ট্রাম্পের “দ্য বোর্ড অব পিস”ঘোষণা, হতে চান গাজার নতুন ত্রানকর্তা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
নতুন পয়গাম, নিউইয়র্ক
যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার আকাশে আজ এক অদ্ভুত আলোর রশ্মি পড়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে সংবাদ সম্মেলনে দাঁড়িয়ে, ২০ দফা বিস্তারিত শান্তি পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। এর মূলে রয়েছে “দ্য বোর্ড অব পিস”—একটি আন্তর্জাতিক অধীনস্থ সংস্থা, যার চেয়ারম্যান হবেন নিজে ট্রাম্প। এটি গাজার অস্থায়ী শাসনের তত্ত্বাবধান করবে, যা ট্রাম্পকে গাজার ভবিষ্যতের ‘ত্রানকর্তা’ হিসেবে চিত্রিত করছে। কিন্তু এই পরিকল্পনা কি সত্যিই শান্তির সেতু, নাকি নতুন একটি নিয়ন্ত্রণের জাল?
পরিকল্পনার মূল বিন্দু: হামাসকে সম্পূর্ণ বিলুপ্তি বা অস্ত্রত্যাগের শর্তে ক্ষমা, ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সকল জিম্মির মুক্তি, ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং তাৎক্ষণিক মানবিক সাহায্যের প্রবাহ। গাজা হবে ‘ডির্যাডিকালাইজড’ অঞ্চল—কোনো সামরিক স্থাপনা ছাড়া, যা একটি টেকনোক্র্যাটিক প্যালেস্টাইনীয় কমিটি চালাবে। এই কমিটির উপর নজর রাখবে ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন বোর্ড, যাতে যুক্ত হবেন ব্রিটিশ প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারসহ অন্যান্য নেতা। বোর্ডটি গাজার পুনর্নির্মাণের জন্য ‘ট্রাম্প ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান’ তৈরি করবে, যা গাজাকে ‘রিভিয়েরা’-সদৃশ হাই-টেক শহরে রূপান্তরিত করার স্বপ্ন দেখায়। স্পেশাল ইকোনমিক জোন গঠনের মাধ্যমে বিনিয়োগ আকর্ষণ, যা গাজাবাসীদের জন্য চাকরি ও সমৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে।
নেতানিয়াহু এই পরিকল্পনাকে ‘সহজ পথ’ বলে সমর্থন করেছেন, কিন্তু সতর্ক করে বলেছেন, হামাস যদি প্রত্যাখ্যান করে, তাহলে ‘কঠিন পথ’—অর্থাৎ হামাসের সম্পূর্ণ ধ্বংস—অনিবার্য। ট্রাম্প বলেছেন, “আমরা খুব কাছে, এমনকি তারও অতীত। আমি এই বোর্ডের চেয়ার হচ্ছি, কারণ আমি শান্তি আনতে পারি।” এর ফলে রাফাহ ক্রসিং উন্মুক্ত হবে, জল-বিদ্যুৎ-স্যুয়েজ পুনরুদ্ধার হবে, হাসপাতাল ও বেকারি পুনর্নির্মিত হবে। জাতিসংঘ ও রেড ক্রিসেন্টের মাধ্যমে সাহায্য বিনা বাধায় প্রবেশ করবে।
বিশ্বের প্রতিক্রিয়া মিশ্র। প্যালেস্টাইন অথরিটি ট্রাম্পের ‘আন্তরিক প্রচেষ্টা’কে স্বাগত জানিয়েছে, দুই-রাষ্ট্র সমাধানের পথে অগ্রসর হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আরব দেশসমূহ—সৌদি, জর্ডান, মিশরসহ—সমর্থন জানিয়েছে, কিন্তু পশ্চিম তীরের অধিকৃতির বিরুদ্ধে সতর্কবাণী করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ‘দুই-রাষ্ট্র সমাধান’কে একমাত্র পথ বলে পুনর্ব্যক্ত করেছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, “প্যালেস্টাইনীয় অধিকার স্বীকার না করলে এটি টেকসই নয়।”
কিন্তু হামাসের প্রতিক্রিয়া তীব্র। তারা বলেছে, এটি ‘আমেরিকান-ইসরায়েলি চক্রান্ত’, যা গাজাকে কলোনিয়াল জোনায় পরিণত করবে। ইসলামিক জিহাদ এটিকে ‘আঞ্চলিক বিস্ফোরণের রেসিপি’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যবহারকারীরা প্রশ্ন তুলছেন: ট্রাম্প কেন নিজেকে বোর্ডের হেড করছেন? এটি কি শান্তি, নাকি নিয়ন্ত্রণ? একজন প্যাকিস্তানি ইউজার লিখেছেন, “কোনো মুসলিম দেশের নেতা না থাকলে এটি অগ্রহণযোগ্য।”
টনি ব্লেয়ার পরিকল্পনাকে ‘সাহসী ও বুদ্ধিমান’ বলে সমর্থন করেছেন, বলেছেন এটি গাজায় তাৎক্ষণিক স্বস্তি আনবে এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। কিন্তু সমালোচকরা বলছেন, এতে প্যালেস্টাইনীয় সার্বভৌমত্বের কোনো স্পষ্ট পথ নেই—শুধু অস্থায়ী নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনৈতিক নির্ভরতা। ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার হলেও ‘বাফার জোন’ ধরে রাখার অধিকার থাকবে, যা চিরকালীন হতে পারে।
এই ঘোষণা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নতুন ঝড় তুলেছে। ট্রাম্পের এই ‘ত্রানকর্তা’ ভূমিকা কি গাজাকে নতুন জীবন দেবে, নাকি নতুন দ্বন্দ্বের বীজ বপন করবে? বিশ্ব নিঃশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করছে—হামাসের উত্তর এবং পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য। যুদ্ধের দ্বিতীয় বার্ষিকী কাছে এসে দাঁড়ালেও, এই পরিকল্পনা কি সত্যিই শান্তির দরজা খুলবে? সময়ই বলবে।








