মানবসেবায় ব্রতী ডা. ফারুক হোসেন গাজী
মানবসেবায় ব্রতী ডা. ফারুক হোসেন গাজী
নতুন পয়গাম, ১৮ আগস্ট: চারপাশে যখন আত্মকেন্দ্রিকতার ঘোর অন্ধকার, সমাজ তখন ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলে তার মমত্ববোধ, তার মানবিক স্পন্দন; ঠিক সেই মুহূর্তেই সুন্দরবনের এক প্রান্তিক ভূমিতে জন্ম নেন ফারুক হোসেন গাজী। এই প্রত্যন্ত এলাকায় তিনি সেবামূলক কাজের মধ্য দিয়ে এখন রীতিমতো আলোকবর্তিকা হয়ে উঠেছেন। এমবিবিএস পাস চিকিৎসক হয়েও যিনি কেবল নিজের জন্য বাঁচার স্বপ্ন দেখেন না, বরং অসংখ্য নিস্পৃহ চোখে আশার দীপ্তি জাগানোর দৃঢ় শপথ নেন। সন্দেশখালীর খাস শাঁকদহ নামক নিভৃত গ্রামের মাটিতে জন্ম নেওয়া এক আশ্চর্য মানবসন্তান, যাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায় যেন হয়ে উঠেছে সমাজসেবার পবিত্র অধ্যয়ন।
মাটির ঘরে দিনমজুর বাবার সন্তান ডা. ফারুক হোসেন গাজীর জীবনে বিলাসিতার লেশমাত্র নেই। কিন্তু ছিল এক বিশাল স্বপ্ন — সেইসব মানুষের পাশে দাঁড়ানোর, যাদের নাম উচ্চারণ করতেও অনেকেই ইতস্তত করেন, যাদের জীবনে আলো আসার আগেই অন্ধকার দীর্ঘ ছায়া ফেলে। ছেলেবেলা থেকেই তাঁর চোখে ছিল মানুষের জন্য কিছু করে যাওয়ার আলোড়ন, আর এই আলোর উৎস তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন আল আমিন মিশন ও রামকৃষ্ণ মিশনের সেবামূলক দর্শনে। সেখান থেকেই শিখেছিলেন, কীভাবে সত্যিকার মানুষ হয়ে গরিবগুর্বো মেহনতী দিনমজুর মানুষের পাশে দাঁড়াতে হয়, সাহায্যের হাত বাড়াতে হয়।
শিক্ষাজীবনে চরম আর্থিক সংকটে থাকা সত্ত্বেও তিনি কখনো হার মানেননি। আল আমিন মিশনের সহায়তায় পড়াশোনা করে MBBS কমপ্লিট করেন, যদিও তার প্রকৃত স্বপ্নের বীজ রোপিত হয়েছিল আরও আগেই। ডাক্তার হওয়ার পর শহরের নামী হাসপাতালগুলোতে কাজের সুযোগ পান, কিন্তু ঝলমলে সেই পরিসরের মধ্যেও তার মন পড়ে থাকত নিজের গ্রামের হাড়-হাভাতে, অসহায় বুভুক্ষু মানুষদের সেবার জন্য। শহরের ঝকমকে আলো ছেড়ে তাই আবার ফিরে যান নিজের শিকড়ে — গ্রামের অবহেলিত মানুষদের চোখে-মুখে তিনি দেখেন আহাজারির ছাপ। তাঁর মনে হয়, এই অন্ধকার এলাকার মানুষদেরকে আলোর সন্ধান দেওয়া প্রয়োজন।
২০১৪ সালে ইন্টার্নশিপের সময়ে সঞ্চিত সাড়ে চার লক্ষ টাকা বিনা দ্বিধায় উৎসর্গ করে গড়ে তোলেন ‘নব দিগন্ত’ — একটি স্বপ্ন, একটি যাত্রা, একটি প্রতিজ্ঞা। কোনো ঢাকঢোল নেই, কোনো করতালির প্রত্যাশা নেই — আছে কেবল নিঃস্বার্থ ভালবাসা ও বঞ্চিতদের পাশে দাঁড়ানোর অবিচল অঙ্গীকার। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের চারটি বুনিয়াদের ওপর দাঁড়িয়ে ‘নব দিগন্ত’ হয়ে ওঠে অগণিত শিশুর নতুন আশা-ভরসার কেন্দ্র।
তিনি প্রতিষ্ঠা করেন এমন এক স্কুল, যেখানে কোনো ভর্তি-ফী নেই। অনাথ, এতিম, আদিবাসী, সংখ্যালঘু, প্রতিবন্ধী, স্কুলছুট — সবার জন্য উন্মুক্ত এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আজও আশার আলো হয়ে জ্বলছে। শুধু পড়াশোনাই নয় — বই, খাতা, জামা-কাপড়, ঔষধ, চিকিৎসা পরিষেবা — এখানে সবকিছুই দেওয়া হয় বিনামূল্যে। ‘নব দিগন্ত’ আজ একটি প্রতিষ্ঠান নয়, অগণিত অসহায় মানুষের প্রাণবায়ু।
