গোর্খাল্যান্ড নিয়ে ফের রাজ্য-দিল্লি চাপান উতোর কেন্দ্রীয় মধ্যস্থতাকারী নিয়োগে ক্ষুব্ধ মমতা, মোদিকে চিঠি
নতুন পয়গাম, কলকাতা:
ভোটের মুখে প্রতিবারই নানারকম অনভিপ্রেত বিষয় মাথাচাড়া দেয়। নানা রকম নিত্য নতুন দাবি-দাওয়া ঘিরে রাজনীতির পারদ চড়তে থাকে। পুরনো ইস্যু ও মামলা নতুন করে মা্থাচাড়া দেয় ভোটের আবহে। এমনই এক বস্তাপচা ইস্যু আবারও সামনে এল। সেটা যদিও খুবই স্পর্শকাতর বিষয়। বিচ্ছিন্নতাবাদী বিভিন্ন গোষ্ঠী ভোটের মুখে নতুন করে অক্সিজেন পায়। তাই তারা সময়ের অপেক্ষায় থাকে। এবার আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের সামনে ফের বঙ্গভঙ্গের পুরনো আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। রাজ্যের অভিযোগ, এতে উসকানি দিচ্ছে কেন্দ্রের শাসকদল বিজেপি।
আর মাত্র মাস পাঁচেক পর পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন। তার আগে আচমকা পাহাড়-ডুয়ার্সে মধ্যস্থতাকারী নিয়োগের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করল কেন্দ্র সরকার। তাও আবার একতরফা। রাজ্য সরকারের সঙ্গে কোন আলোচনা না করেই এমনটা করায় বেজায় চটেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। অতি সম্প্রতি বন্যায় বিপর্যয়ের ক্ষত সেরেছে উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোতে। সবে মাত্র ঘুরে দাঁড়াচ্ছে পাহাড়-ডুয়ার্স। এই সংবেদনশীল পরিস্থিতিতে স্পর্শকাতর রাজ্যভাগের বিষয়ে কেন্দ্রের এই পদক্ষেপকে ফের গোর্খাল্যান্ডে জিগির তোলার কৌশল বলে মনে করছেন অনেকে। এভাবে রাজ্য সরকারকে ভোটের মুখে ব্যস্ত বা হয়রান করাই এর একমাত্র নেপথ্য অবিসন্ধি। চরম ক্ষুব্ধ হয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কেন্দ্রের তরফে মধ্যস্থতাকারী নিয়োগের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে শনিবার চিঠি লিখেছেন প্রধানমন্ত্রীকে।

উল্লেখ্য, ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের ইস্তাহারে পাহাড়ের ‘স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের’ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিজেপি। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী তথা রাজ্য সরকারের আপসনহীন আন্দোলনে সেই পরিকল্পনা তখনকার মতো ব্যাকফুটে চলে যায়। পরে ফের বঙ্গভঙ্গের জিগির তোলেন বিজেপি ও তাদের মদদপুষ্ট পাহাড়ের কিছু লোকজন ও গোষ্ঠী। কিন্তু তাতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেওয়ায় শেষবার ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের ইস্তাহারে এ ব্যাপারে আর উচ্চবাচ্য করার সাহস পায়নি গেরুয়া শিবির। কিন্তু বাংলাকে ভাগ করে টুকরো করে দুর্বল করার গোপন ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত জারি রয়েছে। এবার তা ফের প্রমাণ হল শুক্রবার রাতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নির্দেশিকায়। এতে জানানো হয়েছে, প্রাক্তন আইপিএস অফিসার তথা প্রাক্তন ডেপুটি জাতীয় সুরক্ষা উপদেষ্টা পঙ্কজ কুমার সিংকে পাহাড়-ডুয়ার্সের কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি বা মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিযুক্ত করেছে মোদি সরকার। এর আগে ইউপিএ আমলেও ২০০৯ সালেও একই পদক্ষেপ করা হয়। প্রাক্তন লেফটেন্যান্ট জেনারেল বিজয় মদনকে মধ্যস্থতাকারী নিয়োগ করে তৎকালীন মনমোহন সিং