চলে গেলেন সমাজসেবী আফতাব উদ্দিন সরকার
নতুন পয়গাম, কলকাতা, ১৬ সেপ্টেম্বর:
না ফেরার দেশে চলে গেলেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও সমাজসেবী আফতাব উদ্দিন সরকার। সোমবার ১৫ সেপ্টেম্বর রাত ৯.৩০ নাগাদ তাঁর ইন্তেকাল হয়। জন্মসূত্রে তিনি এক সাধারণ পরিবারের সন্তান ছিলেন। কিন্তু কৈশোর থেকে যুবাকাল পর্যন্ত নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েও নিজ যোগ্যতা বলে ডাক্তারি নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন। কিন্তু মেডিক্যালে ফাইনাল ইয়ারে পৌঁছানোর আগেই ডাক্তার হওয়ার স্বপ্নকে জলাঞ্জলি দিয়ে সংসারের হাল ধরতে মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভের চাকরিতে যুক্ত হতে বাধ্য হন। অত্যন্ত যোগ্যতা এবং সুনামের সঙ্গে সেই চাকরির পাশাপাশি ছোট ব্যবসাও শুরু করেন। কয়েক বছরের মধ্যে তিনি একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। ফলত কলকাতা শহরের একজন কৃতি উদ্যোপতি হিসেবে নিজেকে প্রতিপন্ন করতে সক্ষম হন আফতাব উদ্দিন সরকার।
জন্মালে মানুষের একদিন মৃত্যু অবধারিত। পৃথিবীতে জন্ম মৃত্যুর ধারাবাহিকতা অব্যাহত। তথাপি কোটি কোটি মানুষের মধ্যে কিছু কিছু মানুষ তাঁদের কর্মের মানুষের মাঝে বেঁচে থাকেন। আর সেইসব মানুষের মধ্যে কারো মৃত্যু সংবাদ পেলে মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে যায়। তেমনই একজন গুণী, সমাজ সচেতক, সমাজহিতৈষী মানুষ ছিলেন তিনি। লোক মুখে জানা যায়, তিনি অত্যন্ত সৎ পন্থায় হালাল পথে উপার্জন করতেন। ক্রমান্বয়ে তিনি আর্থিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও কখনোই অর্থের অহঙ্কার তাঁকে ছুঁতে পারেনি। কিন্তু সর্বদা তাঁকে আর্থিকভাবে দুর্বল মানুষদের কথা ভাবাত। তাই তাঁর উপার্জনের একটা বড় অংশ গরিব-দুস্থ ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনায় এবং বিভিন্নভাবে সাহায্য করতেন নিয়মিত। অনেকের পড়াশোনার খরচও বহন করতেন। এভাবে চলতে চলতেই তাঁর মাথায় আসে গরিব ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনার জন্য স্কুল, কলেজ তৈরি করার। ইতিমধ্যে তিনি তাঁর জন্মস্থান হুগলীর চাঁপাডাঙ্গা সংলগ্ন বালিপুর গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেছেন স্কুল। এই স্কুলের পাশাপাশি উচ্চমানের শিক্ষার জন্য একটি মিশনও প্রতিষ্ঠা করেছেন। পিতা-মাতার নামে একটি মাদ্রাসাও প্রতিষ্ঠা করেছেন। উল্লিখিত প্রতিষ্ঠানগুলোর যাবতীয় খরচ তিনি নিজে বহন করতেন।
এমন একজন সমাজ দরদী মানুষের সাহিত্যের প্রতি ছিল গভীর অনুরাগ, একথা শুনলে যে কেউই অবাক হবেন। তিনি মৃত্যুর কিছুদিন আগে পর্যন্ত নিয়মিত কবিতা, প্রবন্ধ, নিবন্ধ লিখে গেছেন। কলকাতার পার্কসার্কাসে থাকতেন তিনি। বেশিরভাগ কবিতা লিখে রাখতেন ক্যালেন্ডারের পাতায়, কখনো-বা ডাইরির পাতায়। বাড়িতে কোন অতিথি গেলে সেসব কবিতা পাঠ করে শোনাতেন তিনি। সেসব কবিতা একত্র করে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘আবেগের বর্ণমালা’। এই কাব্যগ্রন্থের মুখবন্ধ লেখেন কবি ও লেখক সেখ আব্দুল মান্নান। পরবর্তীতে সাংবাদিক ইবাদুল ইসলাম প্রতিষ্ঠিত ‘বাংলার জনরব’ সংবাদপত্র সম্পাদনার দায়িত্বও বেশ কিছুদিন পালন করেছিলেন আফতাব উদ্দিন সরকার।
তিনি অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ মানুষ ছিলেন। নিজ ধর্ম ইসলামকে আত্মস্থ করে ধর্ম বিষয়ক কয়েকটি ছোট ছোট গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তার মধ্যে উল্ল্যেখযোগ্য ‘মানব কল্যাণে ধর্মজ্ঞান ও নামাযের শিক্ষা’। অনেক ত্যাগ তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে নিজেকে একজন সার্থক মানুষ রূপে প্রতিপন্ন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। আনুমানিক ৯৩-৯৪ বছর বয়স তাঁর জন্য সংখ্যা ছিল মাত্র। বয়সের ভার কখনোই তাঁকে কাবু করতে পারেনি।








