আয়করদাতা পৌনে ৭ শতাংশ, বকেয়া ৪৮ লক্ষ কোটি টাকা
নতুন পয়গাম, নয়াদিল্লি:
দেশের জনসংখ্যার মাত্র ৬.৬৮ শতাংশ নাগরিক আয়কর রিটার্ন ফাইল করেন। আর যদি এর মধ্যেও আয়করদাতার সংখ্যা হিসেব করা হয়, সেটা আরও কম। দেশের অর্থনীতির মজার পরিসংখ্যান হল, হাতেগোনা এই অংশের থেকেই বছরে প্রায় ২২ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি উপার্জন হয় কেন্দ্র সরকারের। চলতি বর্ষের ক্ষেত্রে অবশ্য অঙ্কটা একটু বদলাবে। কারণ, বার্ষিক ১২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত আয়ের ক্ষেত্রে কর ছাড়ের ঘোষণা করেছে মোদি সরকার। কেন্দ্রের হিসেব, এর জন্য প্রায় ১ লক্ষ কোটি টাকা কম আসবে রাজকোষে। আহলে সেই ঘাটতি পূরণের উপায় কী? দেশজুড়ে কেনাকাটার বহর বাড়াতে জিএসটি ছাঁটাই এবং উৎপাদন বৃদ্ধি। এ পর্যন্তও ঠিক ছিল। এবার গোদের উপর বিষফোঁড়া হয়েছে টালমাটাল আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির জেরে রপ্তানিতে টান। তাই কার্যত মরিয়া হয়ে ‘সোর্স’ বাড়ানোর দিকে মন দিয়েছে সরকার। আয়কর, তার উপর সুদ এবং জরিমানা — এসব মিলিয়ে হিসেব কষে কেন্দ্র দেখেছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের গোড়া পর্যন্ত বকেয়ার পরিমাণ প্রায় ৪৮ লক্ষ ১৮ হাজার কোটি টাকা! সেই টাকা আদায়ই এখন পাখির চোখ অর্থমন্ত্রকের। এই বিপুল অর্থ ‘উদ্ধারে’র জন্য ইতিমধ্যেই দপ্তরের কর্তাদের উপর চাপ তৈরি করা হচ্ছে এবং সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। চলতি অর্থবর্ষেই ৮ লক্ষ ২৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বকেয়া আদায়ের নির্দেশ দিয়েছে দপ্তর। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে তা অন্তত ২৫ হাজার কোটি টাকা।
কীভাবে বকেয়ার পাহাড় জমেছে আয়কর দপ্তরে? দপ্তরের কর্তাদের কথায়, সাধারণ মানুষ ও বাণিজ্যিক সংস্থাকে টিডিএস এবং অগ্রিম কর বা অ্যাডভান্স ট্যাক্স জমা করতে হয়। আয়কর রিটার্ন দাখিলের সময় যদি তারপরও কিছু বকেয়া থাকে, তা মেটাতে হয়। করদাতারা সঠিক কর দিলেন কি না, তা পরীক্ষার জন্য স্ক্রুটিনি হয়। সব ফাইলের কিন্তু নয়! বিভিন্ন মাপকাঠির উপর ভিত্তি করে বেছে নেওয়া হয় কিছু আয়করদাতাকে। যদি দেখা যায় আয়করদাতা যে কর মিটিয়েছেন, বাস্তবে তার থেকে অনেক বেশি মেটানোর কথা, সেই বকেয়া অর্থ মেটানোর নির্দেশ দেওয়া হয় তাঁকে। যাঁরা এই টাকা মেটান না, তাঁদেরই আয়কর বকেয়া হয়ে যায়।

এই পরিস্থিতিতে টার্গেট বেঁধে দিয়ে জারি হওয়া ‘ফতোয়া’তেই ক্ষোভের পাহাড় তৈরি হয়েছে আয়কর দপ্তরের অন্দরে। কর্মী ও অফিসারদের একাংশ বলছেন, এই বিপুল অঙ্কের বকেয়ার সঙ্গে যোগ রয়েছে নোট বাতিলেরও। সেই সময় বহু ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট রাতারাতি ভরে উঠেছিল বিপুল টাকার লেনদেনে। সেইসব টাকার তত্ত্বতালাশ করতে গিয়ে বহু করদাতার কাছে মোটা অঙ্কের আয়কর চেয়ে বসেছিল দপ্তর। সেসবই এখন মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠেছে। এক কর্তা জানান, নোট বাতিলের সময় বহু সংস্থা বা সাধারণ মানুষের অ্যাকাউন্টে টাকা পৌঁছে গিয়েছিল রাতারাতি। দ্রুত কালো টাকা সাদা করার আপ্রাণ চেষ্টায় অনেকেই তাঁদের পরিচিত একাধিক ব্যক্তির ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে বাতিল হওয়া ৫০০ ও হাজার টাকার নোট জমা করতে থাকেন। বাস্তবে দেখা যায়, আয়ের সঙ্গে সংগতি নেই, এমন বহু অ্যাকাউন্টে লক্ষ লক্ষ টাকা জমা হয়ে গিয়েছে। আয়কর দপ্তর ধরে নেয়, ওই টাকা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিই রোজগার করেছেন। সেই মতো তাঁদের বকেয়া আয়করের নোটিশ ধরানো হয়। তা বহু ক্ষেত্রেই আদায় সম্ভব হয়নি। বিপুল অঙ্কের বকেয়া আয়করের মধ্যে রয়ে গিয়েছে এই নোট বাতিলের অংশও। তার উপর বকেয়া আদায়ের ক্ষেত্রে তাঁদের নিধিরাম সর্দার করে রাখায় রীতিমতো ক্ষুব্ধ কর্তারা। কারণ, আগে তাঁরা আয়করদাতার সম্পত্তির দখল নিতে পারতেন। ব্যাঙ্ক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে ফিক্সড ডিপোজিট বা জমানো টাকা তাঁদের হাতে তুলে দেওয়ার নির্দেশ দিতে পারতেন। এখন সেই কাজের জন্যও অতি উচ্চ পদাধিকারীর অনুমতি নিতে হয়। সব মিলিয়ে পুরো বিষয়টা ভীষণ জটিল এবং কিম্ভুতকিমাকার।








