রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও স্বাস্থ্য পরিষেবা
কলমে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
নতুন পয়গাম, কলকাতা, ১ অক্টোবর:
অত্যন্ত আনন্দের সাথে জানাচ্ছি যে, আমাদের গর্বের আইপিজিএমইআর এবং এসএসকেএম হাসপাতালকে ব্রিকস নেটওয়ার্কে মাত্র দুটি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে। এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বাংলার মুকুটে আরও এক নতুন পালক যোগ করল। আমাদের মা-মাটি-মানুষ সরকার আগেই এই প্রতিষ্ঠানকে ‘সেন্টার অফ এক্সেলেন্স’ হিসেবে ঘোষণা করেছিল। এই গর্বের আন্তর্জাতিক সাফল্যের জন্য আমি বাংলার স্বাস্থ্য পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত সকলকে অভিনন্দন জানাচ্ছি। এই স্বীকৃতির সম্মানস্বরূপ আমাদের রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে ১০ লক্ষ টাকার অনুদানও আমরা এসএসকেএম হাসপাতালকে দিচ্ছি।
বাংলার স্বাস্থ্য পরিষেবায় বিগত ১৪ বছর ধরে ধারাবাহিক উন্নয়নের যে জোয়ার এসেছে, তারই অঙ্গ হিসেবে আজ (১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫) আমি এসএসকেএম হাসপাতাল প্রাঙ্গনে ওই হাসপাতালের জন্য মোট ১৮টি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের উদ্বোধন ও শুভ সূচনা করলাম, যেগুলির মোট প্রকল্প মূল্য ২৬১ কোটি ৪৮ লক্ষ টাকা। এর মধ্যে উদ্বোধন করা হল ১৫টি প্রকল্পের, যেগুলির জন্য আমাদের খরচ হয়েছে ১৬২ কোটি টাকারও বেশি। শুভ সূচনা করা হল ৩টি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের, যেগুলো করতে খরচ হবে প্রায় ১০০ কোটি টাকা।
যে প্রকল্পগুলি আজ উদ্বোধন হল, সেগুলো প্রত্যেকটাই খুব দরকারি। তবে তার মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য একটি হল, নতুন অত্যাধুনিক প্রাইভেট কেবিন বিল্ডিং, যাকে উডবার্ন ওয়ার্ডেরই দ্বিতীয় আধুনিক সংস্করণ বলা যেতে পারে। ১০ তলা এই ভবনে ১৩১টি কেবিন আছে। এখানে তুলনায় অনেক কম খরচে বড় বড় কর্পোরেট হাসপাতালগুলোর স্তরের আধুনিক স্বাস্থ্য পরিষেবা মানুষ পাবেন। আমি এই ভবনের নাম রেখেছি ‘অনন্য’। এর জন্য খরচ হল প্রায় ৬৭ কোটি টাকা।
এছাড়া আজ এখানে উদ্বোধন হল ক্রিটিকাল পেশেন্টদের জন্য ৫০টি বেডের অত্যাধুনিক ক্রিটিকাল কেয়ার ব্লক; সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় এই প্রথম নিখুঁত এবং অত্যাধুনিক পদ্ধতিতে জটিল অস্ত্রোপচারের জন্য রোবোটিক সার্জিকাল সিস্টেম; পূর্ব ভারতের সর্বপ্রথম অত্যাধুনিক ‘বোন ব্যাঙ্ক’; লি রোডে সাততলা ছাত্রাবাস; নিউ ওপিডি বিল্ডিং ও মেন ব্লকের সংযোগকারী দ্বিতীয় গ্যাংওয়ে ইত্যাদি।
এছাড়া, এখানে আমরা যে অত্যাধুনিক ক্যান্সার হাব করেছি, সেখানে ক্যান্সার রোগীদের ট্রিটমেন্টে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করার জন্য তিন ধরনের আধুনিক যন্ত্র কেনার কথাও আজ ঘোষণা করা হল। এর জন্য খরচ হবে ৯৯ কোটি ৪৮ লক্ষ টাকা। আমি স্বাস্থ্য দপ্তর ও এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত সকল ডাক্তার, নার্স, ছাত্র-ছাত্রী ও অন্যান্য সকলকে অভিনন্দন জানাই। আমি আশা করব, এই প্রকল্পগুলির সফল রূপায়নের ফলে আরও ভালভাবে রোগীদের পরিষেবা দেওয়া সম্ভব হবে। সাধারণ মানুষ এর ফলে উপকৃত হবেন।
