এসআইও থেকে আমরা কী পেলাম
বিশেষ প্রতিবেদন
‘দিনশেষে সংগঠন কী দিয়েছে?’– এ প্রশ্নের হিসেব করতে বসলে দিনের শেষ থাকবে কিনা বলা সত্যিই কঠিন। কারো কাছে সংগঠন মানে জীবন, কারো কাছে অস্তিত্ব, আবার কারো কাছে হয়ত কিছুই নয়। আমরা এমন এক পৃথিবীতে বাস করি, যেখানে চাওয়া-পাওয়ার তালিকা যেন অন্তহীন; এই পৃথিবীর সবটুকু আমরা পেতে চাই, নিংড়ে নিতে চাই, এমনকি তার অস্তিত্বকেও দখলে আনতে চাই। তেমনি পৃথিবীর গুটিকয় মানুষের একটি সংগঠন এসআইও। তার কাছ থেকেও আমাদের প্রত্যাশা সীমাহীন। বিভিন্ন প্রোগ্রামে, সভা-সেমিনারে কিংবা সফরে মাঝেমাঝে শুনতে হয়, “আপনারা ভাই এখনো অনেক পিছিয়ে আছেন, কী বা করলেন! না আছে জনবল, না আছে সৃজনশীল শক্তি।” কথাগুলো কানে লাগে, ভেতরে কোথাও একটা চিন্তা জাগে! সত্যিই তো আল্টিমেটলি সংগঠন আমাদের কী দিয়েছে? এসআইও থেকে আমরা কী পেলাম? – এর উত্তর খুঁজতে গেলে একটা দৃষ্টিভঙ্গিজনিত প্রশ্ন আসে। ‘সংগঠনকে আমরা কোন চোখে দেখি?’
একজন যুবক, যে একসময় এসআইও-র সঙ্গে কিছু দিন কাটিয়েছিল, যখন জীবনের সান্ধ্যবেলায় সমস্ত উপাধি, পরিচয়, অর্জনকে ছিঁড়ে ফেলে নিজের অস্তিত্বকে পৃথিবীর ওপর ছেড়ে দিয়ে, এই সংগঠনের অস্তিত্ব নিয়ে ভাবতে বসে, তখন তার অবচেতন মনের কারখানায় এক রঙমিস্ত্রি জেগে ওঠে। সেই রঙমিস্ত্রি যেন বলে ওঠে, “তুমি তো হতে পারতে একেবারে অন্য কেউ! হাতে সিগারেট, শার্টের গলার নীচের প্রথম দুটো বোতাম খোলা, পাড়ার সবচেয়ে হ্যান্ডসাম ‘হট’ ছেলে, কিংবা তথাকথিত গুটকাখোর পুরুষত্বের আইকন। কিংবা ধরো, তুমি হতে পারতে স্কুলের সবচেয়ে ইউনিক ছেলে, মেয়েদের ইমপ্রেস করতে, হইহুল্লোড়ে সবাইকে মাতাতে পারতে। যদি মাঝপথে ফেল করতেও, তাতে তোমার কিছুই যেত আসত না। কারণ, ততদিনে তুমি হয়ত পর্নোগ্রাফির অবাধ জগতের নিয়মিত অতিথি, আর পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে টোটো করে ঘুরে বেড়ানোয় অভ্যস্ত হয়ে যেতে।”
রঙমিস্ত্রি আবার আরেকটা ছবি আঁকে, “তুমি হতে পারতে ক্ষমতাধর কোনো যুব নেতা, ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট। দাদা বা দিদির দলে নাম লিখিয়ে একটা শক্তপোক্ত পদ পেতে পারতে। ক্ষমতা জাহির করে অন্যদের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারতে, দুর্নীতি করে নিজের জায়গা পাকাপোক্ত করতে পারতে।”
কিন্তু যখন পরিশ্রান্ত শরীর জীবনের সান্ধ্যকালীন মুহূর্তে উপস্থিত হয়, আর অঝোরে বর্ষা নামে, তখন জীবনের সব রঙ ভেসে যায় সেই বৃষ্টিতে। সেই যুবক ভাবে, “এত কিছু হতে পারতাম-এর যুগে, আমি না হয় হয়ে গেলাম একটু ‘ইন্ট্রোভার্ট’, পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়া এক ব্যাকডেটেড মানুষ, যে কথায় কথায় সালাম দেয়, সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, ইনশাআল্লাহ বলে, সমাজ ও ছাত্র-যুবদের কল্যাণে নিঃশব্দে নিজের জীবনকে বিলিয়ে দেয়।”
সে অনুভব করে, ‘বসন্তের কোকিলের গলা টিপে আমি সেখানে ফুটিয়ে তুলেছি শরতের পেঁজা মেঘ; দুনিয়া যে রঙ হৃদয়ে লাগাতে চেয়েছিল মরুভূমি বানানোর ইচ্ছায়, আমি সেখানে ভাসিয়ে দিয়েছি হেদায়েতের সমুদ্র।’
জীবনে এর থেকে বেশি কিছু চাওয়া-পাওয়ার আছে কী? হয়ত নেই। কারণ, হেদায়েতের চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে একজন মানুষের জীবনে? আমি তখন খুবই ছোট সংগঠনের এক প্রোগ্রামে একজন বক্তাকে বলতে শুনেছিলাম, “এসআইও তার এই চল্লিশ বছরের যাত্রাপথে কয়েক হাজার ছাত্র-যুবককে জাহান্নামের পথ থেকে জান্নাতের পথে নিয়ে এসেছে।” হয়ত এটাই এসআইও-র সবথেকে বড় পরিচয় এবং এর চেয়ে বড় কোনো পরিচয় হয়ত তার প্রয়োজনও নেই।








