সাত দশকের রাজনীতিতেও দুর্নীতি স্পর্শ করতে পারেনি, ৮৫ বছরেও অপ্রতীম রাজ্যের প্রবীণ বামনেতা বিমান বসু
মুদাসসির নিয়াজ
নতুন পয়গাম, কলকাতা: বিমান বসুর জন্ম দেশের স্বাধীনতারও আগে ১৯৪০ সালের ১ জুলাই। সিপিআইএম পার্টির হোলটাইমার। পাটিগণিতের হিসেবে তাঁর বয়স এখন ৮৫ বছর। কিন্তু, তাঁকে দেখে কে বলবে যে, তাঁর বয়স সাড়ে আট দশক! থাকেন পার্টি অফিস আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের মুজাফফর আহমেদ ভবনে। বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসু ২০০৫ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক ছিলেন। আদ্যোপান্ত রাজনীতির কারবারী বর্ষীয়ান বামপন্থী নেতা বিমান বসু এখনও রাজ্যের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে ছুটে বেড়ান। ফরোয়ার্ড ব্লকের রাজ্য সম্পাদক অশোক ঘোষের পর বিমান বসুই রাজ্য রাজনীতির সবথেকে প্রবীণ নেতা।
এই বয়সেও তিনি অপ্রতীম এবং সপ্রতিভ। এখনও নিজের ধূতি-পাঞ্জাবি ইত্যাদি পোশাক নিজে হাতেই কাচেন। তারপর আয়রন বা ইস্ত্রিও করেন নিজে হাতেই। পাতি বাংলায় যাকে বলে, একেবারে মাঞ্জা দেওয়া পোশাক পরেন তিনি। তাঁর শ্বেতশুভ্র আটপৌরে জীবনযাত্রা আজও রাজ্যের বাম কর্মী-সমর্থকদের কাছে আদর্শের। বিরোধীরাও কখনও তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলতে পারেনি। রাজনীতির সঙ্গে দুর্নীতি সমার্থক হলেও বিমান বসুর সাদা ধূতি-পাঞ্জাবিতে কখনও এক ফোঁটা কালি লাগেনি।
বিমান বসু বিবাহ বা সংসার করেননি। চিরকুমার। তবুও তাঁর ব্যক্তিজীবন নিয়ে কেউ কখনো প্রশ্ন তুলতে পারেনি। পক্ককেশ, ধবধবে পোশাকের মতোই সফেদ তাঁর দৈনন্দিন জীবনযাপন। বিমান বসু সিপিএমের হোলটাইমার। অকৃতদার। পার্টি অন্তঃপ্রাণ। ঘন ঘন সিগারেট খান। সিপিএম পার্টিই তার অক্সিজেন বা জিয়নকাঠি। পোড়খাওয়া রাজনীতিবিদ বিমান বসু দলীয় থেকে জাতীয় — স্বাধীনত্তোর ভারতবর্ষের বহু চড়াই-উতরাই, বহু উত্থান-পতনের রাজ-সাক্ষী। ১৯৭৭ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত এরাজ্যে টানা ৩৪ বছর সিপিএমের নেতৃত্বে বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় থাকলেও দলের অন্যতম কাণ্ডারী বিমান বসুর বিরুদ্ধে কেউ কখনও দুর্নীতির অভিযোগ তুলতে পারেনি। যদিও তিনি কখনও ভোটে লড়েননি বা মন্ত্রী হননি। তিনি বরাবর সাংগঠনিক দায়িত্বেই ছিলেন, এখনও আছেন স্বমহিমায়।
১৯৮০ সালে তদানীন্তন শীর্ষ বামনেতা প্রমোদ দাশগুপ্ত বাঁকুড়া লোকসভা কেন্দ্র থেকে তাঁকে প্রার্থী করার প্রস্তাব দিলে বিমানবাবু সম্মত না হওয়ায় সিপিএমের প্রার্থী হন বাসুদেব আচারিয়া। সেই নিরিখে বিমান বসু আগাগোড়াই বঙ্গ সিপিএমের নেপথ্য কুশীলব। হরেকৃষ্ণ কোঙার, প্রমোদ দাশগুপ্ত, শৈলেন দাশগুপ্তের পর বিমান বসু সিপিএম তথা বামফ্রন্টের সর্বজনশ্রদ্ধেয় প্রাজ্ঞ নেতা। ২০০৫ সালে রাজ্য সম্পাদক থাকাকালে অনিল বিশ্বাস মারা গেলে বিমান বসু সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক হন। তারপর টানা ১০ বছর তিনি ওই পদে ছিলেন। তার আগে ছিলেন রাজ্য বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান। তারপর সূর্যকান্ত মিশ্র রাজ্য সম্পাদক হন। এখন দুই মেয়াদে রাজ্য সম্পাদক রয়েছেন মহম্মদ সেলিম।
