জীবে ঈশ্বর, মখলুকে খালিক
মফিজুল তরফদার
মানুষের হৃদয়কে যদি গভীরভাবে শোনা যায়, তবে দেখা যাবে তার সমস্ত প্রার্থনা, সমস্ত কান্না, সমস্ত আকাঙ্ক্ষা আসলে একটিমাত্র নামের দিকে হাত বাড়িয়ে দেয় — প্রেম। ধর্মগ্রন্থ, দর্শনের পুঁথি, কাব্যের পংক্তি — সবই শেষ পর্যন্ত সেই একই প্রেমের খোঁজ। কেউ তাকে বলে ভক্তি, কেউ বলে মরমি তৃষ্ণা, কেউ-বা বলে আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা। কিন্তু যার হৃদয়ে সত্যিকার আগুন জ্বলে ওঠে, সে জানে, প্রার্থনা ঠোঁটের বচন নয়, প্রার্থনা হল অপরের বেদনা অনুভব করতে পারার ক্ষমতা। এই উপলব্ধিতেই বেদান্তের অন্তরের সুর এসে মিশে যায় সুফিবাদের তাওহীদের ধ্বনিতে। একজন বলেন, “জীবে ঈশ্বর”, আরেকজন বলেন “মখলুকে খালিক”। দুই ভাষা ভিন্ন, কিন্তু অভিপ্রায় একই — ঈশ্বর যদি সত্যিই থাকেন, তবে তিনি মেঘের ওপরে নয়, মানুষের চোখে, মানুষের কণ্ঠে, মানুষের ক্ষুধার আর্তিতে।
স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর ব্যবহারিক বেদান্তে এই সত্যটিই নগ্নভাবে উন্মোচন করেছিলেন। তিনি ধর্মকে উপদেশের মঞ্চ থেকে নামিয়ে আনলেন রেলস্টেশন, হাসপাতালের বারান্দা, গ্রামের কুঁড়েঘরে। বললেন, “আমি মন্দিরে আরতি জ্বালানোর চাইতে বেশি পবিত্রতা দেখি সেই হাতে, যা ক্লান্ত পথিককে জল এগিয়ে দেয়।” এই যে জ্ঞান নয়, সেবাকে ধর্মের কেন্দ্রে বসানো — এটি কোনো দর্শনচর্চা নয়, এটি ছিল এক বিপ্লব। তিনি বুঝেছিলেন, যে বেদান্ত বলে “অহং ব্রহ্মাস্মি”, আমি ব্রহ্ম — সেটি অহংকারের ভাষা নয়; বরং এ এক অভিজ্ঞতা, যেখানে আমি আর তুমি আলাদা থাকি না। আমি যদি সর্বত্র বিস্তৃত, তবে ক্ষুধার্ত মানুষের অন্ন আমি; অশিক্ষিতের শিক্ষা আমিই; রোগীর শুশ্রূষাও আমি। তাই তিনি ঘোষণা করলেন, “জীবে ঈশ্বর ভজ, এই সেবাই সেবা” — তুলসীদাসের মন্ত্র এতে যেন নতুন করে জেগে উঠল। ধর্ম তখন আর ভক্তি বা উপদেশের বিষয় নয়; ধর্ম তখন এক দায়বদ্ধতা, এক দহন, এক অসহনীয় প্রেম, যা মানুষকে মানুষ বানায়।
এদিকে ইসলামের বুকে জন্ম নেওয়া সুফিবাদও সেই একই আগুনে দগ্ধ হয়েছে। সুফিদের কাছে আল্লাহর প্রতি প্রেম ঠোঁটের জিকির নয়; বরং নিজের সত্তাকে ভেঙে ফেলে তাঁকে অনুভব করা। তাদের মূল বিশ্বাস তাওহিদ, অর্থাৎ একত্ববাদ — আল্লাহ একজন, শুধু এতটুকুই নয়। তারা বলে, “আল্লাহ একজন মানে তিনি সর্বত্র, সকল সত্তায় তাঁর উপস্থিতি।” বৃক্ষের পাতায়, শিশিরে, শিশুর হাসিতে, বৃদ্ধার আর্তিতে — সর্বত্র আল্লাহ। তাই সৃষ্টিকে ভালবাসা মানে স্রষ্টাকে ভালবাসা। যে দরিদ্রকে তুচ্ছ করে, সে আল্লাহর দয়াকে অস্বীকার করে। যে অন্যকে ঘৃণা করে, সে নিজের ঈমান নষ্ট করে। অনেক ধর্মগুরু যেখানে বিধান দিয়ে মানুষকে বিভক্ত করেছে, সুফিরা সেখানে প্রেম দিয়ে সমস্ত দেয়াল গলিয়ে দিয়েছে। তারা মসজিদের ভিতরে যতটা ঈশ্বর দেখেছে, মাটির রাস্তার ধুলোয় বাচ্চাদের খেলা দেখেও ততটাই ঈশ্বর দেখেছে।
ভাবুন তো, বিবেকানন্দ ও সুফিদের এই দুই ভাষার মধ্যে পার্থক্য কতটুকু? একজন বাংলায় কিংবা ইংরেজিতে বললেন, “পরের সেবা করো, সেটাই উপাসনা।” আরেকজন ফার্সি বা আরবিতে বললেন, “দরিদ্রের মুখে অন্ন দাও, সেটাই সেরা ইবাদাত।” শব্দ আলাদা, কিন্তু হৃদয়ের ধ্বনি একটিই — তুমি যদি ঈশ্বরকে ভালবাসতে চাও, তবে মানুষকে অস্বীকার করে তা সম্ভব নয়।
