মৃত্যুনগরী গাজা উপত্যকার আত্মকথা: ইসরাইলের মাথায় ট্রাম্পের হাত যতদিন থাকবে নেতানিয়াহু ততদিন মাথানত করবে না
বিশেষ প্রতিবেদন
নতুন পয়গাম: গাজা উপত্যকাকে ঘিরে চার হাজার বছরের অবরোধ এবং ভোগ দখলের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। প্রাচীন মিশরীয় যুগ থেকে শুরু করে যিশু খ্রিস্টের কয়েক’শ বছর আগে পর্যন্ত, এমনকি ১৬ শতকে অটোমান সাম্রাজ্যের পতন পর্যন্ত বিভিন্ন রাজবংশ, সাম্রাজ্য এবং ব্যক্তি গাজা উপত্যকাকে শাসন, ধ্বংস ও পুনরুদ্ধার করেছে। আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট, রোমান সাম্রাজ্য বা মুসলিম জেনারেল আমর ইবনে আল-আস এই গাজা উপত্যকা জয় করেছেন। যখন যে বা যারা গাজা জয় করেছে, তখন তারা তাদের মতো করে এখানকার ধর্মীয় বিশ্বাস, সমৃদ্ধি ও পতনকে প্রভাবিত করেছে।
ফিলিস্তিনের গাজা অঞ্চল ১৯১৭ সাল পর্যন্ত অটোমান বা তুর্কি খিলাফত সাম্রাজ্যের অংশ ছিল, এরপর এটি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে আসে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ এবং তুর্কিরা গাজা উপত্যকা এবং অটোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত বেশিরভাগ এশিয়ান-আরব অঞ্চলগুলোর ভবিষ্যত বিষয়ে একটি চুক্তিতে পৌঁছায়। কিন্তু ১৯১৯ সালে প্যারিস শান্তি সম্মেলনের সময়, বিজয়ী ইউরোপীয় শক্তিগুলো প্রতিশ্রুত ঐক্যবদ্ধ স্বাধীন আরব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় বাধা দেয়।
বরং তারা বেশ কয়েকটি ম্যান্ডেট জারি করে, যার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যকে বিভক্ত করে সুরক্ষা দেয়ার কথা বলা হয়। এভাবে গাজা ফিলিস্তিনের ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর প্রতিষ্ঠিত লীগ অফ নেশনস (তদানীন্তন রাষ্ট্রসংঘ) এর অনুমোদন দেয়। গাজা উপত্যকা ১৯২০ থেকে ১৯৪৮ পর্যন্ত ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের অংশ থাকে।
সম্প্রতি রাষ্ট্রসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের ৮০তম বার্ষিক অধিবেশনের আগের দিন নিউ ইয়র্কে রাষ্ট্রসঙ্ঘেরই অধিবেশন কক্ষে অনুষ্ঠিত হল আরও এক অভূতপূর্ব অধিবেশন। ১৫০-রও বেশি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের উপস্থিতিতে প্যালেস্তাইন প্রশ্নে দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের পক্ষে শোনা গেল জোরালো সহমতের কথা। ফ্রান্স এবং সৌদি আরবের যৌথ আহ্বানে আয়োজিত এই বিশেষ সভায় ফ্রান্স আনুষ্ঠানিকভাবে প্যালেস্তাইনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তার মাত্র কয়দিন আগেই ব্রিটেন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, পর্তুগাল, বেলজিয়াম, লুক্সেমবার্গ, মল্টো, মোনাকো এবং অ্যান্ডোরাও প্যালেস্তাইনকে স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে মর্যাদা বা স্বীকৃতি দেয়। ফলে এ পর্যন্ত বিশ্বের মোট ১৯৩টি রাষ্ট্রের মধ্যে ১৫০টি-রও বেশি দেশ স্বাধীন ও সার্বভৌম প্যালেস্তাইন রাষ্ট্রের পক্ষে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করল।
