যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে গাজায় উচ্ছ্বাস, কিন্তু থেকে যাচ্ছে অনেক প্রশ্ন
বিশেষ প্রতিবেদন:
নতুন পয়গাম: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গাজা নিয়ে ঘোষিত ২০-দফা শান্তি পরিকল্পনার প্রথম পর্যায় বাস্তবায়নে যুদ্ধবিরতি চুক্তি সই করল ইসরাইল ও হামাস। বৃহস্পতিবার চুক্তি ঘোষণার পরই যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা উপত্যকায় খুশি, স্বস্তি ও উল্লাস ছড়িয়ে পড়ে। রাস্তায় নেমে নৈতিক জয় উদযাপন শুরু করেন গাজাবাসী ৮ থেকে ৮০ সবাই। মাস ছয়েক আগে ইসরাইলের সঙ্গে হামাসের যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলেও তা লংঘন করে এখনও প্রতিদিনই গাজায় হামলা অব্যাহত রেখেছে যুদ্ধবাজ নেতানিয়াহু।
দীর্ঘ ২ বছৰ ধরে ইসরাইলের একতরফা যুদ্ধ ও গণহত্যার পাশাপাশি কঠোর অবরোধের কারণে সৃষ্ট দুর্ভিক্ষের মধ্যে সবার দৃষ্টি এখন কবে মানবিক সহায়তা, খাদ্য ও চিকিৎসা সরঞ্জাম আবার বিতরণ শুরু হতে পারে সেদিকে। বুধবার রাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত এই যুদ্ধবিরতি চুক্তি আপাতত যুদ্ধের অবসানে ঘটাল। চুক্তির প্রথম পর্যায়ে উভয় পক্ষ তাদের কাছে আটকে থাকা বন্দি ও জিম্মিদের ধাপে ধাপে মুক্তি দেবে। দ্বিতীয় পর্যায়ে গাজা থেকে ইসরাইলি সেনাবাহিনী প্রত্যাহার, হামাসের নিরস্ত্রীকরণ এবং গাজায় নতুন নিরাপত্তা ও শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কথা বলা হচ্ছে। তবে এই পর্যায়ের আলোচনা এখনো শুরু হয়নি।
যেসব প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে:
চুক্তির প্রথম ধাপ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে পরবর্তী ধাপগুলো নিয়ে আলোচনা শুরু হবে। তবে সেই পথ খুব একটা সহজ হবে না। কারণ, সেখানে অনেক বিতর্কিত বিষয় রয়েছে। মিসরে তিন দিন ধরে চলা বৈঠকের পর ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইসরাইল ও হামাস ২০-দফা শান্তি পরিকল্পনার প্রথম ধাপে সম্মত হয়েছে। তবে চুক্তির বিস্তারিত বিবরণ তিনি দেননি। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর কার্যালয় থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, শুক্রবার ১০ অক্টোবর সকালেই ইসরাইলি মন্ত্রিসভা যুদ্ধবিরতি ও পণবন্দী মুক্তি পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে। সবথেকে বড় প্রশ্ন হল, স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন কখন, কীভাবে হবে – সে বিষয়ে ট্রাম্প কিছু বলেননি। চুক্তিতেও এখনও পর্যন্ত কোন উল্লেখ নেই।
তাছাড়া গত দু-বছরে গাজায় যে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি, ধ্বংসযজ্ঞ ও গণহত্যা চালিয়েছে ইসরাইল, তার ক্ষতিপূরণ কী হবে? ইসরাইলকে যুদ্ধাপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক আদালতের কাঠগড়ায় কেন তোলা হবে না? শত শত স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, ত্রাণশিবির, মসজিদ, অফিস ভবন, কলকারখানা ধ্বংস করেছে ইসরাইল। সে সবের কী হবে? ইসরাইল কি এসব ক্ষতিপূরণ বা পুনর্গঠন করে দেবে? লক্ষ লক্ষ নিরীহ ও নিরস্ত্র মানুষকে বিনা অপরাধে সজ্ঞানে পরিকল্পনা করে গণ হারে হত্যার দায় কি নেতানিয়াহু সরকার নেবে? এতকিছু মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য নেতানিয়াহু বা ইসরাইল সরকারকে কোনো দায় নিতে হবে না কেন? সর্বোপরি ইসরাইল কি আদৌ এই চুক্তি মেনে চলবে, নাকি আগের মতোই এবারও চুক্তি লংঘন করে গাজায় প্রাণঘাতী হামলা চালিয়েই যাবে?
