থেমে নেই মানবিকতার লড়াই – বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জীবনে আলো জ্বালাচ্ছেন রামপুরহাটের শিক্ষিকা বর্ণালী রুজ
খান সাহিল মাজহার, বীরভূম: শারীরিক অসুস্থতা অনেক সময় মানুষের জীবনের গতি থামিয়ে দেয়। কিন্তু সেই প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করে অন্যের জীবনে আলো জ্বালানোর উদাহরণ খুব কমই দেখা যায়। বীরভূমের রামপুরহাট গার্লস হাই স্কুলের শিক্ষিকা শ্রীমতি বর্ণালী রুজ সেই বিরল মানুষের একজন, যিনি নিজে দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হয়েও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের পাশে দাঁড়িয়ে মানবতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
বিদ্যালয়ে পাঠদান করতে গিয়ে তিনি লক্ষ্য করেন, অনেক ছাত্রী বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক সমস্যার কারণে স্বাভাবিক পড়াশোনা ও সামাজিক জীবনে পিছিয়ে পড়ছে। তাদের অনেকেই মেন্টাল রিটার্ডেড, সেরিব্রাল পালসি কিংবা হিয়ারিং ইম্পিয়ারমেন্টের মতো সমস্যায় ভুগছে। এই শিশুদের অবস্থা তাঁর মনে গভীরভাবে নাড়া দেয়। এরপর তিনি সিদ্ধান্ত নেন, শুধু সহানুভূতি নয়, তাদের উন্নতির জন্য কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
এই লক্ষ্যেই তিনি নিজেকে বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত করেন, যাতে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের সমস্যা বুঝে তাদের যথাযথ সহায়তা করতে পারেন। বিদ্যালয়ের পাঠদানের পাশাপাশি তিনি ওইসব শিশুদের আলাদাভাবে সময় দিতে শুরু করেন। শুধু স্কুলেই সীমাবদ্ধ থাকেননি তিনি; স্কুলের বাইরে গিয়েও বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিশুদের অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলেন, তাদের সমস্যার কথা শোনেন এবং কীভাবে সন্তানদের আরও ভালোভাবে গড়ে তোলা যায় সে বিষয়ে পরামর্শ দেন।
বর্ণালী রুজ মনে করেন, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জীবনে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো আত্মবিশ্বাস ও সমাজের গ্রহণযোগ্যতা। সেই লক্ষ্যেই তিনি তাদের সক্ষমতা অনুযায়ী বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছেন। তাঁর উদ্যোগে শিশুদের শেখানো হচ্ছে বাগান করা, কাঁথা স্টিচের সেলাই, শালপাতা তৈরি, ফিনাইল প্রস্তুত করা সহ বিভিন্ন ব্যবহারিক কাজ। এর ফলে শিশুদের মধ্যে ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস তৈরি হচ্ছে এবং তারা জীবনের প্রতি নতুন করে আগ্রহ খুঁজে পাচ্ছে।
এই উদ্যোগে বিভিন্ন সমাজসেবী ব্যক্তি ও উৎসাহী সংগঠনও তাঁর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। হোম এবং স্পাসটিক সোসাইটির প্রায় একশোটি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে তিনি তাদের উন্নতির জন্য কাজ করে চলেছেন। শিশুদের মুখে হাসি ফুটতে দেখাই তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি বলে মনে করেন তিনি। তাঁর এই মানবিক উদ্যোগে প্রশাসনিক স্তর থেকেও সহযোগিতা মিলেছে। জেলা শিশু সুরক্ষা আধিকারিক (District Child Protection Officer) তাঁর কর্মকাণ্ডে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন এবং এই কাজকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে বিভিন্নভাবে সহায়তা করছেন।
শিক্ষা ও সমাজসেবায় অসামান্য অবদানের জন্য বর্ণালী রুজ ইতিমধ্যেই একাধিক সম্মাননা অর্জন করেছেন। ২০১৯ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে শিক্ষাক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য তিনি “শিক্ষারত্ন” পুরস্কারে সম্মানিত হন। ২০২০ সালে আন্তর্জাতিক স্তরে তাঁর লেখনী দক্ষতার স্বীকৃতি হিসেবে তিনি Best Essayist Award লাভ করেন। এছাড়াও ২০২৩ সালে সামাজিক কাজকর্মে বিশেষ অবদানের জন্য ভারত সরকারের নীতি আয়োগ তাঁকে National Excellence Award প্রদান করে সম্মানিত করেছে।
শুধু শিক্ষকতা নয়, সাহিত্যচর্চাতেও তিনি সমানভাবে সক্রিয়। তাঁর লেখা বেশ কয়েকটি গ্রন্থ ইতিমধ্যেই পাঠকমহলে প্রশংসা কুড়িয়েছে। তাঁর উল্লেখযোগ্য বইগুলির মধ্যে রয়েছে “নক্ষত্রকথা”, “বিবিধ পারিজাত” এবং “অন্তহীন সুখের সন্ধানে”। এই বইগুলির মাধ্যমে তিনি জীবনের নানা অনুভূতি, মানবিক মূল্যবোধ এবং সমাজের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন। নিজের অসুস্থতা ও ব্যক্তিগত সংগ্রামের মাঝেও সমাজের অবহেলিত ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য যে নিষ্ঠা ও ভালোবাসা নিয়ে কাজ করে চলেছেন বর্ণালী রুজ, তা নিঃসন্দেহে সমাজের কাছে এক বিরল অনুপ্রেরণা। তাঁর এই নিরলস প্রচেষ্টা প্রমাণ করে দেয়- মানুষ যদি সত্যিই অন্যের জন্য কিছু করতে চায়, তবে কোনো বাধাই তাকে থামিয়ে রাখতে পারে না।








