আরএসএস-বিজেপির সমন্বয়ে ঘাটতি দেশজুড়ে মাশুল দিতে হচ্ছে গেরুয়া ব্রিগেডকে
নতুন পয়গাম, কলকাতা:
বিজেপির তাত্ত্বিক পরামর্শদাতা তথা মতাদর্শগত অভিভাবক সংগঠের নাম হল রাষ্ট্রীয় স্বয়ম সেবক সংঘ। সংক্ষেপে বলা হয় সংঘ পরিবার বা আরএসএস। কিন্তু ২০১৪ সালে কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদি সরকার গঠন করার পর থেকেই আরএসএস অনেকটা দুর্বল হয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ আরএসএস-কে মোদি-শাহ-নাড্ডাদের নেতৃত্বাধীন বিজেপি খুব বেশি গুরুত্ব বা পাত্তা দিচ্ছে না। এই নিয়েই সংঘ পরিবারের সবথেকে গুরুত্বূপর্ণ শাখা হয়েও বিজেপির সঙ্গে সম্পর্কে চিড় ক্রমেই ফাটলে পরিণত হয়েছে। বছর দুয়ে ক আগে বিজেপির জাতীয় সবাপতি জেপি নাড্ডা বলেছিলেন, আরএসএস-এর এখন আর অত বেশি গুরুত্ব নেই। বিজেপির মাথার ওপর আরএসএস বা তাদের হাত থাকলেই হবে। এর থেকে বেশি অতি সক্রিয় ভূমিকা না নেওয়াই সংঘের কাম্য। কারণ হিসেবে নাড্ডা এও বলেছিলেন, মোদি-শাহের হাত ধরে বিজেপি এখন অনেক বেশি শক্তিশালী হয়েছে। মোদি-শাহের ঘরানায় বিজেপি এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ। সুতরাং গত এক দশকে সংঘের সঙ্গে বিজেপির স্নায়ুযুদ্ধ তুঙ্গে — এ আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

এদিকে জাতীয় স্তরে দেখা যাচ্ছে, প্রায় বছর ঘুরতে চলেছে, বিজেপির কেন্দ্রীয় সভাপতি নাড্ডার মেয়াদ ফুরিয়ে গিয়েছে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত এই মহাগুরুত্বপূর্ণ পদে নতুন নিয়োগ হয়নি বা নাড্ডাকে পুনরায় নিয়োগও দেওয়া হয়নি। যা কিছু বা যা খুশি তা-ই করছেন মোদি-শাহ জুটি। এসব ব্যাপারে সংঘ পরিবারকে খুব একটা পাত্তা দিচ্ছেন না তারা। এমনই চাপা অভিযোগ ও গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে নাগপুরের কর্মকর্তাদের মুখে। উল্লেখ্য, নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় সরকারে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ছিলেন নাড্ডা। তার আগে সভাপতি ছিলেন অমিত শাহ। তিনি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়ার পর নাড্ডাকে মন্ত্রী পদ থেকে সরিয়ে দলীয় সভাপতি করা হয়। তারপর তৃতীয় এনডিএ সরকারে পুনরায় নাড্ডাকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী করা হয়। একই সঙ্গে দলীয় সভাপতি পদেও রাখা হয়। এখন সভাপতি পদের মেয়াদ ফুরিয়ে গেলেও বছর খানেক ধরে দিব্যি চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

যদিও বিজেপির দলীয় সংবিধানে ‘এক ব্যক্তি, এক পদ’ নীতি রয়েছে। নাড্ডার ক্ষেত্রে তা লঙ্খন করা হচ্ছে বলে গেরুয়া শিবিরিরে চাপা ক্ষোভ ও গুঞ্জন রয়েছে। একইভাবে ৭৫ বছর পেরলেই পার্টি কিংবা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা যাবে না — এহেন কঠোর নিয়মের বলি হয়ে অনেক আগেই পথের কাঁটা সরিয়ে রাজনীতি থেকে মার্গ দর্শক বানিয়ে সন্ন্যাসে পাঠানো হয়েছে লালকৃষ্ণ আদবানি, মুরলি মনোহর যোশীর মতো দলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদেরকে। গত ১৭ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বয়স ৭৫ বছর পূর্ণ হয়েছে। কিন্তু তিনি তারপরেও সাফ বলেছেন, তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়বেন না। এবার থেকে আরো বেশি দেশসেবার কাজ করবেন। তার আগে অবশ্য সংঘ পরিবারের গৃহকর্তা মোহন ভাগবত বলেছিলেন, ৭৫-এ পড়লে পদ ছেড়ে দিয়ে নতুনদের দায়িত্বে আনা উচিত। মোদিকে ইংগিত করে নিজেও পদ ছাড়ার কথা বলেছিলেন। কিন্তু শেষমেষ মোদি এবং মোহন ৭৫ পেরিয়েও স্বপদে স্বমহিমায় রয়েই গেলেন। ডিগবাজি খেয়ে ভাগবত বললেন, দেশবাসী সতদিন চাইবে, ততদিন দেশের সেবা করতে হবে। এতে বয়সের ঊর্ধ্বসীমা বলে কিছু হয় না। এদিকে পদে থাকার অঙ্গীকার করে ২০৪৭ সালে দেশের স্বাধীনতার ১০০ বছর উপলক্ষে একের পর এক সরকারি প্রকল্প ঘোষণা করে চলেছেন মোদি। অর্থাৎ বলতে চাইছেন, তিনি আরো ২২ বছর ক্ষমতায় থাকবেন। যদিও তখন তার বয়স হবে ৯৭ বছর।
সব মিলিয়ে বলাবাহুল্য যে, জাতীয় পর্যায়ে সংঘ ও বিজেপির মধ্যে নীতিগত কারণে নানা ইস্যুতে মতভেদ ক্রমেই বাড়ছে। স্বভাবতই নাগপুরের সঙ্গে দিল্লির দূরত্ব বাড়ছে। কয়েক মাস আগে লোকসভা ভোটের আগে বিজেপি সভাপতি নাড্ডা রাখঢাক না রেখেই বলেছিলেন, বিজেপি এখন সাবালক হয়ে গিয়েছে। আরএসএস-এর আর প্রয়োজন নেই। বিষয়টি নিয়ে সঙ্ঘের নেতারা অসন্তোষ ব্যক্ত করেন। ২৪ এর লোকসভা ভোটে তার ফলও হাতেনাতে পেয়ে ছে মোদি-শাহ-নাড্ডাদের বিজেপি। ৪০০ পার করার হম্বিতম্বি করে শেষমেষ জুটেছে ২৪০। কেন্দ্রে সরকার গঠনের ম্যাজিক ফিগার ছুঁতে না পেরে নতজানু হয়ে নাইডু-নীতীশ ও কয়েকটা ছোট দলকে নিয়ে জোট সরকার করতে হয়েছে বিজেপিকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মোদির জামানায় সংঘ পরিবারের সহ্গে বিজেপির তালমিল বা সমন্বয়ের অভাব প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। এখন আর সেভাবে সরকার ও মতাদর্শগত দিকের সঙ্গে সেভাবে সেতুবন্ধন করতে পারছে না আরএসএস।








