৭টি বিলাসবহুল গাড়ি কিনতে চেয়ে বিজ্ঞপ্তি বিতর্কে দুর্নীতি দমনের সর্বোচ্চ সংস্থা লোকপাল
নতুন পয়গাম, নয়াদিল্লি:
সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি অজয় মানিকরাও খানবিলকর বর্তমানে লোকপালের চেয়ারপার্সন। লোকপালের সাতজন আধিকারিকের জন্য ৭টি বিলাসবহুল বিএমডব্লিউ গাড়ি কেনার আর্জি জানিয়েছেন। এক একটি গাড়ি কিনতে খরচ হবে আনুমানিক ৭০ লক্ষ টাকা করে। অর্থাৎ লোকপালের কর্মকর্তাদের জন্য ৭টি গাড়ি কিনতে মোট খরচ হবে প্রায় ৫ কোটি টাকা। সিবিআই এবং ইদানীংকালে ইডি-র নাম সবাই জানলেও লোকপাল নিয়ে খুব একটা প্রচার নেই। তাই সাধারণ মানুষ জানেই না, এটা কী? এর কাজই বা কী? লোকপাল হল দেশের সর্বোচ্চ দুর্নীতিদমন বিভাগ। দুর্নীতি দমনে বিরাট কিছু অভাবনীয় সাফল্যের জন্য এই খবর নয়। লোকপাল সংবাদ শিরোনামে উঠে এল তাদের গাড়ি কেনার বিজ্ঞপ্তির কারণে।
ঘটনার বিবরণে প্রকাশ, ২-জি স্পেকট্রাম্প, কমনওয়েলথ গেমস ইত্যাদি দুর্নীতির অভিযোগে যখন জেরবার ইউপিএ-২ সরকার, তখন লোকপাল নিয়োগের দাবিতে অনশনে বসেছিলেন আন্না হাজারে। শেষ পর্যন্ত দেশের সর্বোচ্চ দুর্নীতিদমন বিভাগ হিসেবে লোকপালের সূচনা হলেও, দুর্নীতিদমনে তাদের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েই গিয়েছে। কারণ, জন্মলগ্ন থেকে এখন পর্যন্ত দুর্নীতি দমন বা নির্মূলে তেমন কোন আহামরি সাফল্য দেখাতে পারেনি লোকপাল। কিন্তু তাদের কর্মকর্তাদের আবদার হল সপ্তরথীই বিএমডব্লিউ চড়ে ঘুরবেন বা কাজে বের হবেন। সেই মতো বিজ্ঞপ্তি এবং টেন্ডারও প্রকাশ করা হয়েছে।

জানা গিয়েছে, গত ১৬ অক্টোবর প্রকাশিত সেই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘ভারতের লোকপাল স্বনামধন্য সংস্থার কাছ থেকে বিএমডব্লিউ-থ্রি সিরিজের এলআই গাড়ি সরবরাহের বরাত দিতে চাইছে’। এই বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হতেই দেশজুড়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। দুর্নীতি দমনের সর্বোচ্চ সংস্থার আধিকারিকদের এত বিলাসবহুল গাড়ির প্রয়োজন কী, তাঁরা ওই গাড়িতে চেপে কোথায় যাবেন, ইত্যাদি নিয়ে হইচই পড়ে গিয়েছে রাজনীতির অন্দর মহলে এবং নানা প্রশ্ন তুলছেন নেটিজেনরাও। দুর্নীতি-মুক্ত দেশ গড়ার অন্য্যতম মুখ ও সমাজকর্মী তথা সুপ্রিম কোর্টের বর্ষীয়ান আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণের বক্তব্য, ‘লোকপাল নামক প্রতিষ্ঠানকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে মোদি সরকার। মোদির আমলে লোকপাল নখদন্তহীন একটি সংস্থা। বহু বছর ধরে পদ খালি ছিল, তার পর যাঁদের নিযুক্ত করা হল, তাঁরা কাজ নিয়ে আদৌ ভাবিত নন। এখন তারা নিজেদের জন্য দামী গাড়ি কিনতে চাইছেন’। সর্বভারতীয় যুব কংগ্রেস সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছে, ‘লোকপাল একসময় দায়িত্বশীলতার প্রতীক ছিল, বর্তমানে তা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। কেন্দ্র সরকারের সবরকম দুর্নীতি দমন না করে এরা বরং দুর্নীতি ধামাচাপা দিতেই ব্যস্ত। তাই কেন্দ্রকে কটাক্ষ করে বলা হয়েছে, ৭০ লক্ষ টাকার বিএমডব্লিউ নয়, এদেরকে খুশি করতে বরং ১২ কোটির রোলস রয়েস উপহার দেওয়া হোক।
