কমিউনিস্ট পার্টির ১০৫ বছরের ইতিহাস
মহম্মদ সেলিম
নতুন পয়গাম, কলকাতা:
( দ্বিতীয় কিস্তি )
লড়াই সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে:
কমিউনিস্ট পার্টি প্রথম থেকে সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। ধর্মীয় উন্মাদনা ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বিরুদ্ধে পার্টি দৃঢ় ভূমিকা পালন করেছে। ১৯৩৮-এ কারাগারের থাকাকালে মানবেন্দ্রনাথ রায় লেখেন,‘‘সনাতনী জাতীয়তাবাদের গেরুয়া পতাকার নিচে স্বরাজ, রামরাজ্য নয় বরং হিটলাররাজে পরিণত হবে, এমন সম্ভাবনা প্রবল।’’ দক্ষিণপন্থী, সাম্প্রদায়িক শক্তি বরাবর দেশে বামপন্থী, প্রগতিশীল ও ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিকে নিকেশের চেষ্টা করেছে। এ শুধু আমাদের দেশের দক্ষিণপন্থী শক্তির চরিত্র নয়; এই শক্তির পিছনে পূর্ণ মদত দিয়েছে সাম্রাজ্যবাদ। তারাই তৈরি করেছিল বিভিন্ন জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীকে। সেই শক্তিগুলি নিজের এবং অন্য দেশে কমিউনিস্ট, বামপন্থী, ধর্মনিরপেক্ষ, প্রগতিশীল শক্তিকেই তাদের শত্রু হিসাবে চিহ্নিত করে হামলা ও আক্রমণ শুরু করে। যে ধর্ম কিংবা জাতের নামে তারা সমাজকে ভাগ করতে চায়, শাসন করতে চায়, সেই ধর্ম কিংবা জাতের অন্তর্ভুক্তির মধ্যেও যারা প্রগতিশীল, ধর্মনিরপেক্ষ, তাঁদেরও আক্রমণ করে তারা। আসলে ধর্মনিরপেক্ষ, প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক শক্তিকে দুর্বল না করতে পারলে মৌলবাদী, সাম্প্রদায়িক শক্তি সমাজকে, দেশকে কলুষিত করতে পারে না। আর যেহেতু সেই ধর্মনিরপেক্ষ, প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক মানুষ কিংবা সংগঠনগুলির মধ্যে কমিউনিস্টরা অগ্রগণ্য এবং সবচেয়ে সোচ্চার তাদের দর্শনের কারণে, তাই কমিউনিস্টরা এই ধর্মোন্মাদ শক্তির আক্রমণের লক্ষ্য হয় আগে। নাৎসি জার্মানি থেকে বিভিন্ন দেশে এর উদাহরণ আমরা দেখেছি। আমাদের দেশেও অভিজ্ঞতা তাই। আমাদের দেশে নয়া ফ্যাসিবাদী শক্তির উত্থান দেখা গেছে। এই সময়েও দেখা গেছে তাদের আক্রমণের প্রধান লক্ষ্য আমরাই। আসলে এই দ্বন্দ্ব মতাদর্শগত। তাই সব ধরনের মৌলবাদী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই জারি রাখতে হবে আমাদের।
আমাদের দেশে ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র তৈরির প্রোজেক্ট চলছে। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি যা একসময় ছিল ছিদ্র, আজ বড় গহ্বরে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন প্রতীক, চিহ্নকে ব্যবহার করে মাথা তুলছে উগ্র দক্ষিণপন্থী এই শক্তিগুলি। এমন সময়ে প্রবল মন্দায় আক্রান্ত দেশ। মানুষের রুটিরুজি সঙ্কটে। কাজের হাহাকার, কৃষক ফসলের দাম পাচ্ছেন না। খেতমজুরের মজুরি বাড়ছে না, কাজ হারাচ্ছেন শ্রমিকরা। তাই কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলার প্রথম দিকেই শ্রমিক, কৃষক, ছাত্রদের সংগঠন তৈরি হয়েছিল। পরবর্তীকালে যুব এবং গড়ে তোলা হয় সাংস্কৃতিক সংগঠন। সব ধরনের মাধ্যমকে ব্যবহার করে সৃষ্টিশীলতাকে উৎসাহিত করেছিল কমিউনিস্ট পার্টি। আইপিটিএ গড়ে তোলার কয়েক বছরের মধ্যে এল ’৪৩-এর মন্বন্তর। তখন যেমন ‘নবান্ন’ নাটক হয়েছে, কালজয়ী গান লেখা হয়েছে, তেমনই আইপিটিএ’র সিদ্ধান্ত অনুসারে খাজা আহমেদ আব্বাসকে দিয়ে ‘ধরতিকে লাল’ চলচ্চিত্র তৈরি হয়েছে। এটি একটি উদাহরণ। তখন তা ছিল নতুন মাধ্যম। কমিউনিস্ট পার্টি তা ব্যবহার করেছে। আবার প্রায় সেই সময়েই মহিলা আন্দোলন গড়ে উঠেছে। তৈরি হয়েছে মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি। একদিকে তা সেবামূলক কাজ করেছে। আবার মহিলাদের নির্যাতন, পাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। একদিকে সাম্প্রদায়িক হানাহানির বিরুদ্ধে প্রচার করেছেন, সমাজে ঐক্য-সংহতি গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে। আবার সেই সময়েই মহিলাদের আর্থিকভাবে স্বনির্ভর করা, উপার্জনের বিভিন্ন প্রচেষ্টাকে উৎসাহিত করেছে।
