কর্মীদের চাপে রাখলে অফিসের লাভ, নাকি ক্ষতি?
নতুন পয়গাম, মেলবর্ন:
এখন সব ক্ষেত্রে অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা। ঘড়ি সবার হাতে থাকলেও কারো হাতে সময় নেই। সবাই যেন ইঁদুর দৌড়ে নেমেছে। কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানের মালিকপক্ষ কর্মীদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ ফলাফল আশা করেন। সময়মতো অফিসে আসা, নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণ এবং নিয়ম মেনে কাজ করা, তাদের নজরে এসবই একজন আদর্শ কর্মীর বৈশিষ্ট্য। কিন্তু এই ‘আদর্শ’ ধারণার আড়ালে অনেক সময় লুকিয়ে থাকে অসহনীয় চাপ, যা কর্মচারীদের জীবন অতিষ্ঠ করে তোলে।
কর্তৃপক্ষের বৈষম্যমূলক আচরণ, কর্মচারীদের প্রতি মানবিক আচরণ না করা, তাদের আত্মসম্মানে আঘাত দিয়ে কথা বলা এবং সর্বোপরি অতিরিক্ত চাপের কারণে কর্মীদের মধ্যে দেখা দেয় মানসিক অবসাদ। দিনে দিনে তারা ক্ষয়িষ্ণু হতে থাকে। তাদের প্রতিভা বিকশিত হয় না। অফিসের বা কাজের প্রতি আন্তরিকতা, নিষ্ঠা ও ভালবাসা কমতে থাকে।
অফিসে দীর্ঘসময় ধরে অবিশ্রান্ত পরিশ্রম করে অতিরিক্ত চাপে থাকলে কর্মীদের মধ্যে দেখা দেয় ঘুমের সমস্যা, মেজাজের অবনতি এবং মানসিক ক্লান্তি। এসব সমস্যার কারণে কাজে মনোযোগ বা মনোবল হারাতে থাকে। হঠাৎ করে ছোটখাটো ভুল, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে না পারা, কিংবা সহকর্মীদের সঙ্গে মনোমালিন্য — এসব ঘন ঘন ঘটতে শুরু করে।
একজন কর্মী অফিসের বাইরেও যদি নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজের চাপ বয়ে বেড়ান, তা হলে তার ব্যক্তিজীবন ও পারিবারিক-সামাজিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই ভারসাম্যহীনতা ধীরে ধীরে কাজের প্রতি আগ্রহ কমিয়ে দেয়। এমনকি সৃজনশীলতাও হারিয়ে যায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হু-র গবেষণা রিপোর্ট বলছে, যারা সপ্তাহে ৫০ ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় কাজ করেন, তাদের মধ্যে স্ট্রোকের ঝুঁকি ৪৫ শতাংশ এবং হৃদরোগে মৃত্যুর ঝুঁকি ২৭ শতাংশ বেশি। কারণ, মানবদেহ কোনো যন্ত্র নয়। হৃদয়, আবেগ, বিবেক ইত্যাদির সমন্বয়ে রক্ত-মাংসের মানুষ। তার অনুভূতি, উপলব্ধি বা আত্মসম্মান বাধাপ্রাপ্ত হলে, এক পর্যায়ে সে আর নিতে পারে না। তবে সবার ক্ষেত্রে এমন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয় না। এর ব্যতিক্রমও আছে। বিশেষ করে যারা শক্ত মনের মানুষ, তারা প্রতিকূল পরিবেশ-পরিস্থিতির সঙ্গেও মানিয়ে নিতে পারে। তারা অনায়েস চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারে এবং চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করতে পারে।
একটানা দীর্ঘ সময় কাজ করলে শরীর ও মস্তিষ্ক দুইই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউ জানাচ্ছে, একটানা ঘণ্টা দেড়েক কাজ করলে কাজের গুণমান কমে যায়। এক মার্কিন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, একজন অবসন্ন কর্মীর কারণে কোম্পানিকে বছরে গড়ে ২০ হাজার ডলার পর্যন্ত ক্ষতি হয়। আর অতিরিক্ত চাপে থাকা কর্মীদের মধ্যে কাজে ভুল-ত্রুটির হার বেড়ে যায়। ঘন ঘন অসুস্থ হয়ে পড়ে। ফলে অফিস কামাই করতে হয়। এতে অফিসেরও ক্ষতি হয়। তাই কর্মচারীরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারলে, সেই কাজের আউটপুট কাঙ্খিত হয় না।
তাই প্রতিষ্ঠানের উচিত এমন এক কাজের পরিবেশ গড়ে তোলা, যেখানে কর্মীরা চাপমুক্ত হয়ে মনের আনন্দে কাজ করতে পারেন। তারা যেন পরিবারের লোকজন ও বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে খোলামেলা মেলামেশার সুযোগ পায়। এতে তাদের মন-মানসিকতা ভাল থাকে। আর হাসিখুশি থাকাই হল দেহ-মনে ভাল থাকার পাসওয়ার্ড।
মনে রাখতে হবে, অতিরিক্ত কাজের চাপ যতটা না লাভ দেয়, তার থেকে বেশি ক্ষতির কারণ হয়। সুস্থ ও সুখী কর্মীরাই প্রতিষ্ঠানকে সফলতার দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সহায়ক হয়। সুতরাং, কর্মীদের শ্বাস নেওয়ার সুযোগ দিন, চাপ নয় — দিন সহানুভূতি ও সহায়তা। এতে উভয়পক্ষই লাভবান হবেন। তবে সব বিষয়ে মালিকপক্ষকে দোষ দেওয়া কাম্য নয়, কর্মীদেরকেও অফিসের লাভ-লোকসানের দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। মোটকথা, মালিক ও কর্মচারী পরস্পরের বন্ধুভাবাপন্ন হলে কোম্পানির জয়যাত্রা কেউ ঠেকাতে পারবে না।








