চলে যাবে মুখ্যমন্ত্রীর পদ? বিলের বিরুদ্ধে সোচ্চার বিরোধী দলগুলো
নতুন পয়গাম, নয়াদিল্লি, ২০ আগস্ট: সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশন শেষ হওয়ার এক দিন আগে আবারো উত্তপ্ত হল সংসদ। বুধবার কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের পেশ করা ১৩০তম সংবিধান সংশোধনী বিল নিয়ে এই বিতর্ক। এই বিলে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী-মুখ্যমন্ত্রী বা অন্য কোনও ক্যাবিনেট মন্ত্রী যদি টানা ৩০ দিন গ্রেফতার হয়ে হেফাজতে থাকেন, তাঁকে পদ থেকে অপসারণ করা হবে। এদিন একই সঙ্গে অমিত শাহ পেশ করেন কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের সরকার (সংশোধনী) বিল, জম্মু-কাশ্মীর পুনর্গঠন বিল।
তিনটি বিলেরই বিরোধিতায় এদিন পার্লামেন্টের ভিতর ও বাইরে সোচ্চার হয় বিরোধীদের জোট ‘ইন্ডিয়া’র শরিক দলের সাংসদরা। লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী এবং তৃণমূলের লোকসভার নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগ, এই বিল আইনে পরিণত হলে বিভিন্ন কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাকে রাজনৈতিক কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে সুবিধা পাবে শাসক দল বিজেপি। বিরোধী-শাসিত রাজ্যগুলিতে মুখ্যমন্ত্রী বা অন্য মন্ত্রীদের এই আইনের মাধ্যমে বিপদে ফেলা হতে পারে বলে আশঙ্কা তাদের।
অবশ্য এই বিতর্কিত বিল বুধবার লোকসভায় পাশ হয়নি। বিরোধী সাংসদদের প্রবল প্রতিবাদ এবং হট্টগোলের আবহে বিলটি যৌথ সংসদীয় কমিটি বা জেপিসি-তে পাঠানো হয়। ধ্বনিভোটে বিরোধীদের একাংশের বিতর্কের দাবি উড়িয়ে অন্য এক গুরুত্বপূর্ণ বিল এদিন লোকসভায় ধ্বনিভোটে পাশ করিয়ে নিয়েছে নরেন্দ্র মোদী সরকার। ওই বিল অনুযায়ী, এ বার নিষিদ্ধ হতে চলেছে আর্থিক লেনদেনে যুক্ত সমস্ত ধরনের অনলাইন গেমিং। ‘দ্য প্রমোশন অ্যান্ড রেগুলেশন অব অনলাইন গেমিং বিল-২০২৫’ নামে এই বিলে আর্থিক লেনদেনে যুক্ত অনলাইন গেমিং পরিচালনা করলে এক কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা এবং তিন বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের সাজা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রচারের উপরেও জরিমানার প্রস্তাব রয়েছে। এদিন লোকসভায় এই বিল পাশের ফলে প্রশ্নের মুখে পড়েছে ফ্যান্টাসি স্পোর্টস গেমিং সংস্থাগুলির ভবিষ্যৎ।
উল্লেখ্য, ১৩০তম সংবিধান সংশোধনী বিলে বলা হয়েছে — প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী-সহ কেন্দ্র বা রাজ্যের যে কোনও মন্ত্রী যদি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগে টানা ৩০ দিনের জন্য হেফাজতে থাকেন, তবে ৩১তম দিন থেকে তিনি মন্ত্রিত্ব হারাবেন। পাঁচ বছর বা তার বেশি জেল হতে পারে, এমন অপরাধগুলোকে মূলত ‘গুরুতর’ হিসেবে ধরা হবে।
বুধবার লোকসভায় মোট তিনটি বিল পেশ করা হলে বিরোধীরা তুমুল হট্টগোল শুরু করেন লোকসভায়। ওয়েলে নেমে এসে স্লোগান তুলে বিক্ষোভ দেখাতে থাকেন তাঁরা। বিলের প্রতিলিপি (কপি) ছিঁড়ে প্রতিবাদ জানান বিরোধী সাংসদরা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের দিকে বিলের প্রতিলিপি দলা পাকিয়ে ছোড়াও হয়। বস্তুত, বিরোধীদের এমন মারমুখী বিক্ষোভের কারণে এক পর্যায়ে সামনের সারিতে নিজের নির্ধারিত আসন ছেড়ে ট্রেজারি বেঞ্চের চতুর্থ সারিতে গিয়ে বসতে বাধ্য হন অমিত শাহ এবং সেখান থেকে নিরাপত্তা পরিবেষ্টিত হয়ে বিল পেশ করতে থাকেন। অন্তত ২০ জন মার্শাল এই বিল পেশের সময় শাহকে ঘিরে ছিলেন বলে দাবি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের।
কংগ্রেসের মনীশ তিওয়ারি, কে.সি বেণুগোপাল, মিম প্রধান আসাদউদ্দিন ওয়েইসি-সহ অন্য সাংসদেরা ১৩০তম সংবিধান সংশোধনী বিল পেশের পরেই বিরোধিতায় সরব হন। তাঁদের অভিযোগ, এই বিল সংবিধানের লংঘন এবং যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর পরিপন্থী। যদিও বিরোধীদের অভিযোগ অস্বীকার করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেন, বিলটি যৌথ সংসদীয় কমিটি বা জেপিসি-তে পাঠানোর কথা ঘোষণা করেন। সেখানে সংসদের উভয় কক্ষের শাসক-বিরোধী দলের সাংসদেরা থাকবেন।
বিরোধীদের ব্যাপক হট্টগোলের জেরে এদিন দুপুর ৩টে পর্যন্ত লোকসভার অধিবেশন মুলতুবি হয়ে যায়। পরে বিলটি জেপিসি-তে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কংগ্রেস সাংসদ প্রিয়ঙ্কা গান্ধী অভিযোগ করেছেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে পদক্ষেপের কথা বলে স্রেফ সাধারণ মানুষের চোখে পট্টি পরানো হচ্ছে। ভবিষ্যতে যে কোনও মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে যে কোনও মামলা করা যেতে পারে। তিনি দোষী সাব্যস্ত না হলেও তাঁকে ৩০ দিন হেফাজতে রেখে দেওয়াও হতে পারে। তারপরে তিনি আর মুখ্যমন্ত্রী থাকতে পারবেন না। এটি সম্পূর্ণ সংবিধানবিরোধী, অগণতান্ত্রিক এবং অত্যন্ত বিপজ্জনক।
অন্যদিকে, এদিন লোকসভায় বিরোধীদের আচরণের তীব্র নিন্দা করেছে কেন্দ্র সরকার। পাশাপাশি, বিতর্ক এবং আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের বার্তা দেওয়া হয়। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেণ রিজিজু বলেন, দেশের জনগণ আমাদেরকে কাজ করতে এখানে পাঠিয়েছেন। বিরোধীরা কি শুধু হট্টগোল করতেই এখানে আসেন? গণতন্ত্রকে অপমান করলে মানুষ ক্ষমা করবে না। জনগণের রায়কে অশ্রদ্ধা করা উচিত নয়। আলোচনা ও বিতর্কের মাধ্যমে নিজেদের কাজ চালিয়ে যাওয়া উচিত।








