পশ্চিমারা কি মুখ রক্ষা করতে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিচ্ছেন
নতুন পয়গাম, বিশেষ প্রতিবেদন:
নতুন পয়গাম: ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে কানাডা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও পর্তুগাল। গাজায় ইসরাইলি যুদ্ধ ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে দখলদারির বিরুদ্ধে প্রতীকী প্রতিক্রিয়া হিসেবে রবিবার ইউরোপের ৪ দেশ এই স্বীকৃতি দেয়। চলতি সপ্তাহেই ফ্রান্স-সহ আরো কয়েবকটি দেশ স্বীকৃতি দেবে। ইসরাইল এই স্বীকৃতির তীব্র নিন্দা করে বলেছে, এই স্বীকৃতি হাস্যকর। এটি সন্ত্রাসবাদকে উৎসাহিত করবে। গত ১৫ সেপ্টেম্বর অধিকৃত পশ্চিম তীরে গিয়ে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু দম্ভভরে বলেন, ফিলিস্তিন নামে কোনো রাষ্ট্র হবে না। আমরা কখনোই এটা হতে দেব না। কারণ, ফিলিস্তিন স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হলে, তা হবে ইসরাইলের অস্তিত্বের জন্য হুমকি ও চ্যালেঞ্জ।
ইসরাইলি আগ্রাসনে চরম দুর্দশায় জীবন কাটছে ফিলিস্তিনিদের। এই স্বীকৃতি কি তাঁদের দুর্দশা লাঘব করবে বা অবসান ঘটাবে? আদৌ কোনো বাস্তবসম্মত পরিবর্তন কি আসবে? বিশ্লেষকেরা আশাবাদী হলেও সংশয়ে রয়েছেন। কারণ, মধ্যপ্রাচ্যের অবৈধ দেশ ইসরাইল কারো তোয়াক্কা করে না। ইউনিসেফ থেকে আন্তর্জাতিক আদালত কেউ ইসরাইলের বিরুদ্ধে কিছু বললেই, আমেরিকা সেই সংস্থার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে বা বয়কট করে। এদিকে ইসরাইল সরকার হুমকি দিয়েছে, তারা পুরো গাজা অঞ্চল দখল করে নিজেদের দেশের সঙ্গে যুক্ত করে নেবে। ট্রাম্পও সম্প্রতি একই কথা বলেছিলেন। পানামা, গ্রীনল্যান্ডের পাশাপাশি গাজা উপত্যকাকেও গায়ের জোরে দখল করে নেওয়ার হুমকি দেন।
মাঝেমধ্যেই দেখা যাচ্ছে, কিছু দেশ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিচ্ছে। এ পর্যন্ত ১৫১টা দেশ এটা করেছে। এর খুব বেশি প্রভাব বা গুরুত্ব না থাকলেও, নিঃসন্দেহে আন্তর্জাতিক মহলে একটা পরোক্ষ চাপ বাড়াচ্ছে। কিন্তু ওইসব দেশগুলো শুধুমাত্র মৌখিক বা আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না দিয়ে বরং পাশাপাশি ইসরাইলকে বয়কট বা নিষেধাজ্ঞা, অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করা, অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে নো-ফ্লাই জোন বাস্তবায়নের মতো কার্যকর পদক্ষেপ না করা পর্যন্ত কাজের কাজ কিছুই হবে না। সুতরাং বলাবাহুল্য, পশ্চিমারা কেবলমাত্র মুখ রক্ষার খাতিরে মাঝে মাঝে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়ে চলেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি মূলত লোকদেখানো স্বীকৃতি। তারা আন্তর্জাতিক স্তরে ক্রমবর্ধমান চাপ এবং নিজ নিজ দেশবাসীর চাপের মুখে এই পদক্ষেপ করছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। তবুও এই স্বীকৃতি গুরুত্বপূর্ণ। এর ফলে ফিলিস্তিন সরকার ওইসব দেশগুলোর সঙ্গে চুক্তি করতে পারবে এবং রাষ্ট্রদূত নিযুক্ত করতে পারবে। এরই মধ্যে ব্রিটেন ঘোষণা করেছে, তারা হুসাম জোমলটকে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রদূত হিসেবে স্বীকৃতি দেবে।
উল্লেখ্য, বিশ্বের বড় একটি অংশ ইতিমধ্যেই ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। সম্প্রতি আরও কিছু স্বীকৃতি যোগ হয়েছে। কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, হাতেগোনা কিছু ইউরোপীয় ও বাল্টিক দেশ, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান-সহ কয়েকটি দেশ এখনো ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়নি।
