দিন বদল রাত দখল
নতুন পয়গাম, কলকাতা, ১৪ আগস্ট: গতবছর ৮ আগস্ট আর.জি কর কাণ্ড ঘটেছিল। তার আগে ২০২২ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি হাওড়ার পাঁচলায় আনিস খানের হত্যাকাণ্ড এবং অতি সম্প্রতি কালিগঞ্জ বিধানসভা উপনির্বাচনে ছোট্ট কন্যাশিশু তামান্নার নিহত হওয়ার মতো মর্মন্তুদ ঘটনাগুলিকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতি তোলপাড় হয়েছে। এখনও সেসব ঘটনার কোন সুরাহা না হওয়ায় এবং দোষীরা সাজা না পাওয়ায় ফুঁসছে রাজ্যবাসী। এসব ঘটনাকে সামনে রেখে বৃহস্পতিবার কলকাতার শ্যামবাজার পাঁচমাথার মোড়ে সিপিএমের ছাত্র সংগঠন এসএফআই, গণতান্ত্রিক মহিলা সমিতি এবং যুব সংগঠন ডিওয়াইএফআই-এর ডাকে এক অভিনব প্রতিবাদ সভার আয়োজন হয়। এর নেতৃত্বে ছিলেন সারা ভারত গণতান্ত্রিক মহিলা সমিতির রাজ্য সম্পাদক কনীনিকা ঘোষ-সহ সিপিএম-এর ছাত্র ও যুব সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
এদিন রাতের অন্ধকারে মোমবাতি ও মোবাইলের আলো জ্বেলে রাস্তায় নামে বহু মানুষ। পায়ে পায়ে প্রতিবাদী মিছিল ও পদযাত্রা থেকে স্লোগান দেওয়া হয় — আনিস, অভয়া, তামান্নার খুনীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। ন্যায়বিচার সুনিশ্চিত করতে হবে। সিপিএমের উদ্যোগে আয়োজিত এদিনের প্রতিবাদী মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন তামান্নার মা ও আনিস খানের বাবা। বক্তব্য দিতে উঠে তামান্নার মা কান্না বিজড়িত কণ্ঠে গর্জে উঠে বলেন, “জানি আমার মেয়েকে কোনদিন দেখতে পাব না, কোনদিন আর তাকে ফিরে পাব না। তাই আপনাদের বলছি, আমার ছোট মেয়েকে খুনের অপরাধীদের উপযুক্ত বিচার যেন হয়। আমার মেয়ের হত্যাকারীরা যেন সাজা পায়।”
আনিস খানের বাবা বলেন,”আজ দীর্ঘ চার বছর পার করলেও আমার ছেলে আনিস খানের হত্যাকাণ্ড রহস্যময়ই থেকে গেল। আজও কোথাও থেকে সুবিচার পেলাম না। আমার ছেলের বিচারের জন্য আমৃত্যু লড়াই চালিয়ে যাব।”
হরিনাভী কালিতলা থেকে রাত ৮ টায় শুরু হয় রাত দখল কর্মসূচি। প্রতিবাদী মিছিলে পা মেলান অনেকেই। সিপিএম নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি ছিলেন আইনজীবী ফিরদৌস শামিম। গণসংগীত শিল্পীদের মুখরিত কণ্ঠস্বরে সরগরম ছিল কালিতলা থেকে হরিনাভী মোড়। জাতীয় পতাকাকে সাক্ষী রেখে শপথ নেন সবাই।
অভয়া মঞ্চের আহ্বানে কলকাতার বহু জায়গায় এদিন হয়েছে রাত দখল। গত শনিবার ৯ আগস্ট হাওড়া ব্রিজ পুরো একবেলা অবরুদ্ধ ছিল। সেদিন দুপুর পর্যন্ত কলকাতায় বাস, ট্যাক্সি কিছুই চলেনি। ফলে সাধারণ মানুষ ও অফিসযাত্রীরা পায়ে হেঁটে কর্মস্থল বা গন্তব্যস্থলে পৌঁছন অনেক কষ্ট করে। অনেকে আবার যানবাহন কিছু না পেয়ে অগত্যা ফিরে যান। এদিন নেতাজীনগর থেকে রাসবিহারী, বাঁশদ্রোণী ইত্যাদি জায়গায় জড় হন মানুষজন। গানে, কবিতায় প্রতিবাদের ভাষা ধ্বনিত হয়। মধ্যরাত পর্যন্ত চলে এই কর্মসূচি।
অন্যদিকে জলপাইগুড়ি নাগরিক সংসদের পক্ষে রাত দখল কর্মসূচিতে জলপাইগুড়ি শহরের প্রাণকেন্দ্র কদমতলা মোড়ে বিরাট জমায়েত করেন অসংখ্য মানুষ। মশাল নিয়ে ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ স্লোগানে মুখরিত করে তোলে ছাত্র-যুবরা। প্রতিবাদী মানুষেরা রাস্তায় নেমে এই ‘রাত দখল দিন বদল’ কর্মসূচিতে অংশ নেন। শুরুতে বক্তব্য রাখেন জলপাইগুড়ি সদর বালিকা বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা অপর্ণা বাগচী, জলপাইগুড়ি আনন্দচন্দ্র কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ড. হিরন্ময় বিশ্বাস, আশাকর্মী চুমকী দাস-সহ অন্যান্যরা। পাশাপাশি চলে প্রতিবাদী সংগীত, নৃত্য-সহ সাংস্কৃতিক কর্মসূচি।
জলপাইগুড়ি নাগরিক সংসদের আহ্বায়ক ডা. পান্থ দাশগুপ্ত জানান, মূলত তরুণী, যুবতী ও মহিলাদের উদ্যোগে জলপাইগুড়িতে রাত দখল কর্মসূচি চলছে। অসংখ্য মানুষ আর.জি.করকাণ্ড তথা অভয়ার হত্যাকাণ্ডের এক বছর উপলক্ষে এদিন রাস্তায় নামেন। জলপাইগুড়ির প্রতিবাদী চরিত্রকে আমরা কুর্ণিশ জানাই। অভয়ার রহস্যজনক হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে লড়াই জারি রাখতে সকলকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। রাত ১২ টায় কদমতলায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন হয়।








