জাতীয় শিক্ষানীতি: ফুটোপাত্রে সুপেয় পানীয়
স্নিগ্ধদীপ চক্রবর্তী
নতুন পয়গাম:
২০২০-তে করোনার আবির্ভাব এবং মিশ্রপাঠ-পদ্ধতি (Choice-based Credit System বা CBCS)-র তিরোভাব প্রায় একইসঙ্গে। অথচ ‘রজনীকান্ত আয়া’-র মতো প্রবল ঢাকবাড়িতে এর জন্ম হয়েছিল। অকাল মরণের মধ্য দিয়ে মহাপ্রাণ সিবিসিএস আমাদের জন্য যা দান রেখে গেল, তারই নাম জাতীয় শিক্ষানীতি (New Education Policy বা NEP)। শিক্ষানীতি প্রণয়নের ইতিহাস ঘাঁটলে অবশ্য National Policy of Education বা NPE (১ম খসড়া: ১৯৮৬, পরিমার্জিত ২য় খসড়া: ১৯৯২)-তে এর বংশ-বীজ খুঁজে পাওয়া যাবে।
আমরা, যারা ‘জুরাসিক যুগ’-এর শিক্ষাব্যবস্থায় পড়াশোনা করেছি, যাদের সামনে অনার্স-পাসের সুস্পষ্ট ও সুসংগত বিভাজন ছিল, আমরা যারা বার্ষিক পরীক্ষায় বসতাম, গৌরবোজ্জ্বল প্রাচীন ভারতের শেষ ছটার মতো আমরা যারা পেয়েছিলাম কিছু প্রণম্য গুরুকে — তারা ঈশ্বর গুপ্ত-র মতো যুগসন্ধিতে পড়ে গেলাম। যে ভারত একদিন চিরন্তন জ্ঞান, নিত্যনব ধারণা ও নাড়া দেওয়া দর্শনের জন্ম দিয়েছিল; যেখানে জ্ঞান (Knowledge), প্রজ্ঞা (Wisdom) এবং সত্য (Truth)-এর ত্রিবেণি সংগমকে জীবনের পালনীয় পথ, ঈর্ষনীয় সঞ্চয় ও রক্ষণীয় স্তম্ভ বলে মনে করা হত — সিবিসিএস তাতে প্রথম ধাক্কাটা দিল। ‘জ্যাক অব অল ট্রেড্স’ বানানোর রাষ্ট্রীয় খেলা কাউকে ‘মাস্টার’ হতে দিল না। গণহারে অ্যারিস্টট্ল বানানোর কল শিক্ষানীতি হিসেবে ব্যর্থ হলেও গো-পাঁঠা তৈরির রাজনীতি হিসেবে সফলতা পেল। আর শিক্ষার কফিনে শেষ পেরেক পুঁতল এনইপি। কেন একথা বলছি, তার জন্য এনইপি-র কাঠামোটুকু অন্তত বুঝে নেওয়া দরকার।
স্থায়ী উন্নয়ন বিষয়ে রাষ্ট্রসংঘ যে ২০৩০ পরিকল্পনা নিয়েছিল, তার চতুর্থ লক্ষ্য (SDG4) ছিল বিশ্বব্যাপী শিক্ষার অগ্রগতি, ভারত যা ২০১৫-য় পরিগ্রহণ করে। আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্র নির্বিশেষে শিক্ষার্থীদের প্রতি সমদর্শিতা প্রদর্শন শতাব্দীর প্রথম শিক্ষানীতির একটি উল্লেখযোগ্য দিক। মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষাদান এবং বিজ্ঞান-প্রযুক্তির গুরুত্বপূর্ণ উন্নতিসমূহ ও দেশের মূলগত চেতনার মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর বুদ্ধ্যঙ্ক (IQ) ও মনাঙ্ক (EQ) উভয়ের জোড়-কলম নির্মাণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে নতুন শিক্ষানীতিতে।
শিক্ষকদের হাতে আধুনিক প্রযুক্তি তুলে দিয়ে তার শিক্ষণশৈলীকে শীর্ষ নিতে সহায়তা দান — নতুন নীতির এও এক কথা। এই নব্য ও সংশোধিত শিক্ষানীতির উদ্দেশ্য হল প্রকৃত শিক্ষকের ধী ও শাশ্বত শিক্ষার আলোকে সর্বত্র সঞ্চারী করে তোলা। উন্নততর শিক্ষাপ্রদান যেন শিক্ষার্থীর ধর্ম-বর্ণ-জাতিগত এবং আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থানের ঊর্ধ্বের ব্যাপার হতে পারে। বিশেষত, শিক্ষা বিস্তারের দ্বারা এ-যাবৎ অবহেলিত এবং একেবারে প্রান্তিক স্তরে বসবাসরত শিক্ষার্থীদের জীবনের মানোন্নয়নের কথা বারংবার বলা হয়েছে। বাস্তবতা ও মানবতার যুগ্মফোঁড় প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে যথাযোগ্য মানুষ করে তুলবে — এহেন আশাবাদ এই নতুন শিক্ষানীতির সবথেকে স্পর্শপ্রবণ জায়গা।