অবশ্য বেশিরভাগ দেশের স্বীকৃতি পেলেও রাষ্ট্রসংঘের সদস্য হতে পারেনি ফিলিস্তিন। মার্কিন সহায়তা ছাড়া এসব স্বীকৃতির বলে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রসংঘের কোনো সুযোগ-সুবিধা পাবে না। নতুন করে কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার সদস্যও হতে পারবে না। ফিলিস্তিন বর্তমানে রাষ্ট্রসংঘের সদস্য নয়, তারা পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র মাত্র। পূর্ণ সদস্য হতে হলে নিরাপত্তা পরিষদের সুপারিশ পেতে হবে এবং রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ অধিবেশনে দুই-তৃতীয়াংশ ভোট পেতে হবে। কিন্তু সবকিছু হলেও শেষমেষ আমেরিকা ভেটো দিলে সব পণ্ড হয়ে যাবে। এটাই হচ্ছে যুগ যুগ ধরে। মার্কিন ভেটোর কারণে বারে বারে প্রস্তাব পাস হলেও কার্যকর হচ্ছে না।
অন্যদিকে গাজায় যুদ্ধ বন্ধ করতে ইসরাইলের ওপর ঘরে-বাইরে চাপ বাড়ছে। বিশেষ করে ইউরোপ থেকে চাপ জোরালো হচ্ছে। গতিশীল হচ্ছে ইসরাইলকে বর্জন বা বয়কটের প্রচারও। ফলে ইউরোভিশন ও আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতাগুলো থেকে ইসরাইলকে বাদ দেওয়া হতে পারে। পাশাপাশি, ইউরোপীয় ইউনিয়ন সম্প্রতি কিছু ইসরাইলি পণ্যের ওপর শুল্ক বৃদ্ধি এবং দেশটির কয়েকজন নেতা-মন্ত্রীর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়েও আলোচনা করেছে। আন্তর্জাতিক আদালত কয়েকমাস আসে পরোয়ানা জারি করেছে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী, ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীর নামে। তাদের অর্থমন্ত্রী ইউরোপীয় নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়েছে।
বিশ্লেষকেরা বলেছেন, কয়েক মাস ধরে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার ব্যাপারে আলোচনা করলেও কিছু পশ্চিমা দেশ মূলত গাজায় ইসরাইলি আগ্রাসনের প্রতিক্রিয়ায় এই পদক্ষেপ নিয়েছে। একদিকে প্রতিষ্ঠিত রাজনীতিক দলগুলোর সঙ্গে জড়িত ইসরাইলি লবি বা গোষ্ঠীগুলোর চাপ, অন্যদিকে জাতিগত গণহত্যা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে জনগণের ক্রমবর্ধমান দাবি, দেশের ভেতরে এমন নানামুখী চাপের কারণেই ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়েছে কয়েকটি দেশ। ইউরোপের উদার-বামপন্থী সরকারগুলোর ওপর ক্রমবর্ধমান চাপের কারণে এই স্বীকৃতি। আসলে কিছুই বদলায়নি। ধীরে ধীরে মানুষের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে জনগণকে খুশি রাখতে এটি হল কম ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ। তাঁরা আসলে নিজেদের মুখ বাঁচাতে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
গত জুলাইয়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেছিলেন, গাজায় যুদ্ধ বন্ধে ইসরাইল কার্যকর পদক্ষেপ না করলে তিনি ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেবেন। শেষমেষ ২১ সেপ্টেম্বর তিনি স্বীকৃতি দিলেন। এই পথেই হাঁটল কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং পরদিন পর্তুগাল।
এদিকে শিগগিরই ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেবে বলে জানিয়েছে ইউরোপের প্রভাবশালী দেশ ফ্রান্স। এটি হলে রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য দেশের মধ্যে চারটিরই স্বীকৃতি পাবে ফিলিস্তিন। তথ্য বলছে, রাষ্ট্রসংঘের ১৯৩টি সদস্য দেশের প্রায় ৭৫ শতাংশের স্বীকৃতি পেয়েছে ফিলিস্তিন। এখন প্রশ্ন হলো, এ স্বীকৃতির অর্থ কী বা এটি কি বাস্তবে ফিলিস্তিনের জনগণের জন্য কোনো পরিবর্তন আসবে?
