ফিলিস্তিনের সমর্থনে দিল্লিতে মহাবিক্ষোভ গাজায় দখলের বিরুদ্ধে গর্জে উঠল মুসলিম নেতারা
ফিলিস্তিনের সমর্থনে দিল্লিতে মহাবিক্ষোভ
গাজায় দখলের বিরুদ্ধে গর্জে উঠল মুসলিম নেতারা
ফারিকুল ইসলাম, নতুন পয়গাম, নয়াদিল্লি, ২২ আগস্ট: ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি ও সহমর্মিতা জানিয়ে গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি বর্বরতা, যুদ্ধ তথা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস এবং গণহত্যা বন্ধের দাবিতে দিল্লিতে গর্জে উঠলেন বিভিন্ন মুসলিম সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। শুক্রবার এক বিশাল বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে গাজার প্রতি সংহতি জ্ঞাপন করে ইসরাইলি নৃশংসতা ও পাশবিক আগ্রাসনের তীব্র নিন্দা করেন সকলেই। মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান মানবিক সংকট নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং সতর্ক করে বলেন, দীর্ঘ দেড় যুগ ধরে অবরুদ্ধ করে রেখে গাজা উপত্যকায় ইসরাইলের সামরিক বা রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা বা গাজাকে দখল করে নেওয়ার যেকোনো প্রচেষ্টা চলমান মানবিক বিপর্যয়কে আরও তীব্র করবে। সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য নতুন করে সর্বাত্মক যুদ্ধ, রক্তপাত, ধ্বংসযজ্ঞ ও গণহত্যার দিকে এগিয়ে যাবে বলে সাবধান সতর্ক করেন তারা।
এদিন দুপুরে জুম্মার নামাযের পর দিল্লি ও আশপাশের রাজ্যগুলো থেকে কয়েক হাজার মানুষ জমায়েত হয়। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষজন, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও এই প্রতিবাদ-বিক্ষোভে অংশ নেন। বিপুল সংখ্যক নাগরিক, শিক্ষার্থী, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতা এবং খ্যাতনামা সিভিল সোসাইটির লোকেরা, মানবাধিকার কর্মীরা দলে দলে যোগ দেন। প্রায় সব ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পটভূমি থেকে মানুষের অংশগ্রহণ এই সংহতি সমাবেশ থেকে এক শক্তিশালী বার্তা দেয়। ফিলিস্তিনের সঙ্গে সংহতি শুধু মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ভারতের শান্তি, সম্প্রীতি ও ন্যায়প্রিয় সব মানুষের যৌথ উদ্বেগ।
বক্তারা ইসরাইলের নৃশংস আগ্রাসনের তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে পরিকল্পিত গণহত্যা বলে অভিহিত করেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে লক্ষাধিক গাজাবাসী তথা ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। যার মধ্যে নারী এবং শিশু ৭০ শতাংশেরও বেশি। লক্ষ লক্ষ মানুষ অনাহারে, অর্ধাহারে দিনাতিপাত করছেন। অপুষ্টির কারণে মৃত্যুর অপেক্ষায় প্রহর গুণছে লক্ষাধিক শিশু। স্কল, কলজে, রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ সংযোগ, হাসপাতাল, ত্রাণশিবির — ২২ মাস ধরে লাগাতার বিমান থেকে বোমা ফেলে সবকিছু ধ্বংস করে দিয়েছে ইসরাইল। রাষ্ট্রসংঘের রিপোর্টে একাধিকবার বলা হয়েছে, গাজা উপত্যকা হল বিশ্বের উন্মুক্ত কারাগার এবং এখন সেঝানে মানুষের বসবাসের উপযুক্ত পরিবেশ নেই। কোন পরিকাঠামো নেই, সব ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। ফলে মানুষের কর্মসংস্থান নেই। বেকারত্ব ৮৫ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। কারণ, কল-কারখানা, অফিস সব কিছুই ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।