রচনা হিসেবে জাতীয় শিক্ষানীতি অত্যন্ত সুপাঠ্য স্বীকার করতেই হয়। একে বুকে রাখলে আমরা একটি আদর্শ রাষ্ট্রের বাসিন্দা হতে পারতাম। কিন্তু সময় ও যুগের সঙ্গে-সঙ্গে, স্থান-কাল-প্রসঙ্গ ও প্রেক্ষিতের কারণে সত্যের আদর্শ বদলে যেতে পারে, বদলে যায়। যা আমেরিকায় সত্য, তা সোমালিয়ায় সত্য নয়। যা কলকাতায় সত্য, তা পুরুলিয়ায় সত্য নয়। এরাজ্যের সরকারপোষিত একটি প্রত্যন্ত কলেজের আর্টসের সহকারী অধ্যাপক হওয়ার সুবাদে আমি (অন্তত উচ্চশিক্ষায়) এনইপি-কে যা দেখেছি, তা নেহাতই প্রপঞ্চময়।
প্রথমত, উচ্চশিক্ষা এখন পূর্ণদৈর্ঘ্যের নাটক। ভর্তির নিদর্শপূরণ, ভাতা (শুনতে খারাপ লাগলে পড়ুন স্কলারশিপ)-এর জন্য আবেদন, কতিপয় শ্রেণিপাঠ, অন্তর্বর্তী মূল্যায়ন, চূড়ান্ত মূল্যায়ন এবং ষণ্মাসকাল গেলেই পরের ষণ্মাসে ভর্তির জন্য নিদর্শপূরণ এবং চরৈবেতি। অপিচ, প্রযুক্তির প্রগতিতে অতিরিক্ত আনুগত্য বিশুদ্ধ পাঠদানের সময়কে সংকুচিত করে শিক্ষণ ও অধ্যয়নের আনন্দকে নষ্ট করে দিয়েছে।
দ্বিতীয়ত, মৌল পড়াশোনার চেয়ে আনুষঙ্গিক ব্যাপারে বেশি গুরুত্ব আরোপ শিক্ষার্থীদের শিক্ষাগ্রহণের প্রতি অনাগ্রহী করে তুলেছে। অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন তো তাদের বাউল আনন্দ — যেন পূর্ণ নম্বর পাওয়া এক সাংবিধানিক অধিকার। শিক্ষকের কাছ থেকে কৌশলে সম্ভাব্য প্রশ্ন জেনে নেওয়ার তাগিদটুকুই চূড়ান্ত মূল্যায়নের আগে কয়েকটা দিন তাদের মহাবিদ্যালয়মুখী করে। ফকিরের কেরামতিতে বক মারাই তাদের লক্ষ্য ও মোক্ষ। এখন আর শতাংশের গল্প নেই — গ্রেড। রেজাল্টের গ্রেড আর শিক্ষার্থীদের গ্রেড ক্রমশ ব্যস্তানুপাতিক হয়ে পড়েছে।
তৃতীয়ত, প্রাথমিক শিক্ষা সর্বশিক্ষা। উচ্চশিক্ষার সর্বশিক্ষা হওয়ার কথা নয়। স্কুলস্তরে মূল্যায়নের শিথিলতা বা অবমূল্যায়ন না বলে বলা ভাল অ-মূল্যায়নকে হাতিয়ার করে নিম্নমেধারা মহাবিদ্যালয়ের চৌকাঠ অবধি পৌঁছে গেছে। গাধায় লাঙল জুতে ফসল ফলাবার ন্যাকা ও নোংরা রাজনৈতিক চেষ্টা উচ্চশিক্ষার হাড় মড়মড়ি ধরিয়ে দিয়েছে। মেজর বিষয়ের ভার সারাজীবন বইতে পারা সহজ নয়! ফলত পরিসংখ্যানের নিরিখে দেখলে সত্যিই কলেজ-ছুট বাড়ছে। পরিসংখ্যান তো একথা বলবে না যে, এরা কলেজে পড়া তো দূরের কথা, কলেজের দুয়ার মাড়ানোরই যোগ্য ছিল না।
