বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. ইউনূসের সাক্ষাতকার
নতুন পয়গাম, নিউ ইয়র্ক, ১ অক্টোবর:
রাষ্ট্রসংঘের ৮০তম বার্ষিক অধিবেশন উপলক্ষে আমেরিকার নিউইয়র্কে রয়েইছেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সেখানেই অধিবেশনের ফাঁকে জিটিও-র সাংবাদিক মেহদি হাসানকে দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দিয়েছেন তিনি। তাতে জুলাই-২০২৪ এর গণঅভ্যুত্থান, আওয়ামী লীগ সরকারের পতন, শেখ হাসিনার দেশত্যাগ, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেওয়া, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা এবং আসন্ন পার্লামেন্ট নির্বাচন-সহ নানা বিষয়ে কথা বলেছেন ইউনূস।
বাংলাদেশের শীর্ষ দৈনিক ‘প্রথম আলো’য় প্রকাশিত হয়েছে সেই সাক্ষাতকার। তারই অংশবিশেষ এখানে তুলে দেওয়া হল।
মেহদি হাসান: আমরা শেষবার কথা বলেছিলাম ২০১৭ সালে। তার পর থেকে অনেক কিছু ঘটেছে। তখন আপনি বাংলাদেশের একজন নাগরিক ছিলেন। আপনার পরিচয় ছিল নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ। এক বছরের কিছুটা বেশি সময় আগে, বাংলাদেশের ছাত্র বিক্ষোভ ও গণআন্দোলনের জেরে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। প্রায় দুই দশক ধরে যিনি কার্যত একনায়ক ছিলেন এবং বহু রকমের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তাঁর বিদায়ে অনেকেই খুশি হয়েছিলেন। তাঁর সরকারের পতনে আপনার প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া কী ছিল?
অধ্যাপক ইউনূস: রোমাঞ্চকর, রোমাঞ্চকর। হ্যাঁ, সত্যিই। অবশেষে এটা ঘটল। এটা ছিল অসাধারণ এক খবর। তবে এটা ছিল সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত। বিক্ষোভ চলছিল, কিন্তু এমন কিছু ঘটবে, তা ভাবিনি। পরিস্থিতি খুবই খারাপ দিকে মোড় নিয়েছিল। তিনি দেশ ছাড়ার আগে কী ঘটেছিল, তার বিস্তারিত আমি তখন জানতাম না। তবে শেষ খবরটা ছিল, তিনি চলে গেছেন। সেটি ছিল রোমাঞ্চকর।
মেহদি হাসান: গত এক বছরে বাংলাদেশের মানুষের প্রতিক্রিয়া কেমন? আপনারা বিপ্লবের এক বছর পূর্তি উদযাপন করলেন। বর্তমানে দেশের পরিস্থিতিটা কেমন?
অধ্যাপক ইউনূস: সবকিছুই আছে। কিছু ঘটছে এই উত্তেজনার পাশাপাশি সব মিলিয়ে হতাশাও আছে। কারণ, মানুষ অভিযোগ করতে ভালবাসেন। এটা একটা সাধারণ বিষয়। তাঁরা আরও চান। প্রত্যাশার মাত্রা অনেক বেশি। তাঁরা চান সব কিছু এখনই হোক, আগামীকাল নয়। তাই যদি আজ কিছু না হয়, তাহলে আপনি ভাল নন। বিষয়গুলো এ ধরনের, তবে এটি একটি ভাল দিক। নেতিবাচক নয়। এটি কেবল উচ্চ প্রত্যাশা।
মেহদি হাসান: হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর ছাত্র আন্দোলনকারীরা আপনাকে অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য বেছে নিয়েছিলেন। আপনি কি অবাক হয়েছিলেন? কেনই বা তাঁরা আপনাকে চেয়েছিলেন, একজন অরাজনৈতিক, একজন অর্থনীতিবিদ এবং আশির কোঠায় থাকা একজনকে? তাঁরা কেন আপনাকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে বেছে নিলেন?
