এবার CO₂ হবে শক্তি সম্পদ!
এবার CO₂ হবে শক্তি সম্পদ!
পঞ্চানন মণ্ডল
নতুন পয়গাম, বিশেষ প্রতিবেদন: ভাবুন আপনার হাতে একটি অদৃশ্য জাদুর বোতল। বাইরে থেকে দেখতে কিছুই নেই, কিন্তু ভেতরে ঢুকলে দেখা যাবে একটি ক্ষুদ্র কারখানা, যা বাতাসের কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO₂) গ্যাসকে বদলে ফেলছে জ্বালানিতে! শুনতে হয়ত সায়েন্স ফিকশন মনে হচ্ছে? কিন্তু না। এটাই বাস্তব গবেষণা, যা অতি সম্প্রতি Nature Communications-এ প্রকাশিত হয়েছে।
CO₂-কে জ্বালানিতে রূপান্তরের চ্যালেঞ্জ:
বিশ্ব উষ্ণায়নের মনুষ্যসৃষ্ট কারণকেই অন্যতম কারণ হিসেবে CO₂ নিঃসরণকে মনে করা করা হয়। বিজ্ঞানীরা বহু বছর ধরে চেষ্টা করছেন এই গ্যাসকে কাজে লাগিয়ে উপকারী পদার্থ, বিশেষত মিথানল (CH₃OH) তৈরি করতে। মিথানল একদিকে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, আবার অন্যদিকে নানা রাসায়নিক উৎপাদনের উপাদান বা কাঁচামাল। কিন্তু সমস্যাটা হল, CO₂-কে ইলেকট্রিকের সাহায্যে রূপান্তরিত করতে গেলে সাধারণত CO বা হাইড্রোজেনের মতো পণ্য বেশি তৈরি হয়, মিথানল নয়।
ন্যানোকনফাইনমেন্ট; ক্ষুদ্র জগতের বড় খেলা:
এই সমস্যার সমাধান এসেছে এক চমকপ্রদ ধারণা থেকে Nanoconfinement বা ‘ন্যানো-সংবদ্ধ পরিবেশ’। সহজ কথায় বললে, বিক্রিয়াকারী অণু ও অনুঘটককে (Catalyst) একটি অতি ক্ষুদ্র, ন্যানো-আকারের ঘরে বন্দি করে দেওয়া। এত ছোট যে, সেখানে অণুগুলোর চলাফেরা বদলে যায় এবং বিক্রিয়ার পথও নতুন মোড় নেয়।
কার্বন ন্যানোটিউবের ভেতরের রহস্য:
চীনের একদল গবেষক কার্বন ন্যানোটিউব (CNT) নামে অতি সূক্ষ্ম নলাকার গঠনের ভেতরে ঢুকিয়ে দিলেন কোবাল্ট ফথ্যালোসায়ানিন (CoPc) নামে একটি অণু-ক্যাটালিস্ট। এরপর তাঁরা পরীক্ষা করলেন, যখন CoPc ন্যানোটিউবের ভেতরে থাকে, আর যখন তা বাইরে থাকে।
ফলাফল দেখে গবেষকরাও অবাক। ন্যানোটিউবের ভেতরের CoPc মিথানল তৈরিতে অনেক বেশি দক্ষ, কিন্তু বাইরের CoPc মূলত CO উৎপাদন করে।
কেন ভেতরেরটা বেশি কাজের:
গবেষকরা operando spectroelectrochemistry নামে এক অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিক্রিয়াকালীন অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন এবং কম্পিউটার স্টিমুলেশন মডেল দিয়ে এর কারণ ব্যাখ্যা করেন। দেখা গেল, CO মধ্যবর্তী পদার্থ হিসেবে ন্যানোটিউবের ভেতরে জমে থাকে, কারণ বেরিয়ে যাওয়ার রাস্তা সংকীর্ণ। ন্যানোটিউবের চাপ ও ইলেকট্রিক ফিল্ড CoPc-এর গঠন বদলে দেয়, যা CO শোষণ আরও বাড়ায়। CO দীর্ঘক্ষণ Co সাইটে আটকে থাকায় সহজে হাইড্রোজেন যুক্ত হয়ে মিথানলে রূপান্তরিত হয়।
বিজ্ঞান থেকে ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি:
এই গবেষণা শুধু একটি নতুন অনুঘটক তৈরির গল্প নয়; বরং ক্ষুদ্র জগতের পরিবেশ বদলে কীভাবে রাসায়নিক বিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তার শক্তিশালী প্রমাণ। ভবিষ্যতে এই কৌশল অন্য গ্যাস রূপান্তর, কৃত্রিম জ্বালানি উৎপাদন — এমনকি শিল্প-কারখানার দূষণ নিয়ন্ত্রণেও ব্যবহার হতে পারে। অর্থাৎ, ন্যানোটিউবের ক্ষুদ্র ভেতরটা হয়ে উঠতে পারে একদিন বিশাল জ্বালানি কারখানা, যেখানে দূষণই হবে অমূল্য সম্পদ।