জ্যোতি বসুর সঙ্গে বিমান বসুর কম্বিনেশন খুব ভাল ছিল। রাজ্য সম্পাদক অনিল বিশ্বাসের সঙ্গেও মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের বোঝাপড়া বা সমন্বয় বেশ ভাল ছিল। কিন্তু ২০১১ সালে রাজ্যে পালাবদলের পর সিপিএম তথা বামফ্রন্ট একেবারেই আগোছালো হয়ে যায়। যদিও বিনয় কোঙার থেকে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের মতো প্রথম সারির সিপিএম নেতা-মন্ত্রীরা একসময় দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরব হয়েছিলেন, এমনকি মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দিয়েছিলেন।
বিমান বসু ভারতের মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টির পলিটব্যুরোর প্রাক্তন সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন রাজ্য সম্পাদক। বর্তমানে বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ওয়েলিংটনস্থিত মৌলানা আজাদ কলেজে পড়ার সময় বিমান বসু রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৫৪ সালে যখন তিনি স্কুল পড়ুয়া, তখনই বিধানসভা নির্বাচনে পার্টির হয়ে প্রচারে নেমে নজর কাড়েন। ১৯৫৭ সালে বিমান বসুর নাম পার্টি সদস্য হিসেবে সুপারিশ করা হলেও তখন তা মঞ্জুর হয়নি। কারণ, তখনও তাঁর বয়স ১৮ বছর হয়নি।
১৯৫৬ সালে বাংলা ও বিহার সংযুক্তিকরণের বিরুদ্ধে এবং ১৯৫৯ সালে খাদ্য আন্দোলনে বিমান বসু সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। ১৯৫৮ সালে প্রথম গ্রেফতার হন। ১৯৬৪ সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক ছাত্র ফেডারেশনের কলকাতা জেলা কমিটির সম্পাদক এবং তারপর রাজ্য সভাপতি থাকাকালে বিমান বসু ভারত-ভিয়েতনাম সংহতি কমিটির সহ-সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭০ সালে ভারতের ছাত্র ফেডারেশন বা এসএফআই-এর প্রথম সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
১৯৭১ সালে সিপিএম রাজ্য কমিটির সদস্য এবং রাজ্যে প্রথম বামফ্রন্ট সরকার গঠনের পরের বছর ১৯৭৮ সালে রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য হন বিমান বসু। ১৯৮৩ সালে সিপিএম-এর কেন্দ্রীয় কমিটির আমন্ত্রিত সদস্য, ১৯৮৫ সালে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং ১৯৯৮ সালে দলের সর্বভারতীয় নীতিনির্ধারণ কমিটি পলিটব্যুরোর সদস্য নির্বাচিত হন। ওই সময় তদানীন্তন বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান শৈলেন দাশগুপ্তের প্রয়াণের পর ১৯৯৮ সালে রাজ্য বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান হন বিমান বসু।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি সোভিয়েত ইউনিয়ন, বুলগেরিয়া, চীন, কিউবা, ভিয়েতনাম, জাপান, আমেরিকা, ব্রিটেন এবং বাংলাদেশ সফর করেছেন। ষাটের দশকে পশ্চিমবঙ্গের খাদ্য আন্দোলনের পথ ধরে ছাত্র রাজনীতির আঙিনায় পদার্পণ করেন কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ভাইপো বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। তখনই বাংলার বামপন্থী আন্দোলনে নজর কাড়েন বুদ্ধদেব। তাঁর থেকে বেশ কিছুটা সিনিয়র ছিলেন বিমান বসু, শ্যামল চক্রবর্তী, দীনেশ মজুমদার, সুভাষ চক্রবর্তীরা। একে একে তাঁরা সকলেই মারা গিয়েছেন। কিন্তু মুজাফফর আহমেদ ভবনে গৃহকর্তা হিসেবে রয়ে গিয়েছেন ৮৫ বছরের বিমান বসু। এখনও তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় এবং সপ্রতিভ। এখনও তিনি কলকাতার রাজপথে নেমে মিটিং করেন, মিছিলে পা মেলান, মঞ্চে বক্তব্য রাখেন, সাংবাদিক সম্মেলন করেন, শরিক দলগুলোকে নিয়ে মিটিং করেন। বয়সের ছাপ আজো তাঁর ওপর রেখাপাত করতে পারেনি।








