এসআইআর-এর গর্ভে কি এনআরসি? বিতর্ক উসকে দিয়েছেন অমিত শাহ নিজেই
আশাবুল হোসেন
এসআইআর-এর গর্ভে কি এনআরসি? এই বিতর্ক কি উসকে দেননি দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ নিজেই? তৃণমূল বা অন্যান্য বিরোধী দলকে শুধু শুধু দোষ দিয়ে লাভ কি? রাজ্যের বিজেপি নেতারা-সহ অনেকেই বলছেন, ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) হচ্ছে। ২০০২ সালেও হয়েছিল। এর সঙ্গে এনআরসি-র নাকি কোনো সম্পর্ক নেই। বিজেপির অভিযোগ, তৃণমূল এবং বিরোধীরা বিষয়টা নিয়ে অযথা রাজনীতি করছে। মানুষকে অকারণে ভীত সন্ত্রস্ত করছে। আপাতদৃষ্টিতে সেটাই মনে হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু এবারের এসআইআর- কে স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া যাচ্ছে না। কারণ, দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্বয়ং সম্প্রতি বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন, এবারের এসআইআর কার্যত এনআর সি-র প্রথম ধাপ। তাঁর বার্তা, এসআইআর-এর মাধ্যমে প্রথমে অবৈধ ভোটারদের চিহ্নিত
(ডিটেক্ট) করা হবে, তারপর তাঁদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ (ডিলিট) দেওয়া হবে। পরে বিতাড়িত করা (ডিপোর্ট)। অর্থাৎ ডিটেক্ট, ডিলিট ও ডিপোর্ট – এই থ্রি-ডি ফর্মুলার ওপর ভিত্তি করেই এবার এসআইআর। এই বক্তব্য জাহির করে বিজেপি সমর্থকদের দেদার হাততালিও কুড়িয়েছেন অমিত শাহজী। তাই এবারের এসআইআর নিয়ে বাংলা তথা দেশের নাগরিকদের একাংশ যদি আতঙ্কিত বোধ করেন, তাকে অকারণ বলে উড়িয়ে দিই কি করে? আতঙ্কের জেরে কেউ কেউ আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন বলে অভিযোগ। এর জন্য কে বা কারা দায়ী? প্রশ্ন থাকল। বিচার করবে জনতার আদালত।
অনুপ্রবেশকারীদের নাম দেশের ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিতে হবে। এ নিয়ে কারো কোনো আপত্তি থাকতে পারে না। কেউ আপত্তিও করছে না। কিন্তু অবৈধ ভোটার বাদ দেওয়ার অছিলায়, নানা নথির ছুতোয়, এসআইআর-এর মাধ্যমে যদি একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের নাগরিকত্ব হরণের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়, তাহলে বিতর্ক ও সমালোচনার ঝড় উঠবেই।
না উঠলে বরং সেটাই অস্বাভাবিক। অন্যায়ভাবে প্রকৃত নাগরিকদের বে-নাগরিক করার বিরুদ্ধে কেউ যদি প্রতিরোধ গড়ারও ডাক দেন, তাকেও অসাংবিধানিক বলা যায় না।
নথি নিয়ে নির্বাচন কমিশনের মনোভাব, নানা হুঁশিয়ারি ভোটার তালিকায় নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ার মতো একটি স্বাভাবিক বিষয়কে কার্যত নাগরিকত্ব যাচাইয়ের পরীক্ষায় পর্যবসিত করেছে। যদিও নাগরিকত্ব যাচাইয়ের অধিকার নিরবাচন কমিশনের নেই।
গরীব, পরিযায়ী, প্রান্তিক সমাজের পিছিয়েপড়ারা সংখ্যালঘু বা যে সম্প্রদায়েরই হন না কেন, তাঁদের যথাযথ কাগজ বা নথিপত্র না থাকার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ, নুন আনতে পান্তা ফুরানো সংসারে সাধারণত কাগজপত্র নিয়ে কারো মাথাব্যথা থাকে না। ভোটার কার্ড, রেশন কার্ড, আধার কার্ড (এসআইআর-এ যে নথিগুলোর কার্যত গুরুত্ব নেই) এর মতো কাগজপত্র তারা গুছিয়ে রাখেন। কারণ, এই নথিগুলি তাদের দৈনন্দিন জীবনে ও সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার মতো জীবিকা নির্বাহের কাজে লাগে।
তাই, সমাজের পিছিয়েপড়া, প্রান্তিক মানুষ, যারা আমাদের দেশের প্রকৃত নাগরিক, কমিশন নির্ধারিত প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের অভাবে তাদের জীবন দুর্বিষহ করে তোলা না হয়। সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি। প্রয়োজনে অন্যান্য বিকল্প পদ্ধতির মাধ্যমে যেন তাদের বৈধ নাগরিকত্ব যাচাই করা হয়। নির্বাচন কমিশন কোনো বিশেষ জনগোষ্ঠীকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে যেন কাজ না করে। কোনো অবস্থাতেই দেশের একজনও বৈধ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ যাবে না – এই নিশ্চয়তা শুধু মৌখিকভাবে দেওয়াই নয়, কমিশনকে তা কাজে বাস্তবায়িত করতে হবে। এই দাবি দেশের সমাজ সচেতন নাগরিক হিসাবে আমরা করতেই পারি।








