গান্ধীর অহিংসার আলো ও গাজার অন্ধকার
মফিজুল তরফদার
নতুন পয়গাম, ২ অক্টোবর:
গান্ধীজির জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করা মানে কেবল এক ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে শ্রদ্ধা জানানো নয়, বরং এমন এক নৈতিক আদর্শকে সামনে আনা, যা আজও আমাদের অস্তিত্বের গভীরে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়। গান্ধী ছিলেন সেই মানুষ, যিনি সত্যকে জীবনযাত্রার কেন্দ্রে স্থাপন করেছিলেন এবং অহিংসাকে করেছিলেন রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রধান অস্ত্র। তাঁর কাছে অহিংসা ছিল না দুর্বলতার পরাজিত পথ, বরং তা ছিল মানুষের অন্তরের মহাশক্তির জাগরণ। আজকের পৃথিবীতে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতি ও গাজার রক্তাক্ত গণহত্যার প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে গান্ধীর দর্শনকে নতুন করে অনুধাবন না করলে, আমরা হয়তো মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎ হারিয়ে ফেলব।
গান্ধীজি বলেছিলেন, “অহিংসা দুর্বলদের অস্ত্র নয়, এটি শক্তিশালীদের সাহস।” তাঁর এই বাণী আজ গাজার ধ্বংসস্তূপের ওপর থেকে যেন আমাদের কাছে ফিরে আসে। রক্তে ভেসে যাওয়া রাস্তা, আতঙ্কে কাঁপতে থাকা শিশু, অসহায় মানুষের আর্তনাদ – সবই যেন প্রমাণ করে, সহিংসতার রাজনীতি মানবসভ্যতাকে কোথায় ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। গাজার দিকে তাকালে বোঝা যায়, বন্দুক আর বোমা হয়তো তাৎক্ষণিক প্রাধান্য এনে দিতে পারে, কিন্তু তারা কখনো ন্যায় ও স্থায়ী শান্তি গড়ে তুলতে পারে না। প্রতিটি বিস্ফোরণ আসলে আরও এক বিস্ফোরণের জন্ম দেয়, প্রতিটি প্রতিশোধ আরও গভীর প্রতিশোধের বীজ বুনে।
যদি গান্ধীজি আজ বেঁচে থাকতেন, তবে নিশ্চয়ই তিনি গাজার শিশুদের হাত ধরে দাঁড়াতেন, দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে নিজের শরীরকে ঢাল করতেন, যেমন করেছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে শুরু করে ভারতের রণাঙ্গনে। তিনি জানতেন, সত্যের শক্তি একদিন অবশ্যম্ভাবীভাবে মিথ্যার প্রাচীর ভেঙে ফেলবে। কিন্তু সত্যকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য যে সাহস দরকার, সেই সাহস আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব আজ প্রায় পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেছে। আজকের পৃথিবীতে অনেকেই অহিংসার বার্তাকে “অবাস্তব” বা “অকার্যকর” মনে করে। অথচ আমরা ভুলে যাই, ভারতবর্ষের স্বাধীনতার ইতিহাসই প্রমাণ করেছে যে অহিংসা যদি দুর্বলতার প্রতীক হতো, তবে তা দিয়ে কোনো সাম্রাজ্যের পতন ঘটানো সম্ভব ছিল না।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘর্ষ এই প্রমাণ দিচ্ছে যে শক্তির নামে চালানো সহিংসতা এক দীর্ঘস্থায়ী অন্ধকার তৈরি করে। ফিলিস্তিনের ভেঙে পড়া ঘরবাড়ি, মাটিতে ছড়িয়ে থাকা শিশুর দেহ, আহত মানুষের আর্তনাদ – এসব কি শুধু রাজনৈতিক বিরোধের ফল? না, এগুলো আসলে সেই মানবিক বিবেকের পরাজয়ের সাক্ষ্য, যা গান্ধী বারবার বাঁচিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন। তাঁর বিখ্যাত উক্তি, “চোখের বদলে চোখ নিলে গোটা পৃথিবী অন্ধ হয়ে যাবে,” আজ যেন সবচেয়ে করুণভাবে সত্য প্রমাণিত হচ্ছে। আমরা আসলেই অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছি – সামরিক শক্তির অহংকারে, ক্ষমতার বিভাজনে, সংবাদমাধ্যমের পক্ষপাতিত্বে, এমনকি আমাদের নীরব সমর্থনের মধ্য দিয়েও।