বর্তমানে রাজ্যে এবং দেশে মহিলারা আক্রান্ত। একদিকে স্কুলে কলেজে ড্রপ আউট বাড়ছে, নাবালিকা বিয়ে বাড়ছে, নারী পাচার বাড়ছে। অন্যদিকে কাজের অনিশ্চয়তায় ভুগছে নারী সমাজ। সমাজে এখন নারীদের বিরাট অংশ কাজের সন্ধানে থেকেও কাজ পাচ্ছেন না। আমাদের রাজ্যে রামমোহন, বিদ্যাসাগরের ঐতিহ্যকে অস্বীকার করে পিছিয়ে যাওয়ার মানসিকতা, দর্শন উৎসাহিত করছে দুই শাসক দল। মহিলাদের সাহস বাড়ানো, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বদলে মুখ্যমন্ত্রী এমন কথা বলছেন, যাতে অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে ওঠার দুঃসাহস পাচ্ছে। যে সংস্কৃতি, জীবনচর্চার জন্য আমাদের রাজ্য ছিল দেশের প্রগতিশীল, ধর্মনিরপেক্ষ মানুষের ভরসাস্থল, সেই রাজ্যে তৃণমূল এমন পরিবেশ সৃষ্টি করছে, যাতে সাম্প্রদায়িক এবং পিছিয়ে থাকা সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতা উৎসাহিত হচ্ছে। যার সুযোগকে কাজে লাগাচ্ছে নয়া ফ্যাসিবাদী শক্তি। রাজ্যে উগ্র দক্ষিণপন্থার পরিসর বাড়িয়ে তোলায় ভূমিকা পালন করছে রাজ্যের শাসক দল। সম্প্রতি দুর্গাপুরে এক ছাত্রী ধর্ষিতা হওয়ার পর মুখ্যমন্ত্রী মহিলাদের রাতে বাইরে বেরোনো উচিত নয় বলেছেন। অন্যদিকে, সেই একই সময়ে বিজেপি-শাসিত গুজরাটে আহমেদাবাদ পুলিশ রাস্তায় ‘ধর্ষণ এড়ানোর জন্য বেশি রাতের পার্টি এড়িয়ে চলুন’ লেখা পোস্টার সাঁটিয়েছে রাস্তাগুলিতে। এরা ইতিহাসের চাকাকে পিছন দিকে নিয়ে যেতে চাইছে। কিন্তু মানব সভ্যতার ইতিহাস বলছে স্বাধীনতাকামী, মুক্তিকামী মানুষের অগ্রগতি দমিয়ে রাখা যায় না।
আন্দোলনই পথ:
দুর্নীতি যেহেতু প্রাতিষ্ঠানিক চেহারা নিয়েছে, তাই দুর্নীতি-বিরোধী এই লড়াই গণতন্ত্র রক্ষার লড়াইয়ের অংশ হয়ে উঠেছে। নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে সামনের সারিতে দেখা যাচ্ছে আমাদের পার্টিকে। শুধু প্রতিবাদ নয়, নারীদের আত্মরক্ষা এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে সক্ষম করে তোলার জন্যও পার্টি কাজ শুরু করেছে। বিভিন্ন জায়গায় ইতিমধ্যেই গড়ে তোলা হচ্ছে মহিলা ব্রিগেড।
আমরা আমাদের পার্টির রাজ্য সম্মেলনে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, আন্দোলনমুখী সংগঠন গড়ে তুলতে হবে। ভোটে কারচুপি হোক কিংবা মানুষের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার চক্রান্ত, অথবা ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর)-এর নামে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার ষড়যন্ত্রই হোক, তার জন্য বুথস্তর থেকে দৃঢ়, আন্দোলনমুখী সংগঠন গড়ে তোলাই আজকের প্রধান কাজ। তার জন্য ‘গ্রাসরুট লেবেল স্ট্র্যাটেজি’ নিতে হবে। অর্থাৎ মানুষের প্রতিদিনকার সমস্যা, বিভিন্ন এলাকায় সেখানকার মানুষের ভিন্ন সঙ্কট নিয়ে আমাদের আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। যেসব ক্ষেত্রে সেই কাজ হচ্ছে সেসব এলাকায় সাড়াও পাওয়া যাচ্ছে বিপুল। তাকে আরও ব্যাপকভাবে সর্বগামী করে তুলতে হবে। প্রচলিত আন্দোলনের পাশপাশি দলিত, তফসিলি জাতি, আদিবাসী, সংখ্যালঘুদের সমস্যা নিয়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলাও আজকের দাবি।
পার্টির আজকের ১০৬তম প্রতিষ্ঠা দিবসে আমরা শপথ নেবো, আন্দোলনই পথ পরিস্থিতি পরিবর্তনের। প্রতিদিন পথে থাকব আমরা; পথে নেমেই ভবিষ্যতের পাথেয় জোগাড় করব। আরও অনেক মানুষকে সংগঠিত করব, মানুষের চাহিদাকে বুঝে সেই অনুসারে দাবি নির্দিষ্ট করব এবং তাঁদের সমস্যা, আশা আকাঙ্ক্ষাকে আন্দোলনে রূপায়িত করব। শুধু সেখানেই দায়িত্ব শেষ হয় না, সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতা রক্ষা করব।
( সমাপ্ত )

( লেখক সিপিএম এর রাজ্য সম্পাদক )








