বাংলা ভাষার শুদ্ধতা, বাঙালি ও বিদ্বেষজীবী
শেখ মফেজুল
বাইরে একটি বিশেষ কাজে গিয়ে পরিচয় হয় সাধন গোড়াই নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে। পরিচয়ের পর থেকে ফোনে কথা হয়। একদিন কথার শুরুতেই আমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘কেমন আছেন?’
বললাম, আলহামদুলিল্লাহ, ভাল আছি। আমার কথা শুনে সে একটু থেমে গেল। থামার পর কেমন একটি সুরে বলল, ‘আচ্ছা! তারপর, একটু করুণ সুরেই বলল, আপনারা কি বাংলা ভাষায় আরবি-ফারসি না ঢুকিয়ে থাকতে পারেন না?’ আমি আশ্চর্য হয়ে বললাম, ‘কেন?’
সে বলল, ‘আমার মনে হয় বাঙালিদের উচিত শুদ্ধ বাংলায় কথা বলা।’ কিছু একটা কথা বলতে গেলাম, আমাকে থামিয়ে দিয়ে বলে চলল, ‘বাংলার মাঝে আরবি-ফারসি ঢোকানো আমার একদম পছন্দ হয় না। যেভাবে আরবি-ফারসি দিয়ে বাংলার উপর দখলদারি শুরু করেছে, আমি তার বিরুদ্ধে। মুসলমানরা তো বাংলায় বাস করে, তাহলে বাংলায় কথা বললে ক্ষতি কী? সব বাঙালির উচিত শুদ্ধ বাংলায় কথা বলা। জীবনযাপন ও লেখালেখি করা।
আমি তাকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, ‘আপনি এই যে বললেন- ‘পছন্দ’, ‘দখলদারি’ –এগুলো কিন্তু আরবি বা ফারসি শব্দ। গম্ভীর স্বরে হাসির মতো তাচ্ছিল্য করে বলল, দাঁড়ান, একটু আরাম করে বসি, তারপর গম্ভীর কণ্ঠে বললেন- আমার কথাগুলো নিয়ে আপনি মজা করছেন, তাই তো? বুঝতে পারলাম, সে একটু রেগে গেছে।
আমি খুব ধীর স্থির এবং শান্ত গলায় বললাম, ‘না না, মজা করব কেন?’ বললাম, ‘মজা’ ফারসি শব্দ, ‘আরাম’-টাও ফারসি শব্দ’। আরাম, মজা – এসব আরবি-ফারসি শব্দ, একথা শুনে সে আমার উপর আরো একটু রেগে গেল।
দেখুন দাদা, আমি আপনার সঙ্গে একটু খোশ গল্প করতে চাইলাম। আর আপনি এসব কী শুরু করলেন, বলেন তো? বুঝতে পারলাম, আমার কথা শুনে সে বিরক্তি বোধ করছে।
তিনি গম্ভীর গলায় বললেন, আমাকে কী আপনি শ্রেণিকক্ষের বাচ্চা ছাত্র পেয়েছেন? যে আপনি আমাকে যা বোঝাবেন, আমি তাই বুঝব? তার মুখ থেকে বাচ্চা শব্দটা শুনে বললাম- দেখুন দাদা, এই ‘বাচ্চা’ শব্দটাও ফারসি। কথাটা বলেই একটু অপেক্ষা করলাম। ফোনের ওপাশ থেকে কণ্ঠস্বর ভেসে এল, বললেন- ‘দাদা সত্যিই আফসোসের কথা, আপনারা এখনও সেই গোঁড়াই থেকে গেলেন’।
মুখে একটা বিদঘুটে চুকচুক শব্দ করে সে বলল- ‘বাংলা ভাষা থেকে আরবি-ফারসি শব্দগুলোকে আলাদা করে ফেলতে আপনাদের এত সমস্যা কীসের বুঝছি না!’ আমি তার মুখের কথা শেষ না হতে বললাম- এই যে আপনি এখনই বললেন, ‘আফসোস’; সেটাও কিন্তু ফারসি শব্দ এবং ‘আলাদা’ শব্দটাও আরবি শব্দ।
আমি তার কথার প্রত্যুত্তর দিতে দিতেই বললাম, এবার আপনি বলুন- শব্দগুলো আলাদা করবেন কীভাবে? আমার কথা শুনে সে তো চিৎকার করবে আর কী। খুব গম্ভীর গলায় বললেন- আসলে আপনাদেরকে…।
