সম্প্রীতির কারিগর চন্দ্রপ্রকাশ সরকার
সম্প্রীতির কারিগর চন্দ্রপ্রকাশ সরকার
নতুন পয়গাম, ১৯ আগস্ট: মুর্শিদাবাদ জেলার হরিহরপাড়া থানার বহড়ান গ্রামে মাটির ঘরে জন্ম তাঁর। জন্ম যদিও ভরা শ্রাবণের ‘গাজল দিনে’, কিন্তু স্কুল কর্তৃপক্ষের ভুলবশত তাঁর জন্ম-তারিখ হয়ে যায় ১৯৫৭ সালের পয়লা মার্চ, অর্থাৎ মধ্য ফাল্গুন। জন্ম সাল ঠিক আছে কিনা, তারও ঠিক-ঠিকানা নেই।
চার ভাই এবং দুই বোনের মধ্যে সবার বড় চন্দ্রপ্রকাশ সরকার। তার নাবালিকা মা কাঞ্চনবালার দেখাদেখি বালবিধবা স্নেহময়ী দিদিমাকেই জ্ঞান হওয়ার আগে পর্যন্ত ‘মা’ বলতেন। ঘর-জামাই বাবা চণ্ডীচরণ সরকার ছিলেন এলাকার প্রথম হোমিওপ্যাথ চিকিৎসক। তিনি বিশেষ বৈষয়িক মানুষ ছিলেন না। ফলে শাশুড়ির আশ্রয়-প্রশ্রয় এবং সহায়-সম্পদ পাওয়া সত্ত্বেও পরিবারকে কঠোর দারিদ্র্যের মুখোমুখি হতে হয়। বালকবেলা থেকে শুরু করে চাকুরিতে যোগ দেওয়ার আগে পর্যন্ত পারিবারিক ক্ষেত-খামারে জনমজুরের সাথে রীতিমত গায়ে-গতরে খাটতে হয়েছে চন্দ্রপ্রকাশ সরকারকে।
তাঁর শৈশব-কৈশোর কেটেছে উন্মুক্ত গ্রামীণ প্রাকৃতিক পরিবেশে ডাং-গুলি, টিপ্পি (মার্বেল), হাডুডু, নুনদাড়ি, খেটে, লাঠি ও ফুটবল ইত্যাদি খেলে। মাঠে-ঘাটে মাছ ধরা, আম-জাম-পেয়ারা তাল-কুল-করমচা গাছ থেকে পেড়ে খাওয়া এবং মধুর চাক ভাঙার নেশা ছিল প্রবল। বন্ধু ছিল রাখাল বালকেরা, যাদের মধ্যে সংখ্যায় বেশি ছিল মুসলিম ঘরের সন্তান। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রত্যন্ত গ্রামে বসবাস করলেও একাধিক শহুরে আত্মীয়ের সুবাদে মফস্বল শহরের সঙ্গেও নিবিড় পরিচয় ঘটে শৈশবেই। ১৯৯৯ সাল থেকে পুরোপুরি বহরমপুর নিবাসী হলেও গ্রামীণ জনজীবনের সঙ্গে যোগসূত্র খুব একটা ক্ষুন্ন বা বিচ্ছিন্ন হয়নি।
প্রতিবেশী গ্রামের নিশ্চিন্তপুর হাইস্কুল থেকে ১৯৭৫ সালে স্কুল ফাইনাল পাশ করেন চন্দ্রপ্রকাশ সরকার। ১৯৮০ সালে স্নাতক হন কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে। ২০১৭ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন বিভাগের একজন আধিকারিক হিসেবে পেশাগত জীবন থেকে অবসর নেন।
স্কুল জীবন থেকেই যাত্রা, নাটক, থিয়েটার এবং নানাবিধ সামাজিক কাজকর্মের শুরু। যৌবনকালে অধুনালুপ্ত মিঁয়ারবাগান প্রোগ্রেসিভ কালচারাল অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ, শরৎচন্দ্র, কাজী নজরুল ইসলাম প্রমুখ মনীষীদের জন্মজয়ন্তী উদযাপনের পাশাপাশি এইসব বরেণ্য মানুষদের জীবন-কর্ম-সৃজন ইত্যাদি নিয়ে নিয়মিত চর্চা করতেন। ১৯৮৫ সালে বন্ধু ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে নিয়ে নিজের গ্রামে গড়ে তোলেন ‘বহড়ান জনকল্যাণ সমিতি’ নামে ক্লাব এবং একটি খেলার মাঠ। চন্দ্রপ্রকাশ সরকার ছিলেন ছিলেন এই ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক।