কিন্তু আমরা ভুলে যাই, গান্ধীর অহিংসার পথ কখনো সহজ ছিল না। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শক্তি ছিল ভয়ঙ্কর, তাদের অস্ত্র ছিল সর্বশক্তিমান, কিন্তু গান্ধীর হাতে ছিল কেবল প্রার্থনা ও প্রতিবাদের শান্তিপূর্ণ শক্তি। তিনি লবণ সত্যাগ্রহের সময় দেখিয়ে দিয়েছিলেন, একটি সাধারণ পদক্ষেপও কিভাবে সাম্রাজ্যের ভিত কাঁপিয়ে দিতে পারে, যদি সেই পদক্ষেপ সত্য ও ন্যায়ের শক্তিতে উজ্জীবিত হয়। আজ গাজায় কিংবা অন্য যে কোনো যুদ্ধবিধ্বস্ত ভূখণ্ডে সেই পাঠই সবচেয়ে প্রয়োজন – অস্ত্র দিয়ে নয়, মানুষকে জাগিয়ে তুলেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো যায়।
প্রশ্ন জাগে – এই সময়ে মহাত্মা গান্ধীর দর্শন কি আদৌ কার্যকর? হ্যাঁ, কার্যকর, তবে তাৎক্ষণিকভাবে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে। সহিংসতা তৎক্ষণাৎ ভয় সৃষ্টি করে, আর অহিংসা সময় নিয়ে মানুষের আত্মাকে জাগিয়ে তোলে। গান্ধী জানতেন, অহিংসা কখনো সহজ পথ নয়; বরং তা সবচেয়ে কঠিন পথ। কিন্তু সেটিই একমাত্র পথ, যা শেষ পর্যন্ত টেকসই শান্তি এনে দিতে পারে। আজকের গাজায় যদি সত্যিকারের নেতৃত্ব থাকত, তবে তারা গান্ধীর শিক্ষা থেকে শিখত – ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে হলে সত্য ও অহিংসার ওপর দাঁড়াতেই হবে। কারণ বোমা দিয়ে মাটি জেতা যায়, কিন্তু হৃদয় জেতা যায় না।
গান্ধীর দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল নৈতিক সাহসের রাজনীতি। তিনি বুঝেছিলেন, ক্ষমতা কেবল সামরিক শক্তি থেকে আসে না; প্রকৃত শক্তি আসে মানুষের নৈতিক অবস্থান থেকে। গাজার বর্তমান সংকটেও আমরা দেখতে পাচ্ছি, আন্তর্জাতিক রাজনীতির নানা শক্তি নিজেদের স্বার্থে নীরব থেকে গেছে। তাদের নীরবতা আসলে অন্যায়ের পাশে দাঁড়ানো। গান্ধীর শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয় – যে অন্যায়ের মুখে চুপ থাকে, সে-ও অন্যায়ের অংশীদার হয়ে যায়। তাই আজকের পৃথিবীতে প্রয়োজন শুধু সহানুভূতি নয়, বরং সক্রিয় নৈতিক অবস্থান।
এই সময়ে গান্ধীজিকে স্মরণ করা মানে আমাদের নিজেদের বিবেককে প্রশ্ন করা। আমরা কি সত্যিই তাঁর বার্তাকে জীবনে ধারণ করেছি, নাকি কেবল অনুষ্ঠান আর বক্তৃতার আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ রেখেছি? গাজার অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি আমাদের দেখাচ্ছে যে পৃথিবী যদি অহিংসার পথে না হাঁটে, তবে আগুনের এই ছায়া একদিন সবার দোরগোড়ায় পৌঁছাবে। শান্তির নামে যারা যুদ্ধ চালায়, তারা আসলে নিজেদের অস্তিত্বের ভিত্তিকে ধ্বংস করছে।
মহাত্মা গান্ধীর জন্মদিন তাই শুধু অতীতের স্মরণ নয়, বরং বর্তমানের এক আহ্বান। আমাদের প্রত্যেককে নতুন করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে – আমরা কি রক্তপাতের নীরব দর্শক হয়ে থাকব, নাকি সত্য ও অহিংসাকে জীবনের মূলমন্ত্র করে তুলব। যদি আমরা এই মুহূর্তে তাঁর শিক্ষাকে সত্যিকার অর্থে গ্রহণ করি, তবে হয়তো গাজার শিশুর কান্না থেকে নতুন আশার সঙ্গীত জন্ম নিতে পারে। আর যদি না করি, তবে ইতিহাস আমাদেরকে মনে রাখবে সেই অন্ধকার প্রজন্ম হিসেবে, যারা গান্ধীর আলোকে উপেক্ষা করে যুদ্ধের অগ্নিকুণ্ডে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল।
গান্ধীর দর্শন তাই আজ শুধু একটি নৈতিক বার্তা নয়, বরং আমাদের বেঁচে থাকার একমাত্র শর্ত। গাজার অন্ধকারে দাঁড়িয়ে তাঁর অহিংসার আলোই আমাদের শেখায় – মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে না পারলে, সভ্যতা কেবল ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে। এবং সেই ধ্বংসস্তূপে একদিন সবাই সমানভাবে সমাহিত হবে – বিজয়ী-পরাজিত, শক্তিধর-দুর্বল সকলেই। তাই গান্ধীর জন্মদিন কেবল উৎসব নয়, মানবজাতির জন্য সতর্কবার্তা। এখনই যদি সত্য ও অহিংসার আলোকে ধারণ না করি, তবে পৃথিবীর মানচিত্রে আরও বহু গাজা সৃষ্টি হবে, আর সভ্যতার নামান্তর হয়ে দাঁড়াবে কেবল ধ্বংস।








