নেপালে কেমন আছে মুসলমানরা
নতুন পয়গাম, কাঠমান্ডু, ১১ সেপ্টেম্বর:
নেপালে হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের পর তৃতীয় বৃহত্তম ধর্ম হল ইসলাম। নেপালের অধিকাংশ মুসলিম তরাই অঞ্চলে বসবাস করে। এছাড়া কিছু মুসলিম রাজধানী কাঠমান্ডু এবং গোর্খা শহরেও দেখা যায়।
নেপালে মুসলিমদের আগমন ঘটেছিল বিভিন্ন সময়ে। মূলত বাংলাদেশি, পাকিস্তানি এবং ভারতীয় মুসলিমদের মাধ্যমে, যারা বিভিন্ন সময়ে সেখানে বসতি স্থাপন করেছিল। কাশ্মীরিরা ছিলেন নেপালে প্রথম আগত মুসলিম। ছোট্ট দেশ নেপালে প্রায় ৪৩০টি মসজিদ রয়েছে, যার মধ্যে কেন্দ্রীয় মসজিদ রাজধানী কাঠমান্ডু শহরে রত্নাপার্ক এলাকায় অবস্থিত। মসজিদটি নেপালের রাজ প্রাসাদের উত্তর-পশ্চিম দিকে এবং নেপালের সবচেয়ে বড় জনসভার মাঠের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থিত। প্রতি শুক্রবার মুসল্লিদের সমাগমে জুমআর নামায আদায়ে মসজিদ ও মসজিদ সংলগ্ন মাদ্রাসার বারান্দা ভরে যায়। মসজিদে দুটি সুউচ্চ মিনার রয়েছে। মসজিদের পশ্চিম দিক দিয়ে রয়েছে নেপালের রাজপ্রাসাদের যাওয়ার প্রধান সড়ক। অবস্থানগত দিক থেকে নেপালের এই মসজিদ ইসলাম ও মুসলমানদের ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক।
মুসলমানরা দীর্ঘ সময় ধরে নেপালে বসবাস করেছে। ঐতিহাসিকদের মতে, ১৫ শতকের শেষ দিকে রাজা রত্ন মল্লের শাসনামলে প্রথম মুসলমানরা কাঠমান্ডুতে বসতি স্থাপন করে। এই মুসলমানরা ছিল মূলত কাশ্মীরি বণিক, যাদেরকে রাজা রত্ন মাল্লা কাঠমান্ডুতে বসতি স্থাপনের অনুমতি দিয়েছিলেন।
পশ্চিম নেপালের চৌবিসে রাজারাও আফগান ও ভারতীয় মুসলমানদের নিয়ে গঠিত নেপালি রেজিমেন্ট সৈন্যদের আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য নিয়োগ করেছিল। লাসায় রত্ন মল্লের দূত কাশ্মীরি মুসলমানদের কাশ্মীর, লাদাখ ও লাসার মধ্যে যে বিছানা, কার্পেট, শাল ও পশমী জিনিসপত্র ব্যবসা করত, তা থেকে লাভের জন্য কাঠমান্ডুতে আমন্ত্রণ জানান। মুসলমানদের প্রথম আগমন এক কাশ্মীরি মুসলিম পণ্ডিতের সঙ্গে এসেছিল, যিনি ১৫২৪ সালে প্রথম মসজিদ ‘কাশ্মীরি তাকিয়া’ নির্মাণ করেছিলেন, শামীমা সিদ্দিকা তার ‘নেপালের মুসলিম’ বইতে লিখেছেন।
২০১৮ সালের এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, নেপালে মুসলমানদের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। নেপালের ইসলামিক সোসাইটির প্রধান খুরশিদ আলমকে উদ্ধৃত করে এক তুর্কি ভাষার দৈনিক সংবাদপত্র জানায়, গত ১৫ বছরে প্রায় এক লাখ নেপালি ইসলাম কবুল করেছেন। নেপালের কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রকাশিত ২০২১ সালের সেন্সাস রিপোর্টে বলা হয়, নেপালে ৮১.১৯ শতাংশ হিন্দু। তাদের সংখ্যা ২ কোটি ৩৬ লক্ষ ৭৭ হাজার ৭৪৪। এখন চার বছর পর সেই সংখ্যা নিশ্চিত অনেকখানি বেড়েছে। নেপালে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী মানুষের সংখ্যা ২৩ লক্ষ ৯৪ হাজার ৫৪৯ বা ৮.২ শতাংশ। সেন্সাস রিপোর্ট মোতাবেক, গত এক-দেড় দশকে হিন্দু ও বৌদ্ধ জনসংখ্যা কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। অন্যদিকে মুসলিম, খ্রিস্টান এবং কিরাতদের সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে।
২০২১ সালের সর্বশেষ সেন্সাস অনুসারে নেপালে প্রায় ১৪ লক্ষ ৮৩ হাজার মুসলিম রয়েছে, যা দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬ শতাংশ। ২০১১ সালের আদমশুমারির সময় দেশটিতে ৮১.৩ শতাংশ হিন্দু, ৯ শতাংশ বৌদ্ধ, ৪.৪ শতাংশ মুসলিম, ৩.১ শতাংশ কিরাতি এবং ০.১ শতাংশ খ্রিস্টান ছিল। ২০১১ সালের সেন্সাস অনুযায়ী, চতুর্থ বৃহত্তম স্বদেশি কিরাত ধর্ম, তারা জনসংখ্যার ৩.১৭ শতাংশ। আর পঞ্চম বৃহত্তম হল খ্রিস্টধর্ম। তাদের সংখ্যা ৫ লক্ষ ১২ হাজার ৩১৩ জন, যা জনসংখ্যার ১.৭৬ শতাংশ। নেপালে প্রায় ১২ শতাংশ মানুষ ভোজপুরি ভাষায় কথা বলে। এরা মূলত বিহার ও উত্তর প্রদেশ থেকে আসা। নেপালে মোট ১২৪টি ভাষার প্রচলন রয়েছে, যার মধ্যে নেপালি ভাষায় সবথেকে বেশি ৪৫ শতাংশ মানুষ কথা বলে। তারপরে মৈথিলি ১১.০৫ শতাংশ, এবং ভোজপুরিতে ৬.২৪ শতাংশ, থারু ভাষায় ৫.৮৮ শতাংশ এবং তামাং ভাষায় ৪.৮৮ শতাংশ মানুষ কথা বলেন।








