মোটা টাকার লোভে কিডনি বিক্রি, সক্রিয় পাচার চক্র
হাসান লস্কর বাবলু, নতুন পয়গাম, সুন্দরবন: কিডনি পাচার চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ উঠছে ক্যানিং ও তার আশপাশের এলাকায়। স্থানীয় সূত্রে খবর, ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকটি গ্রামের মানুষ মোটা টাকার বিনিময়ে নিজেদের কিডনি বিক্রি করে দিয়েছেন। কিন্তু তার পরেও প্রতিশ্রুতি মতো টাকা তারা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ। প্রশাসনের কর্তারা খবর পেলেও দু’পক্ষ বিষয়টি স্বীকার না করায় পদক্ষেপ করা সম্ভবপর হচ্ছে না। এই সমস্যার কথা মেনে নিয়ে ক্যানিং পশ্চিমের বিধায়ক পরেশরাম দাস বলেন, এ ভাবে চলতে থাকলে এলাকার বহু মানুষ নিজেদের কর্মক্ষমতা হারাবেন এবং অকালে ঝরে যাবে এই সমস্ত প্রাণ। পরিণতিতে মারণ রোগ বাসা বাধবে কিডনি দাতাদের শরীরে। তাই এলাকায় গিয়ে এ বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতনও করেন তিনি। পাশাপাশি স্থানীয় দলীয় নেতৃত্বকে এ বিষয়ে সজাগ দৃষ্টি রাখতে বলেন, মানুষকে সাবধান-সতর্ক এবং সচেতনতা কর্মসূচি নিতে আহ্বান জানান তিনি।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, ক্যানিং-১ ব্লকে কিডনি পাচার চক্র সক্রিয়। মূলত হাটপুকুরিয়া পঞ্চায়েত এলাকায় গোপনে তারা এই কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। এছাড়া খাসকুমড়োখালি দাঁড়িয়া-সহ আশপাশের বিভিন্ন গ্রামের মানুষ এই চক্রের খপ্পরে পড়ে নিজেদের কিডনি বিক্রি করেছেন। এক একটি কিডনির জন্য ৭-৮ লক্ষ টাকা দেয়ার কথা বলা হচ্ছে। কেউ কেউ মোটা টাকার লোভে রাজি হলে তাকে অগ্রিম দু-এক লক্ষ টাকা দেওয়া হচ্ছে। হাতে টাকা পেয়ে গরিব মানুষরা অনেকেই তাদের প্রতারণার ফাঁদে পড়ে সর্বশ্রান্ত হচ্ছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ব্লক প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বলেন, বুঝতে পারছি মোটা টাকার বিনিময়ে কিডনি বিক্রির গোপন কারবার চলছে। কিন্তু কেউ স্বীকার করছে না কীভাবে চলে এই অশুভ চক্র? স্থানীয় সূত্রে জানা যাচ্ছে, রক্তের গ্রুপ এবং অন্যান্য বিষয় মিলে গেলে কিছু টাকা অগ্রিম দিয়ে কিডনি দাতাকে রাজি করানোর পর কিডনি গ্রহীতার সঙ্গে যোগাযোগ করে দালালেরা।
এ বিষয়ে বিডিও অফিসে আবেদন করা হলে ব্লক প্রশাসনের তরফে উভয়পক্ষকে ডাকা হয়। তবে সেখানে দালালদের শেখানো বুলি আওড়ান কিডনি দাতারা। স্বেচ্ছায় এবং বিনামূল্যে তাঁরা কিডনি দান করছেন বলে বয়ান দেন। অনেক ক্ষেত্রে কিডনি গ্রহীতা বিপদের সময় দাতাকে সাহায্য করছেন, বা খুবই কাছের মানুষ, নিকটাত্মীয় ইত্যাদি বলেও পরিচয় দেন তারা। ফলে কিছু করতে পারছেন না প্রশাসনের কর্তারা।
এমনই এক কর্তার কথায়, বাধ্য হয়েই পুলিশকে তদন্তের নির্দেশ দিয়ে কিডনি প্রতিস্থাপনের নির্দেশনামায় সই করেন ব্লক প্রশাসনের আধিকারিকেরা। কিন্তু সেখানেও পুলিশ কিছু করতে পারছে না। মানুষ নিজে থেকে সচেতন না হলে এই অবৈধ কিডনি পাচার চক্র বন্ধ করা যাবে না।
কিডনি প্রতিস্থাপন হয়ে যাওয়ার পর দালালদের আর দেখাই মিলছে না বলে অভিযোগ উঠছে। ফলে কিডনি দাতারা বকেয়া টাকা আর পাচ্ছেন না। ক্যানিংয়ের হাটপুকুরিয়ার এক বাসিন্দা বললেন, উত্তরপ্রদেশের এক ব্যবসায়ীকে কিডনি দিয়েছিলাম। দালাল আট লক্ষ টাকা দেবে বলেছিল। অগ্রিম তিন লক্ষ টাকা ও অপারেশনের পরদিন আরো দুই লক্ষ টাকা দেয়। বাকি টাকা আজও দেয়নি। নানা জায়গায় জানিয়েও কোন সুরাহা হয়নি।
এদিকে জনৈক প্রশাসনিক কর্মকর্তা জানাচ্ছেন, আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে কেউ অভিযোগ করেননি। অভিযোগ পেলে নিশ্চয়ই খতিয়ে দেখা হবে। কিন্তু পুরো টাকা না পেয়েও কেন দালালদের খপ্পরে পড়ছেন এসব এলাকার বাসিন্দারা? জবাবে এক মহিলা বলেন, পরিবারের সামান্য রোজগার। তাতে সংসার চলা দায়। একটা কিডনির বিনিময়ে বেশ কয়েক লক্ষ টাকার লোভ অনেকেই সামলাতে পারছে না। তাঁর কথায়, শুনেছি একটা কিডনি দিয়ে দিলে তেমন কোন বড় সমস্যা হয় না। কারণ, সবার শরীরে দুটো করে কিডনি থাকে। তাই ৭-৮ লক্ষ টাকা দিয়ে দোকান বা ব্যবসা করা যাবে। সব দালাল তো আর খারাপ নয়, যে টাকা দেবে না। এই আশাতেই প্রতারিত হচ্ছে গরিব মানুষেরা। এভাবে চলতে থাকলে দালাল চক্র ক্রমশ আরো সক্রিয় ও তৎপর হবে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের।