এমতাবস্থায় শুক্রবার দিল্লির এই মহা সমাবেশ থেকে যেসব দাবি-দাওয়া তোলা হয়, সেগুলি হল: আন্তর্জাতিক মহলকে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির ব্যবস্থা করতে হবে। জরুরি ভিত্তিতে মানবিক করিডোর খুলে খাদ্য, পানি, জ্বালানি ও চিকিৎসা ও ত্রাণ সামগ্রী গাজায় পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি ভারত সরকারকেও ইসরাইলি নৃশংসতা, বর্বরতা ও পাশবিকতার নিন্দা করতে হবে এবং ইসরাইলকে সব ধরনের সামরিক ও কৌশলগত সহযোগিতা বন্ধ করতে হবে। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতের তরফে জারি হওয়া গ্রেপ্তারি পরোয়ানাকে সমর্থন করতে হবে এবং রাষ্ট্রসংঘে ইসরাইলের অবৈধ দখলদারিত্ব, আগ্রাসন, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, একতরফা যুদ্ধ, পাইকারি হারে নিরীহ মানুষকে হত্যা করা বন্ধ করে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরাতে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ন্যায্য দাবিকে সমর্থন করতে হবে। কেন্দ্র সরকারকে অবশ্যই নিপীড়িত ফিলিস্তিনিদের পাশে নৈতিকভাবে দাঁড়াতে হবে এবং অবৈধ দখলদারিত্বের অবসানে আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টায় সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। ভারতের সিভিল সোসাইটি ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে সচেতনতামূলক প্রচার, ইসরাইলি পণ্য বয়কট এবং শান্তিপূর্ণ সংহতি কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি এদিনের বিক্ষোভ থেকে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ৫৭টি দেশ তথা সরকারের প্রতি জোরালো আহ্বান জানানো হয়, যেন তারা একযোগে ইসরাইল ও আমেরিকার ওপর সর্বোচ্চ কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে এই হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করে। অবাধে ধ্বংসলীলী ও গণহত্যাযজ্ঞ দেখেও নীরবতা কাম্য নয়। মনে রাখতে হবে, আমাদের দেশ ভারতবর্ষও ২০০ বছর ব্রিটিশ শাসনে এভাবেই অত্যাচারিত, নির্যাতিত হত। এদেশের মাটিতে আজও অগণিত বিপ্লবী ও স্বাধীনতা সংগ্রামীর রক্ত লেগে আছে। ব্রিটিশরা হত্যা করেছে, ফাঁসিতে ঝুলিয়েছে লক্ষাধিক ভারতবাসীকে। সেটাই দীর্ঘ সাড়ে সাত দশক ধরে গাজা ও ফিলিস্তিন তথা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে চালিয়ে যাচ্ছে ইসরাইল।
এদিনের প্রতিবাদ-বিক্ষোভ কর্মসূচিতে বক্তব্য রাখেন জামাআতে ইসলামী হিন্দের সর্বভারতী সভাপতি সৈয়দ সাদাতুল্লাহ হুসাইনি, জমিয়ত উলামায়ে হিন্দের মহাসচিব হাকিমউদ্দিন কাসেমি, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালযয়ের অধ্যাপক ভি.কে ত্রিপাটি, বম্বে হাইকোর্টের বর্ষীয়ান আইনজীবী লারা জেসিং, নিশা সিন্ধু, প্রাক্তন সাংসদ মোহাম্মদ আদীব, ওয়াহদাতে ইসলামীর জাতীয় সভাপতি জিয়াউদ্দিন সিদ্দিকী, ওয়েলফেয়ার পার্টির সভাপতি ডা. রইসউদ্দিন, জমিয়তুল উলামার মুফতি আবদুর রাজিক, এসআইও-র সভাপতি আবদুল হাফিজ, মিল্লি কাউন্সিলের শেখ নিযামউদ্দিন, জামাআতে ইসলামীর সহ-সভাপতি মালিক মোতাসিম খান প্রমুখ।








