দেশভাগ: দায়ী কে বা কারা
মাসুদুর আলি, নতুন পয়গাম
ভারতবর্ষের ইতিহাসে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ নিঃসন্দেহে অন্যতম বড় ট্র্যাজেডি। হাজার বছরের সহাবস্থানের ঐতিহ্য, মিলনমেলার সংস্কৃতি, পারস্পরিক মত ও ভাব বিনিময়, আর আন্তঃসম্পর্কের শিকড় ছিন্নভিন্ন করে ভারতবর্ষ দ্বিখণ্ডিত হয়ে এক রাতে দুটি পৃথক রাষ্ট্র তৈরি হল — ভারত ও পাকিস্তান। দেশভাগ শুধু ভৌগোলিক সীমারেখার বিভাজনই নয়, এটি ছিল মানুষের হৃদয়, বিশ্বাস, সংস্কৃতি এবং ইতিহাসের বিভাজন। অগণিত মানুষ বাস্তুচ্যুত হল, কয়েক লক্ষ মানুষ প্রাণ হারাল, আর যে ক্ষত তৈরি হল — তা আজও দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি ও সমাজে দগদগে ক্ষতচিহ্ন হিসেবে রয়ে গেছে।
প্রশ্ন হলো, এই দেশভাগের জন্য দায়ী কে বা কারা? দীর্ঘকাল ধরে প্রচলিত বয়ানে বলা হয়েছে, মুসলিম লীগই দেশভাগের মূল কারিগর। জিন্নাহর পাকিস্তান দাবিকেই সবসময় আলাদা রাষ্ট্র সৃষ্টির জন্য অভিযুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু যদি ইতিহাসকে গভীরভাবে দেখা যায়, দলিল-দস্তাবেজ অধ্যয়ন করা হয় এবং নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ করা হয়, তবে স্পষ্ট বোঝা যায়, দেশভাগের জন্য মুসলিম লীগ একাই নয়, কংগ্রেস তথা হিন্দু নেতৃত্বের একগুঁয়ে মনোভাব, রাজনৈতিক আধিপত্যবাদ এবং হিন্দু মহাসভার সাম্প্রদায়িক রাজনীতিও ছিল সমান দায়ী। যদি কংগ্রেস কিছুটা নমনীয় হত, মুসলিমদের স্বার্থকে গুরুত্ব দিত, সাম্য ও মৈত্রীর নীতিকে প্রাধান্য দিত এবং ক্ষমতার সুষম বণ্টনে আন্তরিক হত, তবে পাকিস্তান আন্দোলন হয়ত এত ব্যাপক সমর্থন পেত না, এবং দেশ ভাগও হত না।
কংগ্রেসের ব্যর্থতা যেখানে: কংগ্রেস দাবি করত, তারা আসমুদ্র হিমাচল পরিবেষ্ঠিত ভারতবাসীর প্রতিনিধি। কিন্তু বাস্তবে কংগ্রেসের রাজনৈতিক পলিসি, এজেন্ডা ও কর্মকাণ্ডে প্রতিফলিত হত কেবল সংখ্যাগুরু সমাজের কল্যাণের দিকটাই। ১৯৩৭ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনেই এর প্রমাণ মেলে। মুসলিম লীগ তখন তুলনামূলক দুর্বল ছিল এবং মুসলমানদের ভোট ব্যাপকভাবে বিভক্ত হয়। কিন্তু নির্বাচনের পর কংগ্রেস যখন সরকার গঠন করল, তখন আনুপাতিক হারে মুসলমানদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ সুনিশ্চিত করার পরিবর্তে তাদেরকে প্রশাসন ও সরকার থেকে বঞ্চিত করা হল।
উত্তর প্রদেশে মুসলিম লীগ কংগ্রেসের মন্ত্রিসভায় যোগ দিতে চেয়েছিল, কিন্তু কংগ্রেস স্পষ্ট জানিয়ে দিল তাদের প্রয়োজন নেই। ফলে মুসলমানদের মনে ভয় তৈরি হল যে, স্বাধীন ভারতে তারা রাজনৈতিকভাবে প্রান্তিক হয়ে পড়বে। তাছাড়া কংগ্রেসি শাসনে নানা সিদ্ধান্ত মুসলমানদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করে, যেমন স্কুল-কলেজে ‘বন্দে মাতরম’ গান বাধ্যতামূলক করা, যা মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল। হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা করার চেষ্টা, যা উর্দুভাষী মুসলমানদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করে। গোমাংস ভক্ষণ নিয়ে উগ্র হিন্দু ভাবাবেগকে প্রশ্রয় দেওয়া, যা মুসলমানদের প্রতি অবমাননাকর আচরণ হিসেবে দেখা দেয়। এসব অভিজ্ঞতা মুসলমানদের কাছে বার্তা এই দিল যে, স্বাধীন ভারতে কংগ্রেসের নেতৃত্বে সংখ্যাগুরু সমাজের আধিপত্যই প্রতিষ্ঠিত হবে, সংখ্যালঘুরা ন্যায্য বা প্রাপ্য অধিকার পাবে না।
গান্ধী-নেহরু ও জিন্নাহ: মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ প্রথম জীবনে জাতিগত ঐক্য ও সম্প্রীতির প্রতি দৃঢ় বিশ্বাসী নেতা ছিলেন। তিনি কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় সদস্য হিসেবে গান্ধী-নেহরুর সঙ্গে একই মঞ্চে কাজ করেছিলেন। কিন্তু ধীরে ধীরে কংগ্রেস তাকে প্রান্তিক করে তোলে। জিন্নাহ যখন মুসলমানদের অধিকার রক্ষার্থে আলাদা কণ্ঠস্বর তুলতে শুরু করেন, তখন কংগ্রেস নেতৃত্ব সেই দাবিকে গুরুত্ব দেয়নি। ১৯৪৬ সালের ক্যাবিনেট মিশন পরিকল্পনা ছিল দেশভাগ রোধ করার সর্বশেষ বড় সুযোগ। পরিকল্পনায় বলা হয়েছিল, ভারত একটি ফেডারেল রাষ্ট্র থাকবে, যেখানে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলোকে আলাদা গ্রুপে স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হবে। এতে পাকিস্তান না গড়েই মুসলমানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেত। কিন্তু জওহরলাল নেহরু প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন, কংগ্রেস এই পরিকল্পনার কোনো বাধ্যবাধকতা মানবে না। এই ঘোষণাই মুসলিম লীগকে চূড়ান্তভাবে পাকিস্তানের দাবির দিকে ঠেলে দেয়।
১৯৪৬ সালের নির্বাচন; বিভাজনের ইঙ্গিত: দেশভাগের আগে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা ছিল ১৯৪৬ সালের প্রাদেশিক নির্বাচন। এই নির্বাচনে মুসলমানরা প্রায় সর্বসম্মতভাবে কংগ্রেসকে প্রত্যাখ্যান করে মুসলিম লীগের দিকে ঝুঁকে পড়ে। মুসলমানদের জন্য নির্দিষ্ট ৪৯৬টি আসনের মধ্যে মুসলিম লীগ জেতে ৪২৯টি আসন (৮৭%)। কংগ্রেস ব্যর্থ হয় মুসলমানদের আসনে। অন্যদিকে, হিন্দুপ্রধান আসনে কংগ্রেস কার্যত একাধিপত্য কায়েম করে। এই ফলাফল স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দেয়, ভারতীয় সমাজ দ্বিধাবিভক্ত হয়ে গেছে। হিন্দুরা কংগ্রেসে, আর মুসলমানরা মুসলিম লীগে। এটাই মূলত দেশভাগের গণভিত্তি তৈরি করে দেয়।