চতুর্থত, রাজ্যের অধিকাংশ কলেজই শিক্ষক নিয়োগে ধারাবাহিকতার অভাবে ধুঁকছে। এমন অনেক কলেজ আছে, যেখানে সাবস্ট্যানসিভ পোস্টে কোনও ফুল-টাইম টিচার দীর্ঘদিন ধরেই নেই। স্টেট-এইডেড কলেজ টিচার বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন — এমন উদাহরণও রয়েছে। সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষায় অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর হিসেবে রেকমেন্ডেড হতে হলে চাকরিপ্রার্থী পরীক্ষার্থীর ডক্টরাল ডিগ্রি থাকবার বাধ্যবাধকতার কথা ইউজিসি-র নির্দেশিকায় নেই। তর্কের খাতিরে এনইপি-র চার বছরের ‘মাল্টিডিসিপ্লিনারি ব্যাচেলর’র প্রোগ্রাম উইথ রিসার্চ’-এর অনির্বচনীয়ত্ব যদি স্বীকার করেও নিই, তাকে সুষ্ঠুভাবে চালিয়ে নিতে গেলে যত সংখ্যক ডক্টরেট ডিগ্রিধারী স্থায়ী অধ্যাপক কলেজগুলোয় থাকা প্রয়োজন, তা নেই।
পঞ্চমত, স্বাধীনতাপ্রাপ্তির প্ল্যাটিনাম জয়ন্তী পার করার পরে মানুষে-মানুষে সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈষ্যম্যের অবসান ঘটেনি। ই-লার্নিং-এর ওপর যে জোর এনইপি-তে দেওয়া হয়েছে, আসলেই তা মুষ্টিমেয়ভোগ্য হয়ে রয়েছে আজও। ক্ষুধার গদ্যময় পৃথিবীতে পাগলা হাওয়া ইন্টারনেটের স্বপ্ন অন্ধের জ্যোৎস্নাবিলাসের মতোই দুঃখকর। এমনকি, রাজধানী শহর বা অন্যান্য বড় শহরের কুলীন কলেজগুলির সাপেক্ষে আমাদের মতো অজ জঙ্গলের কলেজগুলির পরিকাঠামো কহতব্য নয়। এনইপি মডেল সেখানে নাটকের টেক্সট বুক হিসেবে পড়তে খুবই ভাল লাগে, কিন্তু তা মঞ্চস্থ করা যায় না।
ষষ্ঠত, খুব স্বাভাবিক কারণেই আমাদের পূর্ব-প্রজন্মের বেশিরভাগ অধ্যাপক নেট বা টেক-স্যাভি নন। তা যুগকারণ — দোষবহ নয়। এনইপি-তে এমন কোনও পথরেখার উল্লেখ নেই, যাতে তাঁরা প্রযুক্তি-ব্যবহারে দড় হয়ে উঠতে পারেন। কেন্দ্র ও রাজ্য কোনও সরকারকেই এনইপি-র বাস্তব প্রয়োগ বিষয়ে কোনও কর্মশালার আয়োজন করতে অদ্যাবধি দ্যাখা যায়নি, যা থেকে অধ্যাপকেরা তাঁদের পেশাকে নিখুঁত পেশাদারিত্বের সঙ্গে পরিচালনা করতে শিখতে পারেন। অতএব, পাহাড়ের সেই ইঁদুর পাড়ার গল্পই শেষমেষ দাঁড়াল। ঘোড়াশালে ঘোড়া ছিল, কিন্তু জুতসই লাগামের অভাব তাতে অশ্বগতি দিতে পারল না।
প্রাথমিক শিক্ষা সর্বশিক্ষা। উচ্চশিক্ষার সর্বশিক্ষা হওয়ার কথা নয়। স্কুলস্তরে মূল্যায়নের শিথিলতা বা অবমূল্যায়ন না বলে বলা ভাল অ-মূল্যায়নকে হাতিয়ার করে নিম্নমেধারা মহাবিদ্যালয়ের চৌকাঠ অবধি পৌঁছে গেছে। গাধায় লাঙল জুতে ফসল ফলাবার ন্যাকা ও নোংরা রাজনৈতিক চেষ্টা উচ্চশিক্ষার হাড় মড়মড়ি ধরিয়ে দিয়েছে। মেজর বিষয়ের ভার সারাজীবন বইতে পারা সহজ নয়! ফলত পরিসংখ্যানের নিরিখে দেখলে সত্যিই কলেজ-ছুট বাড়ছে। পরিসংখ্যান তো একথা বলবে না যে, এরা কলেজে পড়া তো দূরের কথা, কলেজের দুয়ার মাড়ানোরই যোগ্য ছিল না।
(লেখক:পুরুলিয়া বিজিএম কলেজের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক)








