ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিতে আমেরিকার আপত্তি কেন?
আবু হুরাইরাহ
নতুন পয়গাম:
ইসরাইল ও ফিলিস্তিন দ্বন্দ্ব-সংঘাত বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ ও সবচেয়ে সহিংস। এর সূত্রপাত একশ বছরেরও বেশি আগে। দীর্ঘ এই সময়ে ইসরাইল ও মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে কয়েক দফা যুদ্ধ বেধেছে। হয়েছে ফিলিস্তিনিদের ইসরাইলবিরোধী অভ্যুত্থান ‘ইন্তিফাদা’, হয়েছে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে পাল্টা ইসরায়েলি প্রতিশোধ ও দমনাভিযান। ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্র গঠন ও স্বাধীনতার অধিকার নিয়ে ঐতিহাসিক এই বিবাদেরই পরিণতি গাজায় চলা যুদ্ধ।
ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার স্বপ্ন বহু দশক ধরে আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়াও চলছে বহু দশক ধরে। ১৯৪৫ সালের পর রাষ্ট্রসংঘের ১৫১টি সদস্য দেশে ফিলিস্তিনকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি বা মর্যাদা দিয়েছে। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখনো দেয়নি। তার এই অবস্থান শুধু ইসরাইল–ফিলিস্তিন সম্পর্ককেই নয়, গোটা মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তৃত ভূ-রাজনীতি, আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
আমেরিকার অবস্থান মূলত ‘দুই রাষ্ট্র সমাধান’ নীতির ওপর নির্ভরশীল। এর অর্থ হল, ফিলিস্তিনি ও ইসরাইলি পক্ষের মধ্যে সরাসরি আলোচনা ও চুক্তির মাধ্যমে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। কিন্তু ফিলিস্তিনিদের ন্যায্য দাবির পক্ষে পদক্ষেপ না করা, সঙ্গে ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরাইলকে সব দিক থেকে সমর্থন, সহায়তা ও মদদ দেওয়া মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রতিবন্ধক।
ওয়াশিংটনের এই পক্ষপাতদুষ্ট অবস্থান বিভাজন বাড়িয়েছে, শান্তি প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করেছে এবং ফিলিস্তিনিদের আন্তর্জাতিক মর্যাদা সীমিত করেছে। বিপরীতে, ইসরাইলকে রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে শক্তিশালী, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একগুঁয়ে ও বেপরোয়া রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
২০১২ সালে রাষ্ট্রসংঘের অধিবেশনে ফিলিস্তিনকে ‘সদস্য বহির্ভূত পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র’ করা হয়। ২০১৫ সালের মধ্যে ১৩৮টি দেশ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়। তারপর থেকে গত এক দশকে আরো কয়েকটি দেশ স্বীকৃতি দেয়। রবিবার ব্রিটেন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও পরদিন পর্তুগাল মিলিয়ে মোট ১৫১ দেশ স্বীকৃতি দিল। কিন্তু তবুও ফিলিস্তিন স্বাধীন রাষ্ট্র হয়নি। ২০২৪ সালের এপ্রিলে ফিলিস্তিনের পূর্ণ সদস্যপদ অর্জনের প্রস্তাব নিরাপত্তা পরিষদে উত্থাপন করা হয়, কিন্তু আমেরিকা তা ভেটো দিয়ে থামায়। পরের মাসেই সাধারণ অধিবেশনে এক প্রস্তাব পাস হয়, যা ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্রসংঘের পূর্ণ সদস্য হওয়ার যোগ্য হিসেবে নিরাপত্তা পরিষদকে পুনর্বিবেচনা করতে বলে।
আমেরিকা সব সময় বলে এসেছে, ফিলিস্তিনের স্বীকৃতি সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে হতে হবে, একতরফা বা আন্তর্জাতিক চাপের মাধ্যমে নয়। ১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা, ১৯৬৭ সালে ছয় দিনের যুদ্ধ ও ১৯৯৩ সালের অসলো শান্তিচুক্তি — সব মিলিয়ে ‘দুই রাষ্ট্র সমাধানের’ রূপরেখা তৈরি হয়েছে। কিন্তু তবুও আমেরিকাই তাদের মস্তিষ্কপ্রসূত এই নীতিকে বাস্তবায়িত হতে দিচ্ছে না। এই নিয়ে রাষ্ট্রসংঘের ৬ বার ভেটো দিল তারা।
আমেরিকার ফিলিস্তিন-নীতি প্রায়ই তার ইসরাইলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কৌশলগত সম্পর্ক দিয়ে প্রভাবিত। ১৯৪৮ সাল থেকে ইসরাইল প্রতিষ্ঠার পর মার্কিন সেনা সাহায্য, উন্নত অস্ত্র সরবরাহ, গোয়েন্দা তথ্য ও কূটনৈতিক সমর্থন দিয়ে এসেছে দেশটিকে। শুধু মার্কিন অস্ত্র নয়; ইসরাইলকে সাইবার নিরাপত্তা, গোয়েন্দা সহযোগিতা, সামরিক প্রশিক্ষণ সবকিছু দিয়ে চলেছে আমেরিকা। আমেরিকা যাতে সবসময় ইসরাইলের পাশে থাকে, সে জন্য মার্কিন মুলুকে অতি সক্রিয় ভূমিকা নেয় ইহুদি যায়নবাদী লবি। এদের নাম ‘আইপ্যাক’। এদের লম্বা হাত হোয়াইট হাউস থেকে ওভাল অফিস পর্যন্ত। এই ইহুদি লবিই আমেরিকার বিদেশনীতি এবং বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক নীতিমালা তৈরিতে প্রধান ভূমিকা রাখে।