লেখালেখির সূত্রপাত কলেজ জীবন থেকে। জেলা এবং রাজ্যের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় গল্প, কবিতা ও প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। ১৯৬৮ সাল থেকে প্রকাশিত রাজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ-সাহিত্য সাপ্তাহিক ‘ঝড়’ পত্রিকার সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য এবং নিয়মিত কলাম লেখক হিসেবে পরিচিত তিনি। ১৯৪০ সালে স্থাপিত ‘মুর্শিদাবাদ জেলা সাংবাদিক সংঘ’-এর প্রাক্তন সভাপতি ও বর্তমান সহ-সম্পাদক। মুর্শিদাবাদ প্রগতিশীল নাগরিক মঞ্চ-এর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব সামলান দক্ষ হাতে। এসবের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও মানবাধিকার সংগঠনের সঙ্গেও যুক্ত রয়েছেন।
তাঁর লেখা ৩টি সাড়া জাগানো গ্রন্থ — ‘সম্প্রীতির বীজতলা’, ‘ইতিহাসে সম্প্রীতি’, ‘মুর্শিদাবাদের বোলান পরিক্রমা’। আরও দুটি গ্রন্থ মলাটবন্দী করার প্রস্তুতি চলছে। এই গ্রন্থ দুটির সম্ভাব্য নাম ‘অক্ষয়কুমার দত্ত: বিস্মৃত এক রেনেসাঁ ব্যক্তিত্ব’ এবং ‘সম্প্রীতির সামাজিক ভিত্তি’। মূলত বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর লেখা প্রবন্ধগুলি সংকলিত করা হলে আরও বেশ কয়েকটি গ্রন্থ হতে পারে। একটি চোখের দৃষ্টি চলে যাওয়া সত্ত্বেও লেখা-পড়ার ব্যাপারে এখনও নিরলস ও অক্লান্ত ষাটোর্ধ্ব চন্দ্রপ্রকাশ সরকার।
অধুনা প্রয়াত এবাদুল হক সম্পাদিত ত্রৈমাসিক সাহিত্য পত্রিকা ‘আবার এসেছি ফিরে’-র পক্ষ থেকে ২০২০ সালে ‘শ্রেষ্ঠ প্রাবন্ধিক’ সম্মাননা পান তিনি। ২০২২ সালে জঙ্গিপুর সাহিত্য সমন্বয় পরিষদের পক্ষ থেকে দেওয়া হয় ‘নূর স্মৃতি সাহিত্য সম্মাননা’। ‘বাসভূমি সাহিত্য সম্মাননা’ পান ২০২৪ সালে, এটি রাজ্যের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি পুরস্কার।
চন্দ্রপ্রকাশ সরকারের নেশা সাংবাদিকতা, সাহিত্য ও ইতিহাস চর্চা, ছাদ-বাগান করা, রান্না করা এবং সর্বোপরি ঐক্য ও সম্প্রীতির বীজ বপণ করা। তাঁর অন্যতম লক্ষ্য হল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় আমৃত্যু লড়াই চালানো, বিজ্ঞানমনস্কতা ও যুক্তিবাদী ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক মনন গড়ে তোলা, সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নিরন্তর কাজ করে যাওয়া। সবশেষে যেকথা না বললেই নয়, সেটা হল — ঢেঁকি যেমন স্বর্গে গেলেও ধান ভানে, চন্দ্রপ্রকাশ সরকার তেমনি যেখানেই যান, যা-ই লেখেন, তাঁর একমাত্র ধ্যান-জ্ঞান হল ঐক্য-সম্প্রীতি।