স্বাস্থ্য পরিষেবা ক্ষেত্রে তিনি গড়ে তুলেছেন এক অভিনব মডেল — প্রত্যেক শনিবার চলে স্বাস্থ্যকেন্দ্র, বিনা পয়সায় চিকিৎসা, বিনামূল্যে ওষুধ বিতরণ। তাঁর ডাক্তারি জীবনের সহকর্মীরাও এই মহাযাত্রায় সঙ্গী হন। ২০১৭ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত এক আলোচনাচক্রে নব দিগন্তের স্বাস্থ্য প্রকল্পের শিকড় আরও দৃঢ় হয়।
নারী ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রেও নব দিগন্ত আজ এক অনন্য দৃষ্টান্ত। নার্সিং প্রশিক্ষণ, স্যানিটারি ন্যাপকিন বিতরণ, মহিলাদের জন্য কর্মসংস্থান প্রকল্প, ছাত্রীদের জন্য পৃথক কোচিং সেন্টার — সবই চালু করেছেন তিনি। প্রকৃতি ও পরিবেশের স্বার্থে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, দুর্যোগের পরে পুনর্বাসন ও ত্রাণ সহায়তা — সবই চলছে নিয়মিত। প্রান্তিক মানুষদের জন্য ‘বিনা পয়সার বাজার’ ও ‘বিনা পয়সার আহার’ প্রকল্পও চালু করেছেন।
নব দিগন্তের এই বৃহৎ ও বহুমুখী কর্মকাণ্ডের পেছনে প্রতি মাসে ব্যয় হয় প্রায় পাঁচ লক্ষ টাকা। কোনো সরকারি অনুদান না পেয়েও কেবল কতিপয় মানুষের ভালবাসা, আর কয়েকজন সাহসী সহযাত্রীর অবদানে আজ ‘নব দিগন্ত’ এক অফুরন্ত আশার পরিণত ও পরিশীলিত রূপ পরিগ্রহ করেছে। পাঁচটি জোনে বিভক্ত হয়ে এই সংস্থা সারা রাজ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। একই পতাকার তলায়, একই মূলমন্ত্রে তারা দীক্ষিত — ‘জাত-পাত নয়, মানবসেবাই আমাদের ধর্ম।’
এই নিঃস্বার্থ ও নিঃশর্ত সেবার পথচলা কেবল মানুষের মন ছুঁয়ে যায়নি, ছুঁয়ে গেছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরের বিভিন্ন সম্মানমঞ্চও। ‘বিনা পয়সার ডাক্তার’ হিসেবে পরিচিত ডা. ফারুক হোসেন গাজী আজ শুধু একটি নাম নয়; একটি প্রেরণা, একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। তাঁর এই ব্যতিক্রমী কর্মযজ্ঞের স্বীকৃতি হিসেবে জায়গা করে নিয়েছেন ইন্ডিয়ান বুক অফ রেকর্ডস, এশিয়া বুক অফ রেকর্ডস, এবং ইন্ডিয়া আইকন অ্যাওয়ার্ড-এর মতো সম্মানজনক তালিকায়। মানবসেবায় তাঁর ত্যাগ-তিতিক্ষা ও অবদানকে কুর্নিশ জানিয়েছে গোটা দেশ।
তাঁর জীবনের সেই গল্প উঠে এসেছে আনন্দবাজার, টাইমস অফ ইন্ডিয়া, জি-বাংলা, দাদাগিরি, দিদি নং-১ এর মতো জায়গায়। কিন্তু এই জীবনের মূলে রয়েছে এক নিঃশব্দ বিপ্লব, যে বিপ্লব সমাজের দৃষ্টি ঘুরিয়ে দেয় নিজের নয়, অন্যের জন্য বাঁচার দিকে।
ডা. ফারুক হোসেন গাজীর এই দীর্ঘযাত্রা নিছক ব্যক্তিগত কোনো কাহিনি নয়। এটি আমাদের সবার গল্প, যে গল্প শোনায় ‘ভালবাসা দিয়ে বদলে দেওয়া যায় একটা সমাজকে’। হাত ধরাধরি করে এগোলে অসংখ্য খাস শাঁকদহ অন্ধকার থেকে আলোয় পৌঁছাতে পারে, এটাই ডা. ফারুক হোসেন গাজী ও ‘নব দিগন্ত’ থেকে শিক্ষণীয় বিষয়।








