সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক মাপকাঠি
আবীর লাল
স্বাধীন ভারতের সংবিধান কার্যকর হওয়ার ৭৫ বছর পরেও সংরক্ষণ ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে বিতর্কের আগুন কখনও নিভে যায়নি। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি বি.আর গাভাই মন্তব্য করেছেন, তপশিলি জাতি ও উপজাতিদের ক্ষেত্রেও অর্থনৈতিক মাপকাঠি বিবেচনা করে ক্রিমি ও নন-ক্রিমি লেয়ার চালু করা জরুরি। তাঁর এই বক্তব্য দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা বাস্তব অভিজ্ঞতা ও তথ্যভিত্তিক সমস্যার নিরিখেই। দেশের সংরক্ষণের ইতিহাস যে মূলত সামাজিক বঞ্চনা ও অনিবার্য বৈষম্য দূরীকরণের জন্য তৈরি হয়েছিল, সেটা সত্য। এ নিয়ে কোনো সন্দেহ সংশয় নেই। কিন্তু সমাজের ভেতরে গত সাত দশকে বহু পরিবর্তন এসেছে, যার ফলে এই ব্যবস্থাকে আজ নতুন করে বিচার বিবেচনা করা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।
সংরক্ষণের বীজ রোপিত হয়েছিল স্বাধীনতার বহু আগে থেকে, সেকথা আমরা কম বেশি জানি। তবে সংবিধান কার্যকর হওয়ার পর রাষ্ট্র এই নীতিকে গঠনমূলক স্বীকৃতি দেয়। সংবিধানের ধারা ১৫ (৪) ও ১৬ (৪) আর্থ-সামাজিক ও শিক্ষাগতভাবে পিছিয়ে থাকা শ্রেণির উন্নতির জন্য বিশেষ সুবিধা দেওয়ার সুযোগ করে দেয়। সেই সময়ে ভারত ছিল অসাম্য ও বৈষম্যে ভরা, যেখানে জাতিগত পরিচয়ই মানুষকে সুযোগ থেকে বঞ্চিত করেছিল শতাব্দীর পর শতাব্দী। রাষ্ট্র সেই ঐতিহাসিক ক্ষত সারিয়ে তোলার জন্য SC ও ST সম্প্রদায়ের জন্য সংরক্ষণের বিধান এনেছিল, যা শুরুতে ১২.৫% ছিল এবং পরে বাড়তে বাড়তে বর্তমান কাঠামোয় পৌঁছেছে। ১৯৭৯ সালে গঠিত মণ্ডল কমিশন এই নীতির পরিধি আরও এক স্তরে এগিয়ে নিয়ে যায়। তারা শুধু তফসিলি জাতি ও উপজাতির অতীত বঞ্চনার সাথে সাথে সামাজিক ও শিক্ষাগতভাবে পিছিয়ে থাকা অন্যান্য শ্রেণির জন্যও সংরক্ষণের সুপারিশ করেছিল। যার ফলেই OBC সংরক্ষণ চালু হয়। কিন্তু এখানেই একটি মৌলিক পার্থক্য সৃষ্টি হয় — OBC শ্রেণির জন্য ক্রিমি লেয়ার ধারণা যুক্ত করা হয়, যাতে আর্থিকভাবে সচ্ছল OBC সদস্যরা সংরক্ষণের সুবিধা না পান এবং প্রকৃত পিছিয়েপড়া অংশ উপকৃত হয়। এটি একটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও যুক্তিসংগত পদক্ষেপ ছিল। কারণ, বাস্তবে আর্থিক ও শিক্ষাগত বঞ্চনাই কোনো সমাজকে পিছিয়ে রাখার জন্য যথেষ্ট। ফলে ক্রিমি লেয়ার-এর ধারণা সংরক্ষণের উদ্দেশ্যকে আরও শুদ্ধ করে। অথচ একই আর্থ-সামাজিক বৈচিত্র্য বা বৈষম্য থাকা সত্ত্বেও SC-ST শ্রেণিতে এই অর্থনৈতিক মানদণ্ডে বাছাই প্রক্রিয়া কখনও অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এর ফলেই আজ সেই চিত্র দেখা যায়, যেখানে বহু পরিবারের প্রথম প্রজন্ম সংরক্ষণের আওতায় এসে চাকরি পেয়েছে এবং পরবর্তী প্রজন্মও একই সার্টিফিকেটের ভিত্তিতে সুবিধা পাচ্ছে। যদিও পরিবারের আর্থিক ভিত্তি যথেষ্ট সুরক্ষিত ও উন্নত। সেই একই সময়ে আদতে যাঁরা সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়েপড়া, সেই SC-ST সম্প্রদায়ের বহু মানুষ আজও শিক্ষা এবং চাকরির সুযোগ থেকে বঞ্চিত রয়ে গেছে।