ফিলিস্তিন যাতে কখনো ঐক্যবদ্ধ হয়েে স্বাধীন রাষ্ট্র হতে না পারে, সেজন্য এই ইহুদি লবি ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক বা পশ্চিম তীরে ফাতাহ এবং গাজা উপত্যকায় হামাসকে বিভক্ত করে রেখেছে। হামাস ও ফাতাহের মধ্যে দ্বন্দ্ব বা বিভাজন ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার পথে আরেক অন্তরায়। হামাসকে আমেরিকা, ইউরোপ এবং ইসরাইল সন্ত্রাসী তকমা দিয়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রেখেছে। নরমপন্থী ফাতাহকে পশ্চিমারা এতটা খারাপ নজরে দেখে না। তাই ফাতাহ সরকার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত পশ্চিম তীরে তারা সচরাচর হামলা করে না। যা কিছু হামলা, আক্রমণ, আগ্রাসন সবই হয় মূলত হামাস প্রভাবিত গাজায়।
আন্তর্জাতিক বিচার আদালত আইসিজে-র ২০২৪-এর পরামর্শমূলক রায় হল, ১৯৬৭ সাল থেকে ইসরাইলের ফিলিস্তিনি অঞ্চল (গাজা, পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম) দখল করা অবৈধ। ইসরাইলকে এসব দখলীকৃত এলাকা ছাড়তে হবে। দখল করা স্থানে ইহুদি বসতি নির্মাণ, এর সম্প্রসারণ ও শিক্ষানীতি বৈধ নয়। এদিকে ২০১৫ সালে ‘রোম সনদ’-এ সই করেছে ফিলিস্তিন। এটি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত আইসিসি-কে গাজা ও পশ্চিম তীরে ইসরাইলি যুদ্ধাপরাধ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্তের এখতিয়ার দিয়েছে। এসব আইনি ভিত্তি শক্তিশালী হলেও ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাধা এবং মূলত আমেরিকার সদিচ্ছার অভাব স্পষ্ট।
ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি শুধু মার্কিন বিদেশনীতি নয়, অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টি এই স্বীকৃতির বিরুদ্ধে। আবার ডেমোক্র্যাট পার্টিও প্রায় একই নীতি নিয়ে চলে। তবে তাদের মধ্যে প্রগতিশীলেরা স্বীকৃতির পক্ষে। কিন্তু ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতৃত্ব এ ব্যাপারে সতর্ক।
অন্যদিকে মিসর, জর্ডান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে আমেরিকার ঘনিষ্ঠতা মধ্যপ্রাচ্যের নীতি নির্ধারণে প্রভাব ফেলে। অনেক মুসলিম দেশ ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার পক্ষে হলেও নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও অর্থনীতিকে অগ্রাধিকার দেয় তারা। স্বভাবতই তারা নিজেদের স্বার্থে আমেরিকা ইসরাইলের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে পারে না। মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর এই সুবিধাবাদী নীতিকে কাজে লাগাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। মুসলিম দেশগুলো ইসরাইলের সঙ্গে চুক্তি করলেও ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার ব্যাপারে অতটা মাথা ঘামায় না।
এদিকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ফিলিস্তিনের পক্ষে আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থন অনেক বেশি। কিন্তু আমেরিকার রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অবস্থান, ইসরাইলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা, ফিলিস্তিনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, হামাস-ফাতাহ বিভাজন, এবং মধ্যপ্রাচ্যের জটিল ভূ-রাজনীতি এবং সর্বোপরি মুসলিম বিশ্বের সুবিধাবাদী নীতি সম্মিলিতভাবে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার পথে বাধা সৃষ্টি করছে। এইসব ফ্যাক্টরকে সামনে রেখেই নেতানিয়াহু বলছেন, ইউরোপের দেশগুলো যতই স্বীকৃতি দিক, ফিলিস্তিনকে তারা কখনোই স্বাধীন রাষ্ট্র হতে দেবে না। যারা স্বীকৃতি দিচ্ছে, তারাও নেহাৎ চক্ষুলজ্জা বা মুখরক্ষার জন্য এটা করছে। এরাই আবার ইসরাইলকে অর্থ ও অস্ত্র সহযোগিতা দিয়ে চলেছে। শান্তির পূজারী সাজলেও এরা আসলে যুদ্ধ ব্যাপারী।








