাবিগুলো বছরের পর বছর জমে আছে, প্রতিশ্রুতি আর ঘোষণার আড়ালে। মুর্শিদাবাদবাসীর স্বপ্ন যেন কেবল শোনার নয়, দেখারও হয়।
অন্যদিকে, মানবাধিকারকর্মী ছোটোন দাস বলেন, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আজ যে লড়াই করছেন, সেটা শুধু রাজনীতি নয়, গণতন্ত্র রক্ষার লড়াই। বিজেপি দেশজুড়ে যে বিভাজনের রাজনীতি করছে, তার মোকাবিলায় মুখ্যমন্ত্রী যেভাবে সরব হচ্ছেন সেটা প্রশংসনীয়। তাঁর বক্তব্যে সেই লড়াইয়ের প্রতিফলন ছিল।”
মুখ্যমন্ত্রীর এই সফরকে ঘিরে মুর্শিদাবাদে এখন দুই রকম সুর। অধিকাংশ মনে করছে প্রত্যাশা পূরণ হলো না আরেক অংশ বলছে রাজনৈতিক বার্তা দেওয়াই ছিল মুখ্যমন্ত্রীর মূল উদ্দেশ্য।








