দেশের মূল ভিত্তি সংবিধান, বহুত্ববাদ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ: জামাআতে ইসলামী
নতুন পয়গাম, নয়াদিল্লি, ২৯ সেপ্টেম্বর:
উত্তর প্রদেশের বরেলিতে মাওলানা তাউক্বীর রেযা খান-সহ কয়েকজনের গ্রেপ্তারের তীব্র নিন্দা জানাল জামাআতে ইসলামী হিন্দ। সংগঠনের সর্বভারতীয় সভাপতি সাইয়েদ সা’দাতুল্লাহ হুসাইনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “সম্মানিত আলেম মাওলানা তাউক্বীর রেযা খান-সহ বহুজনের গ্রেপ্তার হওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এই ঘটনা দেশের রাজনীতিকে সাম্প্রদায়িক ঘৃণা ও বিভেদের পথে টেনে নেওয়ার এক ভয়ংকর নিদর্শন। বিষয়টি শুরু হয়েছিল একটি স্লোগান দিয়ে — ‘আই লাভ মুহাম্মদ’, যা ছিল ভালবাসা ও শ্রদ্ধার প্রকাশ। অথচ সেটিকেই জন-শৃঙ্খলার জন্য হুমকি বলে দেখানো হল।
শান্তিপূর্ণ বিশ্বাসের প্রকাশকে এফআইআর ও গণগ্রেপ্তারের মাধ্যমে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা শুধু অন্যায্যই নয়, বরং দেশের বহুত্ববাদ, ঐক্য-সম্প্রীতির পরম্পরাগত চেতনাকে পদদলিত করার মতো এক ভয়াবহ আঘাত। দীর্ঘ কয়েক শতাব্দী ধরে এদেশের মানুষ ভিন্ন ভিন্ন ধর্মবিশ্বাস নিয়ে পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা, সম্মান বজায় রেখে শান্তিপূর্ণভাবে পাশাপাশি বসবাস করে আসছে। এমন এক ভালবাসার প্রকাশ সমাজকে বিভক্ত করতে পারে, এটা অকল্পনীয়। আসলে রাজনৈতিক কৌশল ও দুষ্টচক্রই এই সংকট সৃষ্টি করেছে বলে উল্লেখ করেন জামাআতে ইসলামীর সর্বোচ্চ নেতা হুসাইনি।”
তিনি আরও বলেন, “খবর পাওয়া যাচ্ছে, মাওলানা তাউক্বীর রেযা সাহেবকে প্রথমে গৃহবন্দি করা হয়, পরে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার কঠোরতম ধারাগুলির অধীনে অযৌক্তিকভাবে ব্যাপক এফআইআর করা হয় এবং তদন্ত ছাড়াই কয়েক’শ মুসলিমের নাম জড়ানো হয়েছে। এর থেকেও দুঃখজনক বিষয় হল, কিছু রাজনৈতিক নেতা একজন বরেণ্য ইসলামী পণ্ডিত তথা আলেমকে নিয়ে অবমাননাকর ভাষা ব্যবহার করেছেন, যা গোটা ঘটনার কুৎসিত রাজনৈতিক উদ্দেশ্য স্পষ্ট করে দেয়। রাষ্ট্রীয় শক্তির এমন বৈষম্যমূলক আচরণ শুধু আইনের শাসনকে দুর্বল করে না, বরং সমাজে অবিশ্বাস ও বিচ্ছিন্নতাও বাড়িয়ে তোলে।
ভারতের গণতান্ত্রিক ইতিহাস অসংখ্য আন্দোলন ও প্রতিবাদের সাক্ষী। পাথর ছোড়া বা সম্পত্তি নষ্ট করার মতো সহিংস কাজ সবসময়ই নিন্দনীয়, তবে যথাযথ তদন্ত ছাড়া কোনো অভিযোগের বৈধতা থাকে না। আর শাসন ব্যবস্থার মূলনীতি হল, আইন প্রয়োগ হতে হবে ভারসাম্যপূর্ণ ভাবে। অতীতে একই ধরনের আন্দোলন সরকার সংযম ও ভারসাম্য বজায় রেখে সামলেছে, কঠোর আইন প্রয়োগ বা গোটা সম্প্রদায়কে অপরাধী বানানো হয়নি। অথচ এখন বেছে বেছে অতিরিক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, যা সংবিধানের চেতনা ও ন্যায়সঙ্গত শাসনের নীতিকে ভঙ্গ করছে।
হুসাইনির কথায়, রাজনৈতিক স্বার্থে রাষ্ট্রযন্ত্র ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অপব্যবহার করা হচ্ছে। আইন শৃঙ্খলার চ্যালেঞ্জকে ব্যবহার করা হচ্ছে সাম্প্রদায়িক বিভাজন বাড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে। প্রতিবার নির্বাচন ঘনিয়ে এলে একই চক্র পুনরাবৃত্ত হয়, সম্প্রদায়কে বিভক্ত করা হয়, অবিশ্বাস তৈরি করা হয়, আর হীন রাজনৈতিক স্বার্থে সামাজিক বন্ধনকে বিসর্জন দেওয়া হয়। এ এক ভয়ংকর প্রবণতা, যা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও সাংবিধানিক মূল্যবোধকে ধ্বংস করছে।”
জামা’আত সভাপতি মুসলিম সমাজকে আহ্বান জানিয়ে বলেছেন ধৈর্য, শান্তি এবং নবী করিম (সা.)-এর দয়া ও করুণার শিক্ষায় অনুপ্রাণিত থাকতে। একই সঙ্গে তিনি সরকারকে আহ্বান জানিয়েছেন, অতিরঞ্জিত অভিযোগ অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে, অন্যায়ভাবে আটক ব্যক্তিদের মুক্তি দিতে এবং শাসন ব্যবস্থায় ন্যায়, ভারসাম্য ও সমতা ফিরিয়ে আনতে। শেষে তিনি বলেন, ভারতের শক্তি তার সংবিধান, বহুত্ববাদ এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার সামাজিক বন্ধনে নিহিত। সাময়িক রাজনৈতিক স্বার্থে এই ভিত্তিকে দুর্বল করা শুধু একটি সম্প্রদায়ের ক্ষতি নয়, বরং পুরো দেশ ও জাতির ক্ষতি ডেকে আনে।








