ভুটান পাহাড় ও ডুয়ার্সে টানা বৃষ্টি, ভয়াবহ বন্যা ও ধসে বিপর্যস্ত উত্তরবঙ্গ
প্রীতিময় সরখেল, নতুন পয়গাম, জলপাইগুড়ি
ভুটান পাহাড় থেকে নামা ঢল এবং টানা ভারী বর্ষণে কার্যত বিপর্যস্ত উত্তরবঙ্গের একাধিক জেলা। জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার ও কোচবিহার মিলিয়ে ডুয়ার্সের বিশাল অংশ এখন জলের তলায়। গত তিন দিন ধরে অবিরাম বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে নদীগুলির জলস্তর বিপজ্জনকভাবে বেড়ে গেছে। সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি ধূপগুড়ি, নাগরাকাটা, বানারহাট, বিন্নাগুড়ি ও গয়েরকটা অঞ্চলে।
রাতভর বৃষ্টিতে ধূপগুড়ি মহকুমার প্রায় ৩০টি গ্রাম প্লাবিত। জলমগ্ন রেড ব্যাংক, বামনডাঙ্গা ও লঙ্কাপাড়া চা-বাগান। প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ জলবন্দী হয়ে পড়েছেন, বহু পরিবার বাধ্য হয়ে উঁচু জায়গায় আশ্রয় নিয়েছেন। নদীর স্রোতে ভেসে গেছে চাষের জমি, টোটো, মোটরবাইক, এমনকি গবাদিপশুও। বানারহাট শহরের রাস্তায় জমেছে কোমর সমান জল, ফলে জাতীয় ও রাজ্য সড়কে যান চলাচল প্রায় বন্ধ।
প্রবল বৃষ্টিতে নাগরাকাটার বামনডাঙ্গা চা-বাগানে উদ্ধারকাজে নামানো হয়েছে এনডিআরএফ বাহিনী। তীব্র স্রোতের কারণে সেখানে পৌঁছনোই চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বহু জায়গায় সেতু ও কালভার্ট ভেঙে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন। ধূপগুড়ির চিন্তামণি, কুর্শামারি, পাটকিদহ, জাকইকোনা ও গধেয়ারকুঠি গ্রামপঞ্চায়েতের অধীনে থাকা একাধিক গ্রাম নদীর জলে ভেসে গেছে।
অন্যদিকে, ভুটানের পাহাড়ি ঢল থেকে সৃষ্ট ডায়না নদীতে বাঁধ ভেঙে গিয়েছে প্রায় দেড়শো মিটার অংশ। সংরক্ষিত বনাঞ্চলের লাগোয়া এই বাঁধ নদীর জলে তলিয়ে যাওয়ায় বন দপ্তরের নজরদারি রাস্তা সম্পূর্ণ ভেসে গেছে। ফলে বনাঞ্চলের বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ ও টহল কার্যত বন্ধ। বন দপ্তর ও জেলা প্রশাসনের আধিকারিকরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে ভাঙন রোধে অস্থায়ী মেরামতির কাজ শুরু করেছেন।
আবার, ভুটানের বৃষ্টির জল আংরাভাষা নদীর মাধ্যমে গয়েরকটা ও বানারহাট অঞ্চলে প্রবেশ করে প্লাবিত করেছে জ্যোতির্ময় কলোনি, শান্তিনগর ও কাশিয়াঝোরা এলাকা। শতাধিক পরিবার জলবন্দী অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। শিশু ও বৃদ্ধদের নিয়ে চরম দুর্ভোগে রয়েছেন বাসিন্দারা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এখনও পর্যন্ত প্রশাসনের তরফে পর্যাপ্ত ত্রাণ বা খাবার পৌঁছায়নি। ঘরে ঢুকে পড়েছে নদীর জল— রান্নাঘর থেকে শোবার ঘর পর্যন্ত সবই জলে ডুবে গেছে। অনেকে গাছের তলায় বা উঁচু বাঁধের ওপর আশ্রয় নিয়েছেন।
ধূপগুড়ি মহকুমা পুলিশ আধিকারিক গেইলসন লেপচা ও এসডিপিও পুষ্পা দোলমা লেপচা সরাসরি উদ্ধারকাজে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। বানারহাটে তৃণমূল কর্মীরা ট্রাক্টর ও নৌকা দিয়ে জলবন্দী মানুষদের উদ্ধার করছেন। এশিয়ান হাইওয়ে ৪৮ নম্বর সড়কের আংরাভাষা সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ধূপগুড়ি গামী যান চলাচল আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে।
ধূপগুড়ি ব্লকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে একাধিক ত্রাণশিবির খোলা হয়েছে। সেখানে উদ্ধার হওয়া পরিবারদের জন্য খাবার, শুকনো কাপড়, দুধ ও ওষুধের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পুষ্পা দোলমা লেপচা জানিয়েছেন, “আমরা সর্বত্র নজরদারি রাখছি। নদীর পাড়ের মানুষদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। প্রয়োজনে আরও ত্রাণশিবির খোলা হবে।”
অন্যদিকে, ধূপগুড়ির গধেয়ারকুঠি এলাকায় ত্রাণশিবির পরিদর্শন করেছেন উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রী উদাহরণ গুহ। তাঁর সঙ্গে ছিলেন মহকুমা শাসক, ব্লক উন্নয়ন আধিকারিক ও পুলিশ প্রশাসনের প্রতিনিধিরা। মন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন— ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে থাকবে রাজ্য সরকার।
আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত উত্তরবঙ্গে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে নদীগুলির জলস্তর আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রশাসন ইতিমধ্যেই রেড অ্যালার্ট জারি করে সব ব্লক অফিসে ২৪ ঘণ্টা কন্ট্রোল রুম চালু রেখেছে।
পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে— পাহাড়ে ধস, সমতলে বন্যা, আর দুর্ভোগের সীমা ছাড়িয়েছে সাধারণ মানুষের জীবনে। উত্তরবঙ্গ এখন কার্যত এক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সামনে দাঁড়িয়ে।







