সরকারি হাসপাতালের বাস্তব চিত্র
ড. মোঃ কুতুবউদ্দিন সরদার
পশ্চিমবঙ্গের সরকারি হাসপাতালগুলো, যেমন এনআরএস মেডিক্যাল কলেজ অ্যান্ড হসপিটাল, এসএসকেএম (পিজি/আইপিজিএমইআর), আর.জি কর, সিএনএমসি (চিত্তরঞ্জন হসপিটাল) ইত্যাদি দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য আশীর্বাদের মতো। এই হাসপাতালগুলোতে মানুষ কম খরচে চিকিৎসা পরিষেবা পায়, যেখানে বেসরকারি হাসপাতাল ও নার্সিংহোমগুলো মূলত টাকা কামানোর জায়গা, সেখানে মোটা অংকের টাকার বিল না দিতে পারলে চিকিৎসা পাওয়া প্রায় অসম্ভব। তাই প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল থেকে অসংখ্য মানুষ প্রতিদিন কলকাতার বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য আসেন।
কিন্তু সমস্যাও কম নেই। এখানে দক্ষ ডাক্তাররা থাকলেও রোগীর চাপ এত বেশি যে, অনেক সময় সবাই সঠিক পরিষেবা পান না। তার ওপর কিছু সিনিয়র ডাক্তার দায়িত্ব এড়িয়ে চলেন, আর কাজের চাপ এসে পড়ে জুনিয়র ডাক্তারদের ওপর। ফলে তাদের ওপর অমানুষিক চাপ তৈরি হয়।
যদি গ্রামীণ এলাকার সরকারি হাসপাতালগুলোর পরিষেবা কলকাতার মতো উন্নত করা যায় এবং সঠিক তদারকি চালু হয়, তবে শহরে এত ভিড় জমবে না। তখন সরকারি হাসপাতালগুলোর পরিষেবার মানও অনেক ভাল হবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল, অনেক সময় নার্স বা কর্মচারীদের খারাপ ব্যবহার রোগীদের দুর্ভোগ বাড়ায়। ফ্রি পরিষেবা পাওয়া গেলেও টাকার জন্য চাপ দেওয়া হয়। বিশেষ করে প্রসূতি বিভাগে শিশু জন্মের পর পুত্র-কন্যা ভেদে টাকার পরিমাণ ধার্য হয়। সন্তান জন্ম থেকে শুরু করে হাসপাতাল থেকে ডিসচার্জ বা ছাড়া পাওয়া পর্যন্ত নানা ধাপে টাকা দিতে হয়। এগুলো গোপনে চলে, এমনকি সিসি ক্যামেরার চোখও ফাঁকি দেওয়া হয়। টাকা না দিলে রোগী ও তার পরিবারকে অপমানজনক আচরণ সহ্য করতে হয়।
আরেকটি বড় সমস্যা হল ওষুধ বিতরণে দুর্নীতি। ডাক্তাররা রোগীর প্রেসক্রিপশনের সঙ্গে একটি আউটডোর ইমার্জেন্সি মেডিসিন স্লিপ দেন, যেখানে ফ্রি ওষুধের তালিকা থাকে। রোগী সেই স্লিপ দেখিয়ে হাসপাতালের ফার্মেসি থেকে ন্যায্য মূল্যে ওষুধ পান। কিন্তু বাস্তবে অনেক সময় সব ওষুধ দেওয়া হয় না। কিছু ওষুধ না দিয়েও বলা হয় বাইরে থেকে কিনে নিতে হবে। অথচ অডিটের কাগজে দেখানো হয়, রোগীরা সব রকম ওষুধই পেয়েছেন। ফলে রোগী নিজে টাকা খরচ করলেও সেই খরচ আবার সরকারি হিসাবেও দেখানো হয়। এতে সরকারের কোটি কোটি টাকা ভুয়া খরচ হিসেবে অপচয় হচ্ছে, আর সেই টাকা কার পকেটে যাচ্ছে, তা স্পষ্ট নয়। এই দুর্নীতি রোধে তদন্ত জরুরি।
স্বচ্ছতা আনতে প্রস্তাব-পরামর্শ:
ফ্রি ওষুধ বিতরণের জন্য ডিজিটাল রেকর্ড ও পাবলিক ড্যাশবোর্ড চালু করা। রোগীর স্বাক্ষর বা ডিজিটাল প্রমাণ নেওয়ার ব্যবস্থা চালু করা। নিয়মিত অডিট ও হঠাৎ পরিদর্শন চালু করা। দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেলে কড়া শাস্তির ব্যবস্থা করা। বাংলার সরকারি হাসপাতাল গরিব মানুষের শেষ ভরসা। তাই কড়া প্রশাসনিক নজরদারি বজায় রেখে এই ভরসা অটুট রাখা প্রয়োজন।