সরকার। কিন্তু, সেই সময় গোর্খাল্যান্ড ইস্যু জোরদার মাথাচাড়া দিয়েছিল। তদানীন্তন কেন্দ্র সরকার এটা করতে বাধ্য হয়েছিল। অথচ এবার একেবারে শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতিতে সেই কাজ করছে কেন্দ্র সরকার। এটা কার্যত নজিরবিহীন এবং রাজ্য ভাগের আশঙ্কা আরও জোরদার করেছে। এই ইঙ্গিতও মিলেছে দার্জিলিংয়ের বিজেপি সাংসদ রাজু বিস্তার সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে। তাঁর বার্তা, ‘ইতিহাসে প্রথমবার এমন ঘটনা ঘটেছে, যখন কোনও রক্তপাত ছাড়াই, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং প্রাণহানি না হওয়া সত্ত্বেও মধ্যস্থতাকারী নিযুক্ত করল কেন্দ্র সরকার। এটা পাহাড়, তরাই এবং ডুয়ার্সের মানুষের নৈতিক জয়।’
এর প্রতিবাদেই এদিন গর্জে ওঠেন মমতা। প্রধানমন্ত্রীকে তিনি চিঠি লিখে বলেছেন, ‘বর্তমানে পাহাড়ে সম্পূর্ণ শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিরাজ করছে। এই শান্তির বাতাবরণ ধরে রাখতে গোর্খা সম্প্রদায় বা গোর্খাল্যান্ড টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (জিটিএ) সংক্রান্ত যে কোনও সিদ্ধান্ত, রাজ্যের সঙ্গে আলোচনা করেই নেওয়া প্রয়োজন। এমন স্পর্শকাতর বিষয়ে কেন্দ্রের একতরফা সিদ্ধান্ত শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থে হতে পারে না। কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক বা দেশের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে গুরুত্ব দিয়ে অবিলম্বে মধ্যস্থতাকারী নিয়োগের নির্দেশিকা প্রত্যাহার করা হোক।’
মুখ্যমন্ত্রীর সাফ কথা, ‘পাহাড়ে মধ্যস্থতাকারী নিয়োগের বিষয়টি জিটিএ-র প্রশাসনিক কাজকর্ম, শান্তি এবং প্রশাসনিক স্থায়িত্বের সঙ্গে জড়িত। আর জিটিএ রাজ্যের অধীন একটি স্বশাসিত সংস্থা। ফলে কেন্দ্রের একতরফা এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রীয় পরিকাঠামোর পরিপন্থী ও সাংঘর্ষিক।’
অবশ্য এতে খুশি গোর্খাল্যান্ডের দাবিতে লড়াই করা গোর্খা ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট (জিএনএলএফ)। বছর তিনেক পর এপ্রিলের প্রথমদিকে নয়াদিল্লিতে গোর্খা প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নিত্যানন্দ রাই। তাতে উপস্থিত ছিলেন পাহাড়ের বিজেপি সাংসদ রাজু বিস্তাও। সেখানেই গোর্খাল্যান্ড ইস্যুর স্থায়ী সমাধানের দাবি নতুন করে আলোচনায় উঠে আসে বলে সূত্রের খবর। পুরো বিষয়টিকে ভোটের আগে নির্বাচনী চমক আখ্যা দিয়ে পাহাড়ের তৃণমূল সভাপতি এল.বি রাই বলেছেন, এভাবে রাজ্য ভাগের ষড়যন্ত্র মেনে নেওয়া হবে না।
‘বর্তমানে পাহাড়ে সম্পূর্ণ শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিরাজ করছে। এই শান্তির বাতাবরণ ধরে রাখতে গোর্খা সম্প্রদায় বা গোর্খাল্যান্ড টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (জিটিএ) সংক্রান্ত যে কোনও সিদ্ধান্ত, রাজ্যের সঙ্গে আলোচনা করেই নেওয়া প্রয়োজন। এমন স্পর্শকাতর বিষয়ে কেন্দ্রের একতরফা সিদ্ধান্ত শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থে হতে পারে না। কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক বা দেশের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে গুরুত্ব দিয়ে অবিলম্বে মধ্যস্থতাকারী নিয়োগের নির্দেশিকা প্রত্যাহার করা হোক।’
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়








