নাগিরেভের কালো ইতিহাস: যখন স্ত্রীদের হাতেই মৃত্যু বরণ করেছিলেন শত শত স্বামী
ডেস্ক রিপোর্ট
নতুন পয়গামঃ
ভয়াবহ এক আদালত কাহিনি
১৯২৯ সালের ডিসেম্বর। হাঙ্গেরির ছোট্ট শহর সলনোকের আদালতে এক ভয়ঙ্কর মামলার শুনানি শুরু হয়। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আছেন ডজন ডজন নারী। অভিযোগ—তাঁরা ইচ্ছাকৃতভাবে স্বামীদের আর্সেনিক খাইয়ে হত্যা করেছেন। সংবাদমাধ্যম দ্রুত এ ঘটনাকে নাম দিল—“অ্যাঞ্জেল মেকার কেলেঙ্কারি”।
তখন নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, ৫০ জনের বেশি নারীকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। আর মৃত্যুর সংখ্যা? প্রায় তিন শতাধিক পুরুষ।
এক গ্রামের অস্বাভাবিক মৃত্যুর সূত্রপাত
নাগিরেভ গ্রাম, কুনসাগ অঞ্চলের তিজা নদীর তীরে। রাজধানী বুদাপেস্ট থেকে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এ গ্রামটি মূলত কৃষক সম্প্রদায়নির্ভর। কিন্তু ১৯১১ সাল থেকে গ্রামে অদ্ভুতভাবে পুরুষেরা একের পর এক মারা যেতে শুরু করেন।
প্রথমদিকে সবাই ভেবেছিল, হয়তো রোগ–ব্যাধি। কিন্তু কবর থেকে মরদেহ তোলার পর পরীক্ষায় দেখা গেল ভয়ঙ্কর সত্য—প্রায় সব দেহেই আর্সেনিকের উপস্থিতি।
‘অ্যাঞ্জেল মেকার’ শব্দের উৎপত্তি
আর্সেনিক দিয়ে হত্যাকাণ্ড এত ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল যে, ইউরোপীয় সংবাদমাধ্যম নারীদের ডাকতে শুরু করে ‘অ্যাঞ্জেল মেকার’—যেন তাঁরা পুরুষদের স্বর্গে পাঠাচ্ছেন। শুধু স্বামীই নয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে অবাঞ্ছিত সন্তানকেও একই কায়দায় হত্যা করা হয়েছিল।
ঝুঝানা ফাজেকাশ: মৃত্যুর নেপথ্য কারিগর
এ ভয়ঙ্কর অধ্যায়ের কেন্দ্রে ছিলেন একজন নারী—ঝুঝানা ফাজেকাশ। পেশায় ধাত্রী হলেও তিনি ভেষজ ও রাসায়নিক সম্পর্কে জানতেন। গ্রামে চিকিৎসক বা পুরোহিত না থাকায় তিনি হয়ে উঠেছিলেন গ্রামবাসীর নির্ভরযোগ্য মুখ।
নারীরা যখন মাতাল স্বামীদের সহিংসতা, নির্যাতন বা জোরপূর্বক বিয়ের দুঃসহ অভিজ্ঞতার কথা বলতেন, তখন ফাজেকাশ বলতেন—
“যদি তাঁদের সঙ্গে থাকা অসম্ভব হয়ে যায়, আমার কাছে সহজ সমাধান আছে।”
সেই ‘সমাধান’ ছিল তাঁর তৈরি আর্সেনিক। ফাজেকাশের বাড়ির বাগানে পুঁতে রাখা শিশি থেকে পরবর্তীতে বিষও উদ্ধার করা হয়।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও নারীদের স্বাধীনতার স্বাদ
বিশ্বযুদ্ধ যখন শুরু হয়, গ্রামের পুরুষেরা চলে গেলেন যুদ্ধক্ষেত্রে। গ্রামে জোরপূর্বক আনা হলো রুশ যুদ্ধবন্দীদের। এঁরাই হয়ে উঠলেন নারীদের নতুন সঙ্গী। সম্পর্ক, প্রেম আর স্বাধীনতার স্বাদ পেলেন তাঁরা।
কিন্তু যুদ্ধ শেষে স্বামীরা ফিরে এলেন। আবারও হারিয়ে গেল নারীদের স্বাধীনতা। ক্ষোভ জমতে থাকল। অনেকেই মুক্তির পথ খুঁজলেন ফাজেকাশের আর্সেনিকের মাধ্যমে।
আদালতে নারীদের মুখোমুখি বিচার
১৯২৯ সালে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসতেই সারা হাঙ্গেরি স্তব্ধ হয়ে যায়। আদালতে হাজির হন ২৬ নারী। তাঁদের মধ্যে আটজনকে মৃত্যুদণ্ড, সাতজনকে যাবজ্জীবন দেওয়া হয়। তবে বেশিরভাগই অভিযোগ অস্বীকার করেন।
পুলিশ যখন ফাজেকাশকে গ্রেপ্তার করতে যায়, তিনি বুঝতে পারেন শেষ ঘনিয়ে এসেছে। নিজের কাছে রাখা বিষ পান করে সেখানেই আত্মহত্যা করেন।
অপরাধ না প্রতিশোধ?
ইতিহাসবিদেরা এখনো বিতর্কে দ্বিধান্বিত। এটি কি শুধুই অপরাধ, নাকি বহু বছরের নিপীড়নের বিরুদ্ধে নারীদের প্রতিশোধ?
- কেউ বলেন, দারিদ্র্য, একঘেয়েমি আর নির্যাতন তাঁদের বাধ্য করেছিল।
- আবার কেউ মনে করেন, যুদ্ধ-পরবর্তী হঠাৎ স্বাধীনতা হারানোই প্রধান কারণ।
যে-ই হোক, নাগিরেভের নারীরা ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছেন ভয়ঙ্কর এক অধ্যায় হিসেবে।
ভয়ের উত্তরাধিকার ও বর্তমান নাগিরেভ
অনুমান করা হয়, প্রকৃত মৃতের সংখ্যা তিন শতাধিক। পাশের টিজাকুর্ট শহর থেকেও কবর খুঁড়ে আর্সেনিকের প্রমাণ মেলে।
তবে আজ নাগিরেভে গেলে সেই ভয় আর দেখা যায় না। গ্রামের জীবন চলে স্বাভাবিক ছন্দে। স্থানীয়রা বললেও, ইতিহাসবিদদের কাছে এ এলাকা এখনো ইউরোপের এক ‘কালো স্মৃতি’।
একজন প্রত্যক্ষদর্শীর মেয়ে, মারিয়া গুনিয়া পরে বলেছিলেন—
“ঘটনার পর স্বামীদের স্ত্রীদের প্রতি আচরণে বিস্ময়কর উন্নতি হয়েছিল।”








