ভারতীয় নাগরিক হওয়ার আগে সত্যিই কি সোনিয়া ভোটার হয়েছিলেন?
নাকি রাহুলের ‘চুপি চুপি কারচুপি’-র পাল্টা এই সাজিশ বিজেপির?
নতুন পয়গাম, দিল্লি, ১৪ আগস্ট: কংগ্রেসের প্রাক্তন হাইকমান্ড সোনিয়া গান্ধীর নাগরিকত্ব ইস্যুতে এবার নির্বাচন কমিশনকেই একপ্রকার কাঠগড়ায় তুলল বিজেপি। এই সাংবিধানিক সংস্থার অপদার্থতার প্রমাণ হিসেবে তারা দাখিল করল ১৯৮০ সালের ভোটার তালিকার অংশবিশেষ, যেখানে সোনিয়া গান্ধীর নাম রয়েছে। বিজেপির অভিযোগ, আইনত ভারতের নাগরিক হওয়ার আগেই সোনিয়া গান্ধীর নাম নাকি দেশের ভোটার তালিকায় উঠে গিয়েছিল। কীভাবে এটা সম্ভবপর হল?
বিজেপির আইটি সেলের প্রধান অমিত মালব্য এক্স হ্যান্ডেলে ভোটার তালিকার সেই ছবি দিয়ে বলেন, ৪৫ বছর আগে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আঁতাত করে সোনিয়া ভোটার হয়েছিলেন। অথচ তখন তিনি দেশের নাগরিকই হননি। তদানীন্তন নির্বাচন কমিশনের অকর্মণ্যতা ও বিজেপির হয়ে ভোটার তালিকা তৈরির মাধ্যমে ভোট চুরির যে বিস্ফোরক অভিযোগ কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী এনেছেন, বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’ যা নিয়ে সরব হয়েছে, সেদিক থেকে চোখ ঘোরাতেই বিজেপি দেশের নাগরিক হওয়ার আগে সোনিয়ার নাম ভোটার তালিকায় উঠে যাওয়ার প্রসঙ্গটি তুলেছে।
অমিত মালব্যের এই পোস্টের পর বিজেপি নেতা অনুরাগ ঠাকুর সাংবাদিক সম্মেলন করে কংগ্রেস–নির্বাচন কমিশন অশুভ আঁতাতের অভিযোগ তুলে বলেন, অনুপ্রবেশকারীদের ভোটার করিয়ে কংগ্রেস ও অন্য বিরোধীরা বরাবর নির্বাচন জিতে এসেছে। উত্তর প্রদেশের রায়বেরিলিতে রাহুল গান্ধী, পশ্চিমবঙ্গের ডায়মন্ড হারবার কেন্দ্রে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ও উত্তর প্রদেশের কনৌজে অখিলেশ যাদবের আসনে ভোটার তালিকায় নানাবিধ কারচুপির উল্লেখও করেন অনুরাগ।
অন্যদিকে, নাগরিক হওয়ার আগে সোনিয়ার ভোটার হওয়ার যে ‘প্রমাণ’ গেরুয়া শিবিরের আইটি জায়ান্ট অমিত মালব্য তুলে ধরেছেন, তাতে দেখা যাচ্ছে, ১৯৮০ সালের ভোটার তালিকায় নিউ দিল্লি লোকসভা আসনের সফদরজং রোড এলাকার ১৪৫ নম্বর পোলিং স্টেশনের ৩৮৮ নম্বর ভোটারের নাম সোনিয়া গান্ধী। এক্স হ্যান্ডেলে দেওয়া ওই নথি অনুযায়ী, ৩৮৫ নম্বর ভোটারের নাম ইন্দিরা গান্ধী। এরপর যথাক্রমে রাজীব গান্ধী, সঞ্জয় গান্ধী, এবং মানেকা গান্ধীর নাম রয়েছে। এসব নিয়ে যদিও আপত্তি নেই। আপত্তি কেবল ইতালীয় বংশোদ্ভূত রাজীব পত্নী সোনিয়াকে নিয়ে।
বিজেপির অভিযোগ, ১৯৬৮ সালে রাজীব গান্ধীর সঙ্গে বিয়ে হলেও ১৯৮০ সালে সোনিয়া ভারতের নাগরিক ছিলেন না। অথচ তাঁর নাম ভোটার তালিকায় তোলা হয়েছিল। ১৯৮২ পর্যন্ত তাঁর নাম ওই তালিকায় ছিল। অথচ সোনিয়া নাগরিকত্ব নেন ১৯৮৩ সালে। এই তথ্য হাজির করে অমিত মালব্য লিখেছেন, স্পষ্টতই এটি আইনের লঙ্ঘন। ভোটার হতে হলে নাগরিক হওয়া জরুরি। ১৯৮২ সালে বিতর্ক ও সমালোচনার পর সোনিয়ার নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। পরের বছর ১৯৮৩ সালে ফের তাঁর নাম ভোটার তালিকায় তোলা হয়। সেখানেও অসংগতি ছিল বলে অমিতের দাবি। তার অভিযোগ, ১৯৮৩ সালের ১ জানুয়ারির আগে নাগরিক হওয়া ব্যক্তিদের নামই ভোটার তালিকায় ওঠার কথা। অথচ সোনিয়া নাগরিকত্ব পান ওই বছরের এপ্রিল মাসে।
রাহুল গান্ধী ‘অকর্মণ্যতা’ ও শাসক বিজেপির হয়ে ‘চুপি চুপি কারচুপি’ বা ‘ভোট চুরি’র অভিযোগে নির্বাচন কমিশনকে কাঠগড়ায় তুলেছেন। তারই পাল্টা অমিত মালব্য অভিযোগ করেছেন একদা কংগ্রেস-নির্বাচন কমিশনের যোগসাজশ নিয়ে। বিজেপির এই দাবির পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় বিহারের কংগ্রেস নেতা তারিক আনোয়ার বলেন, সোনিয়া গান্ধী কোনদিনই ভোটার তালিকায় তাঁর নাম তোলার জন্য অনুরোধ করেননি। নির্বাচন কমিশনের তৎকালীন কর্মকর্তারাই উদ্যোগী হয়ে তা করেছিলেন। নির্বাচন কমিশন স্বাধীন ও সাংবিধানিক সংস্থা। সে সময় কমিশনের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ছিল। অথচ আজ তা বিজেপির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। বিজেপির স্বার্থে ভোট চুরি করছে নির্বাচন কমিশন। এসআইআর-এর অছিলায় নিবিড় সংশোধনের নাম করে শুধু বিহারেই ৬৫ লক্ষ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে কমিশন। বাদ পড়াদের অধিকাংশই বিরোধী দলগুলোর সমর্থক বা দলিত, অনগ্রসর, তপশিলী, আদিবাসী এবং সংখ্যালঘু।
এদিকে, রাহুল গান্ধীর আনা বিস্ফোরক অভিযোগের জবাব আজও দেয়নি জাতীয় নির্বাচন কমিশন। আজও তারা উদ্যোগী হয়ে অভিযোগের তদন্তের নির্দেশ দেয়নি; উল্টে রাহুলকেই হলফনামা দিয়ে অভিযোগ দায়ের করতে বলেছে। বিরোধীরা পুরো বিষয়টিকে নির্বাচনের নামে প্রহসন এবং বিজেপি-কমিশন অশুভ আঁতাত বলে অভিহিত করেছে।