ফিলিস্তিন এমন একটি রাষ্ট্র, যার অস্তিত্ব আছে বাস্তবের মাটিতে। কিন্তু বিশ্বের দরবারে খাতায় কলমে কিছু নেই। বিভিন্ন দেশে ফিলিস্তিনের কূটনৈতিক মিশন আছে। কিন্তু আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ফিলিস্তিনের সীমানা, রাজধানী বা সেনাবাহিনী কিছুই নেই। অলিম্পিকের মতো ক্রীড়া প্রতিযোগিতায়ও অংশ নেয় ফিলিস্তিন। রাষ্ট্রসংঘের স্থায়ী সদস্য না হলেও পর্যবেক্ষক সদস্য দেশ।
১৯১৭ সালে বেলফোর ঘোষণায় ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইহুদিদের জন্য আবাসভূমি গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু সেই ঘোষণায় এই প্রতিশ্রুতিও ছিল যে, ইহুদি বাদে এই ভূখণ্ডে অন্য সম্প্রদায়ের যেসব লোকজন বসবাস করেন, তাঁদের মৌলিক, নাগরিক ও ধর্মীয় অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এমন কিছু করা হবে না। যদিও ইসরাইল বলে, বেলফোর ঘোষণায় ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিয়ে কিছু বলা হয়নি। এমন জটিলতার মধ্যে ফিলিস্তিনিদের সমস্যার সমাধান আজো হয়নি। ৭৭ বছর আগে ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইল রাষ্ট্র গড়ে উঠলেও ফিলিস্তিনকে আদো স্বাধীন রাষ্ট্র করা হয়নি। দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের প্রস্তাব অনুযায়ী ১৯৬৭ সালে আরব-ইসরাইল যুদ্ধের আগে পশ্চিম তীর ও গাজার যে সীমানা ছিল, তা নিয়ে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা ছিল। যার রাজধানী হওয়ার কথা ছিল পূর্ব জেরুজালেম।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইসরাইল রাষ্ট্র গঠনে মুখ্য ভূমিকা ছিল ব্রিটেনের। কারণ, তখন ফিলিস্তিন ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে। তাই ব্রিটেনের এই স্বীকৃতির অবশ্যই তাৎপর্য ও গুরুত্ব রয়েছে। পাশাপাশি এবার যদি ফ্রান্সও ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়, তাহলে নিরাপত্তা পরিষদে ফিলিস্তিনের অবস্থান আরও মজবুত হবে। এর আগে ১৯৮৮ সালে অন্য দুই স্থায়ী সদস্য রাশিয়া ও চীন এই স্বীকৃতি দিয়েছিল। ফলে স্থায়ী পাঁচ সদস্যের মধ্যে একমাত্র আমেরিকাই হবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি না দেওয়া দেশ।