অধ্যাপক ইউনূস: আমি অবাক হয়েছিলাম, কারণ, আমি তাদের চিনি না। কখনো তাদের সঙ্গে আমার দেখা বা কথা হয়নি। প্রথমে আমার প্রতিষ্ঠানের সহকর্মীদের কাছে একটি বার্তা আসে যে, ছাত্ররা নাকি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছে। তারা চায়, আমি কার্যনির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করি। আমি বললাম, এই আলোচনায় যুক্ত হবেন না। তাদের বোঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছিল, আমি এতে রাজি নই। পরদিন তারা সরাসরি আমার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে। কারণ, আমার সহকর্মীদের মাধ্যমে তাদের কাজটা ঠিকঠাক হচ্ছিল না। তারা আমাকে কল করে সবকিছু ব্যাখ্যা করেছিল। আমি বলেছিলাম, না, আমি নই, অন্য কাউকে খোঁজো। আমি এর সঙ্গে জড়াতে চাই না। তিন দিন ধরে এই আলোচনা চলল। আমি এটা থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করছিলাম। আর তারা বারবার অনুরোধ করছিল।
দেখুন, ছাত্ররা রক্ত দিয়েছে, জীবন দিয়েছে, আত্মত্যাগ করেছে, শিশুদেরকে পর্যন্ত গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। আরও অনেক কিছু ঘটেছে। তারা চায়, আপনি আসুন। এ সবকিছু বাদ দিন। দেশের কী হবে? তারা খুব করে এটি চেয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে তারা যুক্তি তুলে ধরার চেষ্টা করছিল। অবশেষে আমি বললাম, ঠিক আছে, তোমরা যখন এত আত্মত্যাগ করেছ, তাহলে আমি আমার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করব। দেখব তোমাদের জন্য কী করতে পারি।
মেহদি হাসান: নিউইয়র্ক টাইমস খবর করেছে, শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠক করছেন। এটা কি আপনাকে উদ্বিগ্ন করে?
অধ্যাপক ইউনূস: আমি ঠিক এভাবে কথাগুলো বলব না। তবে এ সম্ভাবনা রয়েছে যে, বাইরের কিছু শক্তি তাঁকে বাংলাদেশে ফিরে আসতে সহায়তা করবে। আমরা সব সময় এটা নিয়ে উদ্বিগ্ন।
মেহদি হাসান: আপনি কি নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে কথা বলেছেন?
অধ্যাপক ইউনূস: হ্যাঁ, আমি মোদির সঙ্গে কথা বলেছি।
মেহদি হাসান: আপনি যখন হাসিনাকে বিচারের মুখোমুখি করার জন্য ফিরিয়ে দিতে বললেন, তখন তিনি (মোদি) কী বললেন?
অধ্যাপক ইউনূস: প্রথমত, আমি বলেছিলাম, আপনারা যদি তাঁকে রাখতে চান, তাঁর সঙ্গে কী করবেন, তা আমি আপনাকে বলতে পারি না। তবে এটা নিশ্চিত করেন যে, তিনি আমাদের সম্পর্কে কথা বলবেন না। তিনি যেন বাংলাদেশের মানুষকে নিয়ে কথা না বলেন।
মেহদি হাসান: মোদি আপনাকে এ কথা বলেছিলেন, নাকি আপনি তাঁকে বলেছিলেন?
অধ্যাপক ইউনূস: আমি মোদিকে বলেছিলাম। বলেছিলাম যে অনুগ্রহ করে নিশ্চিত করেন। মোদি বলছিলেন, আমি সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না।
মেহদি হাসান: আপনার সরকার আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করেছে, তাদের নিবন্ধন স্থগিত করেছে, কার্যত পরবর্তী নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে তাদেরকে নিষিদ্ধ করেছে। আপনার মতোই নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেন, যিনি আপনাকে খুব ভাল করেই চেনেন, তিনি আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার বিষয়ে সতর্ক করে বলেছিলেন, এটা পূর্ববর্তী সরকারের (হাসিনা) ভুলের পুনরাবৃত্তি হবে, যারা ক্ষমতায় এসে বিরোধীদের নিষিদ্ধ করেছিল। এর কী জবাব দেবেন আপনি?
