আকাশচুম্বী অট্টালিকা ছেড়ে দূষণমুক্ত সুন্দরবনে বাড়ছে পর্যটকের ভিড়
হাসান লস্কর বাবলু, নতুন পয়গাম, সুন্দরবন: কংক্রিটের জঞ্জালে ঘেরা শহুরে জীবন যেন দিন দিন অদৃশ্য খাঁচায় বন্দি হয়ে পড়ছে। আকাশছোঁয়া বহুতল ভবন, ক্রমবর্ধমান জনবিস্ফোরণ, যানজট, আর গাড়ি এবং কল-কারখানার বিষাক্ত ধোঁয়ায় দমবন্ধ পরিস্থিতি। সব মিলিয়ে কলকাতা ও তার আশেপাশের শহরতলীর মানুষের কাছে ‘শান্তির খোঁজে’ পালিয়ে যাওয়া প্রায় এক প্রয়োজনীয়তায় পরিণত হয়েছে। আগে শহরের নানা প্রান্তে দেখা যেত ছোট ছোট বাংলো বা দোতলা বাড়ি, যেখানে দূরত্ব ও ফাঁকা জায়গা জীবনের স্বাভাবিক অংশ ছিল। কিন্তু আজ যেদিকে তাকানো যায়, সেদিকেই উঁচু বহুতল। ৫ থেকে ১০-১৫ তলা বিল্ডিং, কোথাও আরো উঁচু বিশাল কংক্রিটের দানব। জনসংখ্যা যেমন হু হু করে বাড়ছে, তেমনি সবুজের জায়গা গিলে নিচ্ছে কংক্রিটের বিস্তার।
দূষণ ও কোলাহল থেকে মুক্তির খোঁজে শহরের মানুষ এখন ছুটির দিনগুলোতে ক্রমেই খুঁজে নিচ্ছেন প্রকৃতির কোলে কিছুটা অবসর। তাই দিঘা, মন্দারমণি, গঙ্গাসাগর, বকখালি — এসব পরিচিত সমুদ্র সৈকতের পাশাপাশি এখন সুন্দরবনও পর্যটন মানচিত্রে ক্রমশ শক্তপোক্ত অবস্থান করে নিচ্ছে। গাঙ্গেয় সুন্দরবন, যা একদিকে ঘন ম্যানগ্রোভ জঙ্গল ও বাঘের জন্য বিখ্যাত, আর অন্যদিকে নদী ও খাল-বিল জুড়ে বিস্তৃত নোনা জলের রাজ্য — এ যেন এক অন্য মায়াবী পৃথিবী। এখানে সবুজ মাঠ, গ্রামীণ জীবনযাত্রা, নির্মল বাতাস আর শান্ত রাত্রির হাতছানি — সব মিলিয়ে এক অনন্য অভিজ্ঞতা অপেক্ষা করে ভ্রমণ পিপাসুদের জন্য।
সুন্দরবনের অনেক হোমস্টে বা ইকো-রিসর্টের জানালা খুললেই দেখা যায় নদীর বুকে চাঁদের আলো ঝিকিমিক করছে। রাতে গর্জে ওঠা ঝোড়ো হাওয়া বা নোনা মাটির সোঁদা গন্ধ মনে করিয়ে দেয় শৈশবের গ্রামীণ স্মৃতি। মাঝে মাঝে দেখা যায় নদীর বুক চিরে এগিয়ে চলেছে ছোট্ট তালের ডিঙি নৌকা। জোছনা রাতে দাঁড় টেনে মৎস্যজীবীরা গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে রওনা হয় মাছ, কাঁকড়া বা বনের মধু সংগ্রহের পথে। এই দৃশ্যময় সৌন্দর্য যে কাউকে মুগ্ধ করে। শহুরে যান্ত্রিকতার বিপরীতে ধীর-লয়ের জীবন কলকাতার দ্রুতগামী জীবনযাত্রায়, যেখানে মানুষ প্রায় পায়ে হাঁটার ফুরসতই পান না, সেখানে সুন্দরবনে সময় যেন শম্বুক গতিতে চলে। পর্যটকেরা এখানে এসে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ভুলে, হাতে এক কাপ চা নিয়ে নদীর ধারে বসে সূর্যোদয় দেখেন, যা শহরের মানচিত্রে অসম্ভব, অকল্পনীয়।
পর্যটনের নতুন ধারা: পর্যটন ব্যবসায়ীরাও এই প্রবণতা বুঝে এখন ইকো-ট্যুরিজম, হোমস্টে ও গ্রামভিত্তিক ভ্রমণকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। স্থানীয়দের কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হচ্ছে, আবার শহরের মানুষও পাচ্ছেন দূষণমুক্ত নির্জন-নিরিবিলিতে ছুটি কাটানোর সুযোগ। সুন্দরবন শুধু বাঘ বা জঙ্গল নয়, এ এক পরিপূর্ণ অভিজ্ঞতা, যেখানে প্রকৃতির কোলে ফিরে পাওয়া যায় হারিয়ে যাওয়া শান্তি, মৃদুমন্দ সুতেজ বাতাস ও মন ভরানো অনাবিল ও মনোরম দৃশ্য। এসব কারণেই শহরের কংক্রিটের জঙ্গল ছেড়ে, নোনা মাটির ঘ্রাণের টানে, ক্রমশ ভিড় জমছে সুন্দরবনে।