হিন্দু মহাসভা ও কট্টরপন্থী রাজনীতি: মুসলিম লীগের পাশাপাশি হিন্দু মহাসভা এবং আরএসএস-এর ভূমিকা দেশভাগকে আরও ত্বরান্বিত করে। এই সংগঠনগুলো স্পষ্টভাবে মুসলমানদের ‘বিদেশি’ আখ্যা দিয়ে ভারতকে কেবল হিন্দুদের রাষ্ট্র করার দাবি তোলে। ভি.ডি. সাভারকার তার গ্রন্থ Hindutva: Who is a Hindu? (১৯২৩)-তে লেখেন, “ভারত হিন্দুদের ভূমি, মুসলমানরা এখানে বহিরাগত।” বাংলায় শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী মুসলিম-বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। মহারাষ্ট্রে আরএসএস ও মহাসভা মুসলিমবিরোধী প্রচার চালিয়ে মুসলিমদের আতঙ্কিত করে তোলে। এহেন উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিতে মুসলমানদের মধ্যে বিশ্বাস জন্মায় যে, স্বাধীন ভারতে তারা কোনোদিনই নিরাপদ হবে না। জিন্নাহ এবং মুসলিম লীগ এই ভয়কে কাজে লাগিয়েই পাকিস্তান আন্দোলনকে সর্বজনীন রূপ দেয়।
দেশভাগের ভোটাভুটি ও চূড়ান্ত রায়: ১৯৪৭ সালে দেশভাগ কার্যকর করার আগে বিভিন্ন প্রদেশের আইনসভায় ভোটাভুটি হয়। পাঞ্জাবে মুসলিম সদস্যরা পাকিস্তানের পক্ষে ভোট দেয়, হিন্দু ও শিখরা ভারতের পক্ষে। পূর্ববঙ্গের মুসলমানরা পাকিস্তানের পক্ষে, পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুরা ভারতের পক্ষে ভোট দেয়। সিন্ধ ও সীমান্ত প্রদেশে মুসলিম লীগ পাকিস্তানের পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পায়। ভোটাভুটিতে এই আড়াআড়ি বিভাজন দেশভাগকে আনুষ্ঠানিক সিলমোহর দেয়। কিন্তু এর নেপথ্য কারণ ছিল ১৯৩৭ ও ১৯৪৬ সালের অভিজ্ঞতা, কংগ্রেসের একগুঁয়ে নীতি এবং হিন্দু মহাসভার উগ্র রাজনীতি।
কংগ্রেসের একক আধিপত্যবাদ: কংগ্রেস সবসময় নিজেকে ভারতের একমাত্র রাজনৈতিক প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইত। যদিও মাওলানা আবুল কালাম আজাদের মতো সর্বজনীন নেতারা কংগ্রেসের ভিতরে মুসলমানদের প্রতি ইনসাফের দাবিতে সরব হতেন, কিন্তু তাদের মতামত প্রায়শই উপেক্ষিত হত। স্বাধীন ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী মাওলানা আজাদ তাঁর আত্মজীবনীতে (India Wins Freedom) লিখেছেন, “যদি কংগ্রেস ১৯৩৭ সালে মুসলিম লীগকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করত, বা ১৯৪৬ সালের ‘ক্যাবিনেট মিশন’ পরিকল্পনাকে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করত, তবে পাকিস্তান সৃষ্টি হত না।”
নিরপেক্ষভাবে ইতিহাস পরিক্রমা করলে দেখা যায়, দেশভাগের জন্য কেবল মুসলিম লীগকে দোষারোপ করা অযৌক্তিক। মুসলমানদের ভয়, অবিশ্বাস ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছিল মূলত কংগ্রেসের একগুঁয়ে মনোভাব, ক্ষমতার একচেটিয়া দখলদারি এবং হিন্দু মহাসভার উগ্র রাজনীতির কারণে। মুসলিম লীগ এই অবিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে পাকিস্তানের দাবিকে শক্তিশালী করেছিল। সুতরাং, দোষের পাল্লা ভারি করলে বলতে হয়, দেশভাগের জন্য কংগ্রেস তথা তদানীন্তন হিন্দু নেতৃত্ব কোন অংশে কম দায়ী নয়। তাদের ব্যর্থ নেতৃত্ব, সংকীর্ণ মানসিকতা এবং মুসলিমদের প্রতি অবজ্ঞা-অবহেলাই পাকিস্তান সৃষ্টির পথ প্রশস্ত করেছিল।