আমি তার ‘আসলে’ শব্দটি শুনে হাসতে হাসতে বললাম- দাদা, ‘আসলে’ শব্দটাও আরবি। বললাম- দাদা আপনি যে বাংলা ভাষার শুদ্ধিকরণ নিয়ে কথা বলছেন, তা কীভাবে সম্ভব বলেন তো? রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, প্রমথনাথ বিশী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখের সাহিত্যচর্চায়- অনেক কবিতা, প্রবন্ধ, গল্প, উপন্যাসে নানা আরবি-ফারসি শব্দ প্রয়োগের উদাহরণ দিলাম। তাদের নানা লেখায় অজস্র আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহার করেছে, তার কথাও বললাম।
সাধন দা আগের থেকে অনেক ধীর-স্থির শান্ত হয়ে, ‘না মানে ইয়ে…’ – কিছু একটা বলতে চাইলেন, কিন্তু আমি বাধা দিয়ে বললাম- ‘মানে’ শব্দটাও কিন্তু আরবি। বুঝতে পারছিলাম তার শান্ত ভাবটা আরো তীক্ষ্ণ গভীর রাগে পরিণত হচ্ছে। আমি ভাবছিলাম এই বুঝি ফোনের লাইনটা কেটে দেবে। সে যে ভিতরে ভিতরে বিরক্ত হচ্ছিল, আমি তা আন্দাজ করছিলাম। গম্ভীর গলায় বললেন- আরে মশাই ছাড়ুন তো, বাদ দিন এসব কথা।
বুঝতে পারলাম তার রেগে যাওয়ার কারণটা সঙ্গত। কিন্তু এই যে কথা হচ্ছে- ‘বাদ’, ‘বই’ আরবি শব্দ। আমাকে খুব কর্কশ এবং তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বললেন- দাদা আপনি কি শব্দ কোষ আর আরবি ব্যাকরণ নিয়ে বসে আছেন। কথায় কথায় এটা আরবি, সেটা ফারসি করছেন। কী মুশকিলে ফেললেন বলুন তো। এবার বুঝি মামলা মোকদ্দমা করে দেবেন আমার বিরুদ্ধে। বুঝতে পারলাম তিনি অধৈর্য হয়ে পড়েছেন, এসব আর ভাল লাগছে না। কিন্তু এখানেও যে শব্দগুলো উচ্চারণ করলেন, এর মধ্যে মুশকিল, মামলা-মোকদ্দমা আরবি শব্দ।
আমাকে খেঁকিয়ে ওঠে বললেন- আপনার এ সব বানানো মিথ্যা-বাজে কথা রাখুন। ভাষার আপনিই সব কিছু বোঝেন, আমি কিছুই বুঝি না? ‘বাজে’ কথাটাও আরবি। বেশ কিছুক্ষণ আর কোন কথা নেই। সৌজন্যতার খাতিরে সাধন দা বললেন- আচ্ছা দাদা ঠিক আছে, না, আপনার সাথে বিতর্ক করে কাজ নেই, আজকে রাখি, অন্য সময় কথা হবে। সে ফোন কেটে দিচ্ছিল, আমি বললাম- দাদা, একটু থামুন, এই ‘না’ শব্দটা কিন্তু সংস্কৃত শব্দ।
তিনি আর কোন শব্দ উচ্চারণ করলেন না। এত রেগে ছিলেন যে, ফোনের লাইনটা কেটে দিলেন। সবশেষে একটা কথাই মনে হল, সারা বিশ্বে বাঙালির সংখ্যা এখন প্রায় ৩০ কোটি। এর মধ্যে ১০ কোটি বাদে ২০ কোটি হচ্ছে মুসলমান বাঙালি। গোটা বিশ্বে বাঙালি বলতে একমাত্র বাংলাদেশকে চেনে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মতো একটি রাজ্যে ১০ কোটি বাঙালি বাস করে, এর মধ্যে প্রায় ৩ কোটি বাঙালি মুসলমান। এরপরও প্রশ্ন আসে শুদ্ধ বাংলা উচ্চারণ নিয়ে। খাঁটি বাঙালি কারা, তা নির্ণয় করতে চলে পরীক্ষা নিরীক্ষা।
ক্লাস ফ্রেন্ডের কাছেও শুদ্ধ বাংলায় কথা বলায় সন্দেহের প্রশ্ন ওঠে – হিন্দু না মুসলিম? সংস্কৃতির বিনিময় অবিরাম চলতে থাকলেও সন্দেহের অবকাশ থেকে যায়। বিদ্বেষজীবীদের প্রচার অভিযানে হাঁফিয়ে ওঠে আমাদের মনও। বাংলা ভাষার শুদ্ধ উচ্চারণ নিয়ে আর কত প্রশ্ন উঠবে? খাঁটি বাঙালির প্রশ্নবিদ্ধ হবে আরবি-ফারসি শব্দ? খাঁটি বাংলা শব্দ গঠনে, আরবি-ফারসি হটাও অভিযান চলবে নিরন্তর। যা অতীত সংস্কৃতিকে অস্বীকার করার নামান্তর। খাঁটি বাংলায় শব্দ প্রয়োগ, সংস্কৃতি চেতনা, সাহিত্য চর্চায় কীভাবে সাম্রাজ্যবাদী সন্ত্রাস ঘটছে, তারা বিস্ময়কর।