এছাড়া আরো ২টি বড় ভবনের উদ্বোধন আজ হল, যার মধ্যে আছে মৌলালিতে ডিরেক্টরেট অফ ড্রাগ কন্ট্রোলের নতুন সাততলা ভবন এবং স্বাস্থ্য ভবন-এর ৬ তলা অ্যানেক্স বিল্ডিং। এই ২টি করতে খরচ হয়েছে ৪৮ কোটি ৯২ লক্ষ টাকা। রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে আমূল পাল্টে দিয়েছি আমরা। বিগত ১৪ বছরে স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ প্রায় ৬ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১০-১১ সালে বরাদ্দ ছিল ৩ হাজার ৫৮৪ কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ সালে সেটা বেড়ে হয়েছে ২১ হাজার ৩৫৫ কোটি টাকা। বাংলার ২ কোটি ৪৫ লক্ষ পরিবারের ৮ কোটি ৭২ লক্ষেরও বেশি মানুষ ‘স্বাস্থ্যসাথী’র অধীনে স্বাস্থ্য পরিষেবা পাচ্ছেন। এর আওতায় রাজ্যের মানুষ প্রাইভেট নার্সিংহোমে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রায় ৯০ লক্ষ চিকিৎসা পরিষেবা পেয়েছেন। খরচ হয়েছে ১২ হাজার কোটি টাকা।
‘স্বাস্থ্য ইঙ্গিত’ Telemedicine প্রকল্পে প্রায় ১০ হাজার কেন্দ্র থেকে প্রতিদিন গড়ে ৮০ হাজার মানুষ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের কাছ থেকে বিনামূল্যে টেলি কনসাল্টেশন পরিষেবা পাচ্ছেন। ইতিমধ্যেই উপকৃত হয়েছেন ৫ কোটি ৪৫ লক্ষ মানুষ। ‘চোখের আলো’ প্রকল্পে বিনামূল্যে ২১ লক্ষ ৭৩ হাজার ছানি অপারেশন করা হয়েছে এবং বয়স্ক মানুষ ও ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে ২৯ লক্ষ ২৫ হাজার চশমা বিতরণ করা হয়েছে। আমরা শিশুদের জন্য ‘শিশুসাথী’ প্রকল্পে বিনামূল্যে হার্টের অপারেশনও নিশ্চিত করেছি।
দেশের সেরা সরকারি স্বাস্থ্য পরিকাঠামো এখন বাংলায়। স্বাস্থ্য পরিকাঠামো উন্নয়নে আমরা খরচ করেছি প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা। ১৪টি সরকারি মেডিকেল কলেজ, ৪২টি সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল, ১৩ হাজার ৫০০টি সুস্বাস্থ্য কেন্দ্র, ৭৬টি সিসিইউ, ৩টি এইচডিইউ এবং ১৭টি মাদার অ্যান্ড চাইল্ড হাব স্থাপন করেছে।
এমবিবিএস আসন ১৩৫৫ থেকে বেড়ে ৫৭০০ হয়েছে, এবং ১৪ হাজার ডাক্তার নিয়োগ করা হয়েছে। নার্সিং প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৫৭ থেকে বেড়ে ৪৫১ হয়েছে, যেখানে আসন সংখ্যা ২২৬৫ থেকে বেড়ে ২৮ হাজার ৫৪৭ হয়েছে। সরকারি হাসপাতালে নার্সিং স্টাফের সংখ্যা ৩৩,৮৩১ থেকে বেড়ে ৫৯ হাজার ১১৩ হয়েছে এবং প্যারামেডিক্যাল স্টাফের সংখ্যা ৩,৪৮৮ থেকে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে ৮ হাজার ৩০০ হয়েছে।
লেডি ডাক্তারদের জন্য ১৫০ কোটি টাকা দিয়ে ৭টি হস্টেলও করা হচ্ছে। ‘রাত্তিরের সাথী’ প্রকল্পে ১৩০ কোটিরও বেশি টাকা খরচ করা করেছে। ‘আশা’ এবং ‘আইসিডিএস’-এর মেয়েদের কাজে সুবিধার জন্য ১ লক্ষ অঙ্গনওয়াড়ি ও ৭০ হাজার আশাকর্মীকে স্মার্টফোন দেওয়া হচ্ছে। এর জন্য বাজেটে ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। সর্ব স্তরে, Post Graduate Trainees, Interns, House Staff-দের স্টাইপেন্ড উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
(মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ফেসবুক ওয়াল থেকে নেওয়া লেখার অংশবিশেষ)








