অখ্যাত গ্রামের বিখ্যাত লেখক হাদীউজ্জামান লিখেছেন ৫০-এরও বেশি বই, অপ্রকাশিত ৩০টি বই
নতুন পয়গাম, ২৩ আগস্ট: লেখক মোহাম্মদ হাদীউজ্জামান-এর জন্ম ১৯৭৪ সালে, পশ্চিমবঙ্গের এক পিছিয়ে থাকা গ্রামে। সাহিত্য-চর্চা শুরু হয় মাত্র ১৪ বছর বয়সে, একটি ইসলামী কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে। ২০০২ সালে তাঁর পবিত্র কুরআনের বাংলা অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা গ্রন্থ প্রকাশিত হয় কলকাতার সুপরিচিত প্রকাশক ‘মল্লিক ব্রাদার্স’ থেকে। তিনি মনে করেন, কুরআনের শিক্ষা সর্বজনীন এবং প্রত্যেক মানুষের কাছে তা পৌঁছে দেওয়া এক অন্যতম দায়িত্ব। তাই তিনি সহজ-সরল ভাষায় কুরআনের বার্তা সাধারণ পাঠকের জন্য উপস্থাপন করার চেষ্টা করেন। এই অনুবাদের প্রতিটি বাক্যে তাঁর আধ্যাত্মিক অনুধাবন ও চিন্তাশীলতা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়।
মোহাম্মদ হাদীউজ্জামান একজন চিন্তাবিদ, লেখক ও গবেষক, যিনি বাংলা ভাষায় ইসলামী সাহিত্যচর্চায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন। যুক্তিবাদ, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং সমাজ বিশ্লেষণের সংমিশ্রণে তাঁর সাহিত্য কর্মসমূহ পাঠকদের মাঝে গভীর প্রভাব সৃষ্টি করেছে। তাঁর লেখনীতে একদিকে যেমন ইসলামের মূল শিক্ষা ও মৌলিক নীতিমালা প্রতিফলিত হয়, অন্যদিকে থাকে সময়োপযোগী দৃষ্টিভঙ্গি ও বাস্তব জীবনের প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যা।
তাঁর লেখা গ্রন্থসমূহ শুধু ধর্মীয় জ্ঞানের আধার নয়; বরং মানবিক বোধ, যুক্তির আলো ও প্রেরণার এক অনন্য উৎস। তাঁর বই ‘নলেজ ক্যুইজ অব ইসলাম’ ১৯৯২ সালে বাংলা ভাষায় ইসলামী কুইজ সাহিত্যধারা সূচনার এক যুগান্তকারী প্রয়াস, যা একাধারে শিক্ষামূলক, বিনোদনধর্মী এবং চেতনা জাগানিয়া। বইটি বিভিন্ন ইসলামী বিষয়ের ওপর প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে শিশু-কিশোর ও তরুণদের মাঝে ইসলামী জ্ঞান বিস্তারে অসামান্য ভূমিকা রাখে।
১৯৯৫ সালে প্রকাশিত ‘সাগর সেচা মানিক’ গ্রন্থটিতে বিশ্বখ্যাত মুসলিম মনীষীদের বাণী সংকলিত হয়েছে। এটি কেবল বাণী-সংকলনই নয়; বরং এক একটি বাণীর পিছনে রয়েছে দার্শনিক ব্যাখ্যা ও অনুপ্রেরণামূলক দৃষ্টিভঙ্গি, যা পাঠকদের চিন্তন জগতে আলোড়ন তোলে।
২০০১ সালে প্রকাশিত ‘জ্বিন জাতির বিস্ময়কর ইতিহাস’ পাঠকের মাঝে জ্বিন সম্পর্কে পবিত্র কুরআন, হাদীস ও ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে একটি বিস্তৃত ধারণা দেয়। তাঁর আরো একটি জনপ্রিয় অনুবাদ-গ্রন্থ ‘যুক্তির বিচারে ইসলামের বিধান’ (২০০২), ইসলামের বিভিন্ন নীতিমালা এবং শরীয়াহ আইনসমূহকে যৌক্তিক ও আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিশ্লেষণ করে, যা ধর্ম ও যুক্তির এক দুর্লভ সমন্বয়।
তিনি ইসলামী সমাজচিন্তা, ঐতিহাসিক অধ্যয়ন, আত্মউন্নয়ন, শিশু-কিশোর শিক্ষাতেও রেখেছেন অসামান্য অবদান। তাঁর লেখা কিশোর ইসলামিক সিরিজের বইগুলো যেমন সরল ভাষায় রচিত, তেমনি তা জ্ঞানের ভাণ্ডার হিসেবে বিবেচিত ও সমাদৃত। এই ধারায় তিনি তৈরি করেছেন বিভিন্ন ইসলামিক কুইজ, সংক্ষিপ্ত জীবনী এবং দৈনন্দিন জীবনে ইসলামী শিক্ষা ও অনুশীলনের ওপর উপযোগী গ্রন্থ। তাঁর লিখিত ও প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৫০-এরও বেশি, এবং প্রতিটি গ্রন্থই পাঠকমহলে আদৃত। উল্লেখ্য, তাঁর অপ্রকাশিত মৌলিক বইয়ের সংখ্যা ৩০-টির বেশি। আল-কুরআনের বাংলা অনুবাদ ও বিশ্বস্ত ভাষ্য রচনা-র স্বীকৃতি হিসেবে সাপ্তাহিক নতুন গতি পত্রিকা ২০১৩ সালে তাঁকে সংবর্ধনা দেয় এবং ২০১৮ সালে দেয় মাওলানা আকরাম খাঁ স্মৃতি পুরস্কার।
তাঁর রচনাশৈলী সাবলীল, বর্ণনাভঙ্গি সহজবোধ্য এবং ভাষা প্রাঞ্জল। গভীর ও জটিল বিষয়ের ব্যাখ্যাও তিনি সহজ রূপে উপস্থাপন করেন, যা পাঠকের বোধগম্যতা ও চিন্তাশক্তিকে আরও সমৃদ্ধ করে। অসংখ্য পাঠক তাঁর লেখার মাধ্যমে ইসলামকে নতুনভাবে চিনেছেন এবং নিজেদের চিন্তার জগতে আলো এনেছেন। লেখক হিসেবে মোহাম্মদ হাদীউজ্জামান নিঃসন্দেহে বাংলা সাহিত্যে ইসলামী গদ্য লেখনীর এক দীপ্তিমান আলোকবর্তিকা। পেশায় তিনি সরকার পোষিত একটি উচ্চ মাধ্যমিক সিনিয়র মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক।