বিচারপতি গাভাইয়ের বক্তব্য এই অবিচারেরই প্রতিবিম্ব রূপে ধরা দিয়েছে। বর্তমান তথ্যচিত্রে নজর দিলে সমস্যাটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্য বলছে, SC কর্মীদের হার অনেক ক্ষেত্রে কাগজে-কলমে সংরক্ষণের সীমা ছুঁলেও (প্রায় ১৮.৪%), তাদের একটি বড় অংশ নিম্নশ্রেণির চাকরিতে সীমাবদ্ধ। ST-দের ক্ষেত্রেও (প্রায় ৭.৪%) একই চিত্র। গ্রুপ-A বা উচ্চ পদে SC-ST প্রতিনিধিত্ব ভয়াবহভাবে কম। এক সংসদীয় রিপোর্ট বলছে, যেখানে SC ও ST-র মোট কোটার সংখ্যা ২২.৫%, সেখানে পরিচালক পর্যায়ে ও তার উপরে এই দুই শ্রেণির যোগফল মাত্র ১৩%। শীর্ষ প্রশাসনে, আমলা বা সচিব পদে প্রতিনিধিত্ব মাত্র ৪.৮%, যা সংখ্যানুপাতে উল্লেখযোগ্য ভাবে কম।
উচ্চশিক্ষায় অবস্থাও উদ্বেগজনক। ৪৫টি কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর নিয়োগে SC প্রতিনিধিত্ব ১১% এর নিচে এবং ST মাত্র ৫% এর কাছাকাছি। তাই সংখ্যাগত সংরক্ষণ থাকলেও সামাজিক, শিক্ষাগত অগ্রগতি এবং ক্ষমতা কাঠামোয় প্রকৃত সমতা কখনোই কার্যকর হয়নি। এমতাবস্থায় বিচারপতি গাভাইয়ের যুক্তি, সমসাময়িক ভারতের সংরক্ষণ ব্যবস্থাকে প্রাসঙ্গিক রাখতে অত্যাবশ্যক হয়ে উঠেছে। SC-ST সম্প্রদায়ের ভেতরেও এখন আর্থিকভাবে সচ্ছল একটি অংশ তৈরি হয়েছে, যারা বহু ক্ষেত্রে সুযোগ সুবিধাগত দিক থেকে নিজেদের পায়ের তলার জমি শক্ত করেছে। অপরদিকে সবচেয়ে দরিদ্র, বোঝাপড়াহীন, হতদরিদ্র পরিবারগুলি সংরক্ষণের আওতার বাইরে থেকেই যাচ্ছে। ফলে অর্থনৈতিক মাপকাঠি যুক্ত করলে সংরক্ষণ তার লক্ষ্য, উদ্দেশ্যের আরও কাছে পৌঁছাবে বলেই মনে হয়। অর্থনৈতিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে SC-ST-র মধ্যে ক্রিমি লেয়ার চালু হলে প্রকৃত পিছিয়েথাকা অংশ আরও এগিয়ে আসতে পারবে। তাই উচ্চ প্রশাসনেও প্রতিনিধিত্ব বাড়াতে সহায়তা করবে, যা বৈচিত্র্যময় নেতৃত্ব গঠনে অপরিহার্য হয়ে উঠবে।
একই সঙ্গে, এটি সংরক্ষণ নীতিকে আরও বিশ্বাসযোগ্য, কার্যকর ও স্বচ্ছ করে তুলবে। আজকের ভারতে অর্থনীতি, সমাজ, শিক্ষা — সবক্ষেত্রে আকাশ পাতাল পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। সেই পরিবর্তনের সাথে সংরক্ষণের কাঠামো বদলানো না হলে, সেটি একসময় উদ্দেশ্য বহির্ভূত হয়ে পড়বে। রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক নীতিমালা ও ইতিহাসকে সম্মান জানিয়ে বর্তমানের সাথে সামঞ্জস্য রেখে এগোতে হবে। ভারতের সংরক্ষণের যাত্রা দীর্ঘ। কিন্তু প্রতিটি প্রতিজ্ঞাই নির্দিষ্ট সময়ের নিরিখে পুনর্মূল্যায়ন দাবি করে, যাতে তা তার লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত না হয়। সেই পুনর্মূল্যায়নের মুহূর্ত এখন উপস্থিত।








