নিউ ইয়র্কের মেয়র কে এই জোহরান মামদানী?
ট্রাম্পের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে কীভাবে জিতলেন এই অভিবাসী?
সব্যসাচী চক্রবর্তী
প্রখ্যাত পরিচালক মীরা নায়ারের ছেলে। তেত্রিশ বছরের জোহরান মামদানি। ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রার্থী। এই প্রথম নিউ ইয়র্কের মুসলিম মেয়র হতে চলেছেন।
তাবড় নেতাদের হারিয়ে মামদানির উঠে আসা, অন্যরকম। আমেরিকার রাজনীতিতে হাওয়া বদলের ইঙ্গিত। জেন জি-দের পালস বোঝেন। অভিবাসীদের ভোট টানতে উর্দুতে প্রচার করেছেন, তাতে ছিল দিওয়ারের মেরে পাস মা হ্যায়ের ডায়লগগুলো। ভিডিও ছিল স্প্যানিশে। এমনকি বাংলাতেও ভিডিও করে বাংলাদেশি আন্টিদের কাছে টেনেছেন তিনি। মামদানির মা মীরা নায়ার ভারতীয়। বাবা মাহমুদ মামদানি উগান্ডার। জোহরানের স্ত্রী সিরিয় বংশোদ্ভুত। অভিবাসীদের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাস্যাডর মামদানি।
পেশায় হাউসিং কনসাল্ট্যান্ট ছিলেন যোহরান মামদানি। সেখান থেকে কম আয়ের মানুষদের উচ্ছেদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আন্দোলনে জড়িয়ে পড়া। যে ইসলামোফোবিয়া আমেরিকায় জাঁকিয়ে বসেছিল, মামদানি সেটাকেই হাতিয়ার করেছেন শুরু থেকেই। একেবারে প্রান্তিক মানুষের হয়ে, তাদের কথা বলেছেন। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে, তিনি বনে গিয়েছিলেন জেন জি আইকন।
ভোট প্রচারে একেবারে বেসিক চাহিদাগুলোকে হাইলাইট করেছিলেন মামদানি। নির্দিষ্ট হারে বাড়িভাড়া, কম দামের বাড়ি, চাইল্ড কেয়ারকে আরও সহজলভ্য করা, বড়লোকিয়া সুপার মার্কেট না, শহরে ছোট ছোট সরকারি মুদিখানার চেন তৈরি করা, বড়লোকদের উপর ট্যাক্সের মতো বিষয়গুলো আম পাবলিক হামলে পড়ে নিয়েছে। আম আদমি পার্টির মতো, শহরে ফ্রি বাস সার্ভিসের আশ্বাসও ছিল তার। আর সব ভিডিও প্রচার, ছোট ছোট রিলস, একেবারে রাস্তায় নেমে, মিষ্টি খেতে খেতে, আড্ডা মারতে মারতে, জলে ডুবে, ঝাপিয়ে, একেবারে অন্যরকম। আমেরিকা এই ধরণের ভোট প্রচারে একেবারেই অভ্যস্ত ছিল না। মায়ের ভারতীয় ভাবনার প্রভাব যে ছেলের উপরেও আছে, তা স্পষ্ট। কোথাও গিয়ে আমেরিকায়, ভারতীয় ভোট ক্যাম্পেনের ছায়া এনে দিয়েছেন মামদানি। তাতেই বাজিমাত হওয়ার জোরদার সম্ভাবনা। কারণ তার সবকটা ক্যাম্পেন ভিডিও ভাইরাল

ইসলামোফোবিক আমেরিকায়, মুসলিম পরিচয়টাই মামদানির বড় হাতিয়ার। মামদানি, ইজরায়েল বিরোধী, ট্রাম্প বিরোধী, মোদী বিরোধী। ফলে তার নিজের দল ডেমোক্রেটিক পার্টিতেই তার অনেক সমালোচক। নিউ ইয়র্কে ইহুদিদের ভালো প্রভাব, সেখানেই তাদের সমালোচনা করেছেন মামদানি ভাই। নিউ ইয়র্কের রাজনীতির এফেক্ট গোটা আমেরিকাতে পড়ে। সেই কারণে মামদানি মেয়র বনে গেলে, তার পলিটিক্যাল স্টাইলের এফেক্ট গোটা দেশেই পড়তে পারে। আর কোথায় মামদানি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়েছেন ভাবুন, যেখানে কদিন আগেই তার দল, ডেমোক্র্যাটদের প্রার্থী কমলা হ্যারিস ভালো রকম ভোটে হেরেছিলেন। ফলে মামদানি জিতলে এটাই দাঁড়াবে, লোকে লেফট বা রাইট নয়, ভোট দিয়েছিলেন পছন্দের প্রার্থীকেই।
ট্রাম্প বহুত গালাগাল দিয়েছেন মামদানিকে। সে নাকি পাগলা কমিউনিস্ট। তার গলা খারাপ। কুচ্ছিত দেখতে। অনেকে আবার বলেছিলেন মামদানি যদি নিউ ইয়র্কের মেয়র হন, তো স্ট্যাচু অফ লিবার্টিকেও বোরখা পরিয়ে ছাড়বেন। কঙ্গনা রানাওয়াত বলেছিলেন মামদানির বক্তব্য ভারতীয় নয়, পাকিস্তানীদের মতো।

মামদানির কোনও পলিটিক্যাল বাবা ছিল না। প্রচুর টাকা ছিল না খরচ করার মতো। তাই রুট লেভেলে গিয়ে খেলেছেন। মনের কথা বলেছেন কোনও রাখঢাক না রেখে। বিকল্প পথের সন্ধান দিয়েছিলেন। মামদানির অ্যান্টি ক্যান্টিডেটদের হাতে ছিল মিডিয়া। মামদানির হাতে সোশ্যাল মিডিয়া। ফলে তার জয় হলে, মেনস্ট্রিম মিডিয়ার থেকেও, রাজনীতিতে সোশ্যাল মিডিয়ার শক্তি আর গুরুত্ব আরও বাড়বে। কারণ মামদানি খুব বোরিং জটিল পলিটিক্যাল বিষয়গুলো একেবারে জলের মতো করে বুঝিয়ে দিয়েছেন। র্যাঙ্ক ভোটিং কী, বুঝিয়েছেন বলিউডের গান আর লস্যির গ্লাসে।
মামদানি মেয়র হবেন কী না, তা জানতে সময়ের অপেক্ষা। কিন্তু যদি হন, তার এসব প্রস্তাব বাস্তবায়িত করা সহজ হবে?
যেমন এই বাড়িভাড়া নির্দিষ্ট হারে নেওয়ার বিষয়টা। নিউ ইয়র্কে বাড়ি ভাড়া বছর বছর বাড়ে। এবং তা বেশ চড়া। তার উপর গরীবদের জন্য আবাস যোজনা টাইপের সরকারি খরচে বাড়ি। বাড়ি মালিকরা কিন্তু মামদানির বিরুদ্ধে এককাট্টা হতে শুরু করে দিয়েছেন। ফলে মামদানি ভোটে জিতলে, ইন্টারেস্টিং হবে মার্কিন পলিটিক্স। ট্রাম্প ইন্টারেস্টিং করেছেন। মামদানি খেলা জমাবেন আরও।