কংগ্রেসের তরফে লোকপালের কাজের খতিয়ান তুলে ধরে জানানো হয়েছে, গত পাঁচ বছরে মাত্র ২৪টি দুর্নীতির তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে লোকপাল। আর অভিযোগের পরই খারিজ ৯০ শতাংশ মামলা। মাত্র ৬টি অভিযোগের বিচার প্রক্রিয়ার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। যত অভিযোগ জমা পড়েছে সরকারি কর্মী, অফিসার এমনকী প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে, তার ৯০ শতাংশই খারিজ হয়ে গিয়েছে ‘পদ্ধতিগত ত্রুটি’র কারণে। দুর্নীতি সংক্রান্ত মোট যত অভিযোগ জমা পড়েছিল, তার মধ্যে ৩ শতাংশ প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে। অবশ্য তার একটাও ধোপে টেকেনি।

২০২২ থেকে লোকপাল পদ ছিল শূন্য। অবশেষে গত বছর চেয়ারম্যান পদে বসানো হয় অজয় মানিকরাও খানবিলকরকে। তৃণমূল সাংসদ সাগরিকা ঘোষ বলেছেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে তদন্ত নয়, জোর দেওয়া হচ্ছে বিলাসিতায়। মনে রাখতে হবে, বিচারপতি হিসেবে অবসর নেওয়ার আগে খানবিলকর তার শেষ রায়ে তদন্তের নামে ইডি-কে দেদার ছাড়পত্র দেন। কংগ্রেসের কটাক্ষ, প্রধানমন্ত্রী স্বদেশি ডাক দিচ্ছেন, আর লোকপাল সাত সদস্যের জন্য সাতটি বিএমডব্লু কিনছে? নীতি আয়োগের প্রাক্তন সিইও অমিতাভ কান্ত বলেছেন, লোকপালের উচিত, অবিলম্বে এই টেন্ডার বাতিল করে ইলেকট্রিক গাড়ির বরাত দেওয়া। যদিও প্রধানমন্ত্রীর নিজের রয়েছে রেঞ্জ রোভার, বিএমডব্লিউ বা মার্সিডিজ মেবাখের মতো বহু মূল্যবান সব গাড়ি, নিজে চড়ার জন্য কয়েক হাজার কোটি টাকার বিমানও কিনেছেন।
দুনীতির বিরুদ্ধে কার্যত জিহাদ ঘোষণা করে আন্না হাজারে, অরবিন্দ কেজরিওয়াল এবং তদানীন্তন প্রধান বিরোধী দল বিজেপি একজোট হয়ে সংসদ থেকে সড়ক অচল করে দিয়েছিল ২০১১ সালে। লোকপাল বিল পাশ, লোকপাল নিয়োগ পদ্ধতি নিয়ে সংসদে একের পর এক অধিবেশন অচল করে দিয়েছিল বিজেপি। ২০১৩ সালে অবশেষে সেই বিল পাশ হয়। পরের বছর ক্ষমতায় আসেন নরেন্দ্র মোদি। এবং তারপরই লোকপালকে ঠান্ডাঘরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
![]()
মোদি সরকারের প্রথম ৫ বছরে লোকপাল কমিটি ও চেয়ারপার্সনই নিয়োগ করা হয়নি। এরপর ২০১৯ সালের মার্চ মাসে প্রথম লোকপাল হিসেবে মনোনীত হন বিচারপতি পিনাকীচন্দ্র ঘোষ। ২০২২ সালে তিনি সরে যান। এরপর লোকপাল পদ শূন্য ছিল দু-বছর। ২০২৪ সালে আবার নতুন লোকপাল দায়িত্ব নেন। অর্থাৎ ১২ বছরে মাত্র দু-জন লোকপাল পদাসীন হয়েছেন। তাদের কাজে এ পর্যন্ত কেউ দোষী সাব্যস্ত হয়নি বা সাজা পায়নি। কংগ্রেসের কথায়, লোকপাল কেবল আইওয়াশ। হাতি পোষা ছাড়া কিছু নয়। কিন্তু তাদেরকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিলে, লোকপাল অনেক নজিরবিহীন কাজ করতে পারত।