অধ্যাপক ইউনূস: এটা ভুল সমালোচনা। কারণ, আমরা আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করিনি।
মেহদি হাসান: আপনারা তো নিবন্ধন স্থগিত করেছেন?
অধ্যাপক ইউনূস: না, নিবন্ধন নয়। শুধু তাদের কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে। এর অর্থ হল, তারা কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড করতে পারবে না।
মেহদি হাসান: তাহলে তারা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবে না।
অধ্যাপক ইউনূস: দলটি এখনো আছে। কিন্তু এখন তারা ভোটে লড়তে পারবে না। আপাতত তাদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ। তারা রাজনৈতিক দল হিসেবে বৈধ, তবে এখন কার্যক্রম স্থগিত। যেকোনো সময় এর কার্যক্রম চালু করা হতে পারে।
মেহদি হাসান: আপনি স্থগিতাদেশ তুলে নিতে পারেন?
অধ্যাপক ইউনূস: স্থগিতাদেশ তুলে নেওয়া, এটা একটা সম্ভাবনা।
মেহদি হাসান: কিন্তু একটি গোষ্ঠীর মানুষকে নির্বাচনে অংশ নেওয়া থেকে নিষিদ্ধ করাটা কতটা গণতান্ত্রিক?
অধ্যাপক ইউনূস: দেখুন, নির্বাচন কমিশন এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারা এটা করেছে দলটির চরিত্র ও সম্ভাবনা দেখে যে, তারা পুরো নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করবে। তাই তারা ভেবেছে, এটা না করাই ভালো…।
মেহদি হাসান: কিন্তু আপনি অস্বীকার করতে পারবেন না যে, বাংলাদেশে তাদের লাখ লাখ সমর্থক আছেন?
অধ্যাপক ইউনূস: আমি লাখ লাখ বলব না। তাদের সমর্থক আছে। কিন্তু কতজন অবশিষ্ট আছে, তা জানি না। কারণ, সমর্থক এমন একটি বিষয় যে আপনি খুব ক্ষমতাধর, আমি সব সময় আপনার সামনে মাথা নত করি, কারণ, আপনি ক্ষমতাধর। আমি একজন সমর্থক হয়ে তা করছি না।
মেহদি হাসান: কিন্তু আপনি এটা অস্বীকার করতে পারেন না যে, বাংলাদেশে তাদের ভোটার আছে।
অধ্যাপক ইউনূস: অবশ্যই, এটা দীর্ঘদিনের একটি দল।
মেহদি হাসান: কিন্তু এখন সেই ব্যক্তিদের কথা বলার কোনো জায়গা নেই। আপনি তাঁদের দলকে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি বলতে চাচ্ছি, আপনি তাঁদের দলকে রাজনীতিতে অংশ নিতে বাধা দিয়েছেন।
অধ্যাপক ইউনূস: তাঁরা ভোটার হিসেবে ভোট দিতে পারেন। তাঁরা বৈধ ভোটার। অনেক প্রতিদ্বন্দ্বী আছেন। তাঁরা নিজেদেরটা বেছে নেবেন। আওয়ামী লীগের মার্কাটা সেখানে থাকবে না।
মেহদি হাসান: কিন্তু এটা কি ভাল হবে? যেখানে মানুষ বলছে, নতুন সরকার পুরোনো সরকারের ওপর দমনপীড়ন চালাচ্ছে, চক্রটা চলতেই থাকল?
অধ্যাপক ইউনূস: অন্যথায় আমরা নির্বাচন করতে পারব না। এটা যদি মোটের ওপর একটা দল হয়, একটি রাজনৈতিক দল, তারা একটি রাজনৈতিক দলের মতো আচরণ করছে না। তারা যে মানুষ হত্যা করেছে, সে জন্য অনুশোচনা প্রকাশ করেনি। এই সময়ে তারা যা যা করেছে, তার কোনো কিছুরই দায় নেয়নি, একটি বিষয়েরও না। সব সময় অভিযোগ করছে যে এর জন্য অন্য কেউ দায়ী।