মধ্যপ্রাচ্য বা পশ্চিম এশিয়ায় ইসরায়েল-প্যালেস্তাইন বিরোধের একমাত্র সমাধান হিসাবে দ্বিরাষ্ট্রীয় তত্ত্ব বহুদিন ধরেই সর্বস্তরে স্বীকৃত। রাষ্ট্রসঙ্ঘও শান্তির লক্ষ্যে এই ব্যবস্থার পক্ষে। ইতিমধ্যে উন্নয়নশীল ও বিকাশশীল দেশগুলির সকলেই প্যালেস্তাইনকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে ঘোষণা করে সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য সাধ্যমতো পদক্ষেপ করেছে। ইসরায়েলের একান্ত ঘনিষ্ঠ আমেরিকার চাপে তাদের সহযোগী দেশগুলি, বিশেষ করে জি-৭ গোষ্ঠী এবং ন্যাটো জোটের দেশগুলি প্যালেস্তাইনকে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করেছিল। এই সব দেশগুলি মূলত আমেরিকার লেজুড় হয়ে ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি আগ্রাসী পরিকল্পনা রূপায়ণে পরোক্ষে সায় দিয়ে যাচ্ছিল।
মার্কিন মদত ও সহায়তায় ইসরায়েল চাইছে, ক্রমাগত প্যালেস্তাইনি ভূখণ্ড দখল করে বৃহত্তর ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে। তাতে প্যালেস্তাইন বলে কোনও দেশ বা ভূখণ্ডের অস্তিত্বই থাকবে না। সেই লক্ষ্যেই তারা হামাসকে অজুহাত খাড়া করে গাজায় জাতিগত নিকেশ অভিযান বা ব্যাপক গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে দীর্ঘ সাড়ে সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে। একই সঙ্গে প্যালেস্তাইনের জমি বা ভূখণ্ড দখল করে প্যালেস্তাইনকে প্রান্তিক করে ফেলেছে। অগণিত ফিলিস্তিনি নাগরিককে উৎখাত করেছে ইহুদিরা। সেইসব ফিলিস্তিনিরা প্রতিবেশি দেশগুলোতে শরণার্থী হয়ে আশ্রয় নিয়েছে। আবার অসংখ্য ফিলিস্তিনি নিজ ভূমে পরবাসী হয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে।
সর্বশেষ গত দুই বছর ধরে ইসরাইল যে প্যালেস্তিনীয়দের গণহত্যা ও ধ্বংসকাণ্ড চালাচ্ছে, তার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হল সমস্ত প্যালেস্তাইনবাসীদের নিকেশ অথবা বিতাড়িত করা। সমগ্র গাজা ভূখণ্ড এবং ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক বা পশ্চিম তীর কার্যত ফাঁকা করে ইসরায়েলের অন্তর্ভুক্ত করা। গত দু-বছর ধরে প্যালেস্তাইনের স্বপ্ন চিরতরে কবর দিয়ে ইসরায়েলের স্বপ্ন পূরণে অবাধে গণহত্যা চলছে। বোমা আর ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে প্রতিদিন গড়ে শতাধিক নিরীহ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। আহত, জখম, পঙ্গুর সংখ্যার কোনও সীমা-পরিসীমা নেই। মানুষ হত্যায় মেতে ওঠা ইসরায়েলের এই কাজে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে দেশে দেশে। বিশ্বের শান্তিকামী মানুষ এমন হিংস্রতা, বর্বরতা, পাশবিকতা, নৃশংসতা সহ্য করতে পারছেন না। প্রতিবাদের তীব্রতা ও ব্যাপকতা বাড়তে থাকায় মার্কিন ঘনিষ্ঠ যে দেশগুলি এতদিন দ্বিরাষ্ট্র তত্ত্বে সায় দিচ্ছিল না, তারাও এখন বাধ্য হচ্ছে প্যালেস্তাইনকে স্বীকৃতি দিতে। এতকাল যারা সরাসরি হোক বা আড়াল থেকে ইসরায়েলকে সমর্থন জুগিয়ে এসেছে, তাদের বেশিরভাগ অবস্থান বদলে ফেলায় প্রবল চাপ তৈরি হচ্ছে ইসরায়েলের ওপর।
কার্যত এই মুহূর্তে বিশ্বে এক ঘরে হয়ে যাবার অবস্থা ইসরায়েলের। মধ্যপ্রাচ্যের যত অশান্তির মূলে থাকা এই অবৈধ দেশটিকে এখনো টিকিয়ে রাখার একমাত্র গ্যারান্টার আমেরিকাও যথেষ্ট চাপের মুখে। একে একে সব ইউরোপীয় সঙ্গীরা অবস্থান বদল করছে। মোদির ভারতও সম্প্রতি অবস্থান বদলেছে। এখনও আমেরিকা, ইসরাইলের দিকে থেকে গেছে জার্মানি, ইতালি, জাপান। তবে পরিস্থিতি দ্রুত বদলাচ্ছে সন্দেহ নেই। কিন্তু ইসরায়েল এখনই মাথা নত করবে না। কারণ, তাদের মাথার ওপর ট্রাম্পের লম্বা হাত রয়েছে। আর আমেরিকা যখন মাথার উপর আছে, তখন ইসরাইল মরণ কামড় দেবেই।








