সব ধূলিসাৎ, বাড়িঘর চিনতে পারছেন না গাজাবাসী, লোটা-কম্বল নিয়ে খোলা আকাশের নীচে বাস্তুচ্যুতরা
নতুন পয়গাম, গাজা সিটি:
যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর ফের লোটা-কম্বল নিয়ে নিজ নিজ এলাকায় ফিরছেন গাজাবাসী। কিন্তু কিছুই তো আর অবশিষ্ট নেই। সব ভেঙে ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। কোনো চিহ্ন নেই। কোনটা কার বাড়ি, নিজেরাই চিনতেই পারছেন না তারা। ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে খুঁজছেন ফেলে যাওয়া জিনিসপত্র। সেসবও কংক্রিটে চাপা পড়ে গুঁড়িয়ে মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। এই অবস্থায় কপাল ও মাথা চাপড়াচ্ছেন তারা। কোথায় থাকবেন? এতদিন তারা প্রাণের ভয়ে অন্যত্র নিরাপদে পালিয়ে গিয়ে অস্থায়ী ত্রাণ শিবিরে মাথা গোঁজার ঠাঁই করে ছিলেন। এলাকায় ফিরে এখন তাও নেই। মাথার ওপর খোলা আকাশ। তাই তাদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে। বাস্তুচ্যুত গাজাবাসী এখন অথৈ পানিতে। গাজা সিটি এখন একপ্রকার নো-ম্যানস ল্যান্ড।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় টানা দুই বছর ধরে ইসরাইলের নৃশংসতার পর অবশেষে যুদ্ধবিরতি শুরু হয়েছে। মিসরের কয়েক দফা বৈঠকের পর বুধবার হামাস ও ইসরাইল যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়। শুক্রবার মধ্যরাতে চুক্তি অনুমোদন করে ইসরাইলি মন্ত্রিসভা। তারপরই গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। রাস্তায় নেমে আনন্দোল্লাসে মেতে ওঠে গাজার শিশু থেকে প্রাবীণ সকলেই। একে তারা নৈতিক জয় বলছে। কিন্তু এখন তারা থাকবে কোথায়, খাবে কী? কিছুই ঠিক নেই। অনিশ্চিত তাদের জীবনযাত্রা। ছন্দ হারিয়ে তারা এখন নিজভূমে পরবাসী। এদিকে সোমবার দুপুর থেকে জিম্মি ও বন্দী বিনিময় শুরু হওয়ার কথা। তবে গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার নিয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে। ইসরাইল এই যুদ্ধবিরতি চুক্তি কতখানি মানবে, তা নিয়েও ধোঁয়াশা রয়েছে। কারণ, এর আগে অসংখ্যবার এমন চুক্তি করেও প্রতিবারই লংঘন করেছে ইসরাইল। লেবাননের হিজবুল্লাহর সঙ্গে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত অন্তত ৬০ বার চুক্তি লংঘন করেছে ইসরাইল। আর চলতি বছর ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২৬৬ বার গাজা তথা ফিলিস্তিনের সঙ্গে চুক্তি ভঙ্গ করেছে নেতানিয়াহুর ইসরাইল। তাই না আঁচালে বিশ্বাস নেই।
১৯৪৮ সালে রাষ্ট্রসংঘের প্রস্তাব অনুযায়ী ইসরাইলকে ৫৩ শতাংশ এবং ফিলিস্তিনকে ৪২ শতাংশ ভূখণ্ড দেওয়া হয়। তারপর ১৯৬৭ সালে ৬ দিনের যুদ্ধে জিতে ফিলিস্তিনের বহু এলাকা দখল করে নেয় ইসরাইল। আর সব মিলিয়ে বিগত ৭৭ বছরে মোট প্রায় ৯০ শতাংশ ভূখণ্ড দখল করে নিয়েছে তারা। মাত্র ১০ শতাংশ ভূখণ্ডে এখন গাদাগাদি, ঠাসাঠাসি করে জীবজন্তুর মতো রয়েছে গাজাবাসী। তাই গাজা উপত্যকাকে বিশ্বের সবথেকে বড় উন্মুক্ত কারাগার বলা হয়।
ট্রাম্পের ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনার অধীনে তিন ধাপে গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার করা হবে। প্রথম ধাপে কিছু সেনা সরিয়ে ৫৩ শতাংশ এলাকা তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। আর দ্বিতীয় ধাপে নিয়ন্ত্রণে থাকবে ৪০ শতাংশ এলাকা। শেষ ধাপে সীমান্ত বরাবর ১৫ শতাংশ এলাকা ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। কিন্তু আদৌ এসব বাস্তবায়িত হবে বলে মনে হয় না।
উল্লেখ্য, আগস্টে গাজায় ইসরাইলি সেনারা স্থলপথে ট্যাঙ্ক, কামান দাগতে শুরু করলে পালিয়ে যান ৭ লক্ষাধিক ফিলিস্তিনি। এখন তাদের একাংশ স্বভূমে ফিরছেন। কিন্তু নিজেদের এলাকায় এসে তারা দেখছেন, কিছুই নেই। সব মিসমার করে দেওয়া হয়েছে। বাড়ি ভেঙে কংক্রিটের জঙ্গলে পরিণত হয়েছে রাস্তাঘাট। জনমানবশূন্য গাজায় এখন জীবজন্তু, পশুপাখি কিছুই নেই। বাতাসে উড়ে বেড়াচ্ছে কেবল মানুষের লাশ-পচা গন্ধ আর জীবাণু।
গত দু-বছরে ইসরাইলের নির্বিচার পৈশাচিক হামলায় গাজায় প্রায় সাড়ে ৪ লাখ ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে। স্কুল ধ্বংস হয়েছে ৬১৮টি। ফলে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত প্রায় সাড়ে ৭ লাখ শিক্ষার্থী। ৭৫৪টি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর গাজার মাত্র দেড় শতাংশ কৃষিজমি এখন চাষ যোগ্য রয়েছে। হাজার হাজার বহুমূল্যবান জয়তুন গাছ কেটে নিয়ে চলে গেছে ইহুদি সেনারা। চাষের জমির ফসল তুলে নিয়ে লরি বোঝাই করে চলে গেছে। তারপর শুনশান জমিতে বিষাক্ত রাসায়নিক স্প্রে করে দেওয়া হয়েছে। যাতে এসব জমিতে অন্তত কয়েক বছর কোনো ফসল হবে না।