চুক্তিতে কী কী বিষয় রয়েছে?
ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর অফিস থেকে জনৈক মুখপাত্র জানিয়েছেন, তাদের সেনাবাহিনী এমন এক জায়গায় ফিরে যাবে, যার ফলে গাজার ৫৩ শতাংশ এলাকা তাদেরই নিয়ন্ত্রণে থাকবে। যাহোক, প্রথম দফায় ২০ জন জীবিত এবং ২৮জন নিহত পণবন্দীর লাশ ফেরত দেবে হামাস। বিনিময়ে ইসরাইলও তাদের কারাগার থেকে ২৫০ ফিলিস্তিনি বন্দীকে মুক্তি দেবে, যারা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত। এছাড়া গাজা থেকে আটক আরো ১৭০০ জনকে মুক্তি দেয়া হবে। একইসাথে, ত্রাণবাহী ট্রাক গাজায় প্রবেশ করবে। ট্রাম্পের পরিকল্পনায় প্রতিদিন ৬০০ ট্রাক ত্রাণ পাঠানোর কথা থাকলেও শুরুতে প্রতিদিন অন্তত ৪০০ ট্রাক ত্রাণ ঢুকবে এবং পর্যায়ক্রমে এ সংখ্যা বাড়ানো হবে। ওয়াশিংটন প্রশাসন জানিয়েছে, আমেরিকার তত্ত্বাবধানে প্রায় ২০০ সেনা নিয়ে একটি বহুজাতিক বাহিনী যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণ করবে, যাতে মিসর, কাতার, তুরস্ক ও আরব আমিরাতও থাকতে পারে। তাদের কাজ হবে যুদ্ধবিরতি ‘তদারকি ও পর্যবেক্ষণ করা এবং কোনো পক্ষ যেন তা লঙ্ঘন না করে, তা নিশ্চিত করা’।
এরপর কী হতে পারে?
প্রস্তাব অনুযায়ী, উভয়পক্ষ রাজি থাকলে যুদ্ধ অবিলম্বে শেষ হবে। গাজাকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ করা হবে এবং সেখানকার সব সামরিক কাঠামো ধ্বংস করা হবে। গাজার শাসনভার সাময়িকভাবে অন্তর্বর্তী টেকনোক্র্যাট সরকারের হাতে যাবে। এর কার্যক্রম তত্ত্বাবধান করবে ‘শান্তি বোর্ড’। যা নেতৃত্বে থাকবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তারপরেই থাকবেন সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার। অন্যদের নাম এখনও জানা যায়নি। এক পর্যায়ে গাজার শাসনভার ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের (পিএ) কাছে হস্তান্তর করা হবে। গাজার প্রশাসনে হামাসের কোনো ভূমিকাই থাকবে না। হামাস সদস্যদের জন্য দুটি পথ খোলা থাকবে- হয় তারা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সাধারণ ক্ষমা পাবে, অথবা অন্য কোনো দেশে নিরাপদে চলে যেতে পারবে।
সমস্যা তাহলে কোথায়?
চুক্তির পরবর্তী ধাপগুলো নিয়ে আলোচনায় বেশ কিছু বিষয়ে বড় ধরনের মতপার্থক্যের আশঙ্কা রয়েছে। হামাস বরাবরই বলে এসেছে, ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত তারা স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে পিছবে না। অন্যদিকে, ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু গত সপ্তাহে স্পষ্ট বলেছেন, ইউরোপের দেশগুলো যতই ফিলিস্তিনকে স্বীকূতি দিক, তারা কখনোই ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হতে দেবে না। কারণ, ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা হবে ইসরাইলের জন্য হুমকি। সবচেয়ে বড় জটিলতা হতে পারে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহারের মাত্রা নিয়ে। প্রথম ধাপে তারা গাজার প্রায় ৫৩ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করবে। ট্রাম্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ক্রমান্বয়ে এটি ৪০ শতাংশ এবং পরবর্তীতে ১৫ শতাংশে নামানো হবে। সব মিলিয়ে বলা যায়, এই চুক্তিতে ইসরাইলেরই জয়জয়কার হবে। মজলুম গাজাবাসী কিছুই পায়নি, পাবে বলেও মনে হয় না।