আমরা যখন ইতিহাসে দেখি একদিকে বাংলার বেদান্তী সন্ন্যাসী রামকৃষ্ণকে জড়িয়ে ধরে বিবেকানন্দ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেড়াচ্ছেন সেবার মন্ত্র ছড়িয়ে দিতে, অন্যদিকে দেখি পারস্যের মরুভূমিতে দরবেশরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে রুটির টুকরো বিলিয়ে দিচ্ছেন অচেনা মুখে — তখন বোঝা যায়, ঈশ্বর কেবল মন্দির-মসজিদের গণ্ডিতে থাকেন না। তিনি রুটি ভাগাভাগিতে থাকেন, জল এগিয়ে দেওয়ার করুণ সময়ে থাকেন। তিনি মানুষের সহানুভূতিতে থাকেন; তিনি মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো গর্বে থাকেন না।
আমাদের দুঃখ এই যে, আমরা ধর্মকে পুঁথি আর আচার দিয়ে জড়িয়ে রাখিনি; আমরা তাকে বন্দি বানিয়েছি প্রাচীর দিয়ে। কেউ ভাবে মূর্তি ছাড়া উপাসনা হয় না, কেউ ভাবে মূর্তি থাকলেই ধর্ম নষ্ট। কেউ ভাবে নির্দিষ্ট সময়ে হাত তুলে প্রার্থনা না করলে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন, কেউ ভাবে নির্দিষ্ট দিন উপবাস না করলে ভগবান খুশি হন না। অথচ সত্যিকারের সাধকেরা এসব কোনোদিন পরোয়া করেননি। তারা বলেছেন, “ঈশ্বরের সঙ্গে লেনদেন নয়, ঈশ্বরের সঙ্গে মিলন চাই।” আর সেই মিলন ঘটে কেবল তখন, যখন আমরা নিজেদের সীমানা ভেঙে অপরের দিকে হাত বাড়িয়ে দিই।
সত্যিকার ধর্মের মুখ ছায়াময় নয়, দীপ্তিময়। সে কোনো নিষেধের ভাষায় কথা বলে না; বরং বলে, “এসো, ভালবাসো। কাউকে ভয় দিও না। দয়া করো। কারণ, দয়া ছাড়া কোনো ভক্তি টেকে না।” স্বামী বিবেকানন্দ যদি এই মন্ত্রকে যুক্তির ভাষায় বলেন, সুফিরা সেটি বলেন গানের সুরে। রুমি তাঁর তানপুরায় বাজান, “এসো, যে-ই হও, আবার এসো” — এই আহ্বানই আসলে তাওহীদের বিস্তৃতি। আর বিবেকানন্দ বলেন, “আমি সমস্ত মানবজাতিকে আমার ভাই-বোন বলে স্বীকার করি, আর এই ভ্রাতৃত্বই আমার ধর্ম।” কেউ বাঁশিতে বাজান, কেউ ভাষণে বলেন। কিন্তু সুর একই।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন আসে, এসব ভাবনা দেখে আমরা কী শিখব? শুধু নিবন্ধ পড়ে আবেগে ভেসে গেলে কি চলবে? না। এই লেখার আসল উদ্দেশ্য প্রশংসা করা নয়, বরং উজ্জীবিত করা — মাথায় আগুন ধরিয়ে দেওয়া, যাতে আমরা বুঝতে পারি, ধর্ম মানে নিছক নিয়ম নয়; ধর্ম মানে প্রচণ্ড দায়, মানুষকে ভালবাসার দায়। যদি সত্যিই বেদান্তকে মানি, তবে রাস্তায় পড়ে থাকা অসহায় বৃদ্ধকে দেখে এড়িয়ে যেতে পারি না। যদি সত্যিই তাওহীদকে স্বীকার করি, তবে আমাদের চোখে কোনো মানুষ ‘পর’ হয়ে থাকতে পারে না।
তাই আজকের পৃথিবী যখন আবার বিভক্তির দিকে যাচ্ছে, যখন মানুষ মানুষকে কেবল ধর্ম বা জাতির পরিচয়ে বিচার করছে, তখন নতুন করে এই সুর ওঠা দরকার — ‘জীবে ঈশ্বর, মখলুকে খালিক’। যে মানুষ এই মন্ত্র গ্রহণ করবে, সে আর কাউকে হেয় করতে পারবে না, কাউকে ঘৃণা করতে পারবে না। বরং সে প্রতিটি মুখে আলোর ঝিলিক দেখবে। তার হৃদয় হবে এক অদ্ভুত প্রশান্তির, একই সঙ্গে তীব্র সক্রিয়তার। হয়ত তখনই একদিন সত্যিকারের প্রার্থনা শুরু হবে। মন্দিরের ঘণ্টা আর মসজিদের আযান মিশে যাবে মানুষের হৃদস্পন্দনে। সেই দিনই হবে ধর্মের প্রকৃত জয়।








