আদ্রায় ‘বিনা পয়সার বাজারে’ উপচে পড়া ভিড়, হাসি ফিরল অসংখ্য মুখে
নতুন পয়গাম, পুরুলিয়া: মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত গড়ে শুক্রবার উদ্বোধন হল পুরুলিয়া জেলার রেল শহর আদ্রার ১৬ তম ‘বিনা পয়সার বাজার’। আদ্রা হাতি পার্কের মালঞ্চ মুক্ত মঞ্চের সামনে তিন দিনব্যাপী এই ব্যতিক্রমী সামাজিক উদ্যোগ ইতিমধ্যেই সাধারণ মানুষের কৌতূহল ও অংশগ্রহণে রীতিমতো উৎসবের আবহ তৈরি করেছে। উদ্বোধনের প্রথম দিন থেকেই চোখে পড়েছে আম আদমির ভিড়, সঙ্গে গ্রামাঞ্চল থেকে আসা অসংখ্য মানুষের উচ্ছ্বাস।
এ বছরের বাজারের মূল স্লোগান ছিল, “আপনার অপ্রয়োজনীয় জিনিস দিয়ে যান ও আপনার প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে যান।” কথায় নয়, কাজে সেই বার্তাকেই বাস্তব রূপ দিয়েছে আয়োজক সংগঠন ‘দ্য ফ্রি থিংকিং হিউম্যানিস্টস, আদ্রা’। সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ নিজেদের ঘরের অপ্রয়োজনীয় অথচ ব্যবহারযোগ্য জিনিস এনে জমা করেছেন এই বাজারে। সেই সব সামগ্রীই আবার অন্য কারও প্রয়োজন মিটিয়ে তুলছে হাসির কারণ হয়ে।
উত্তর প্রদেশের প্রয়াগরাজ থেকে শুরু করে কলকাতা, ঘাটাল, আসানসোল, কাজোড়া, পুরুলিয়া, রঘুনাথপুর এবং আদ্রা সহ বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সংগঠনের শুভানুধ্যায়ীরা নানা ধরনের জিনিস পাঠিয়েছেন। এই সহযোগিতার পরিধি দেখেই স্পষ্ট, মানবিকতার কোনও ভৌগোলিক সীমানা নেই।
প্রথম দিনেই নিকটবর্তী গ্রামগুলির বহু দরিদ্র পরিবার এসে প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ করেছেন বিনামূল্যে। শিশুদের জন্য ছিল জামাকাপড়, খেলনা, স্কুল ব্যাগ, টিফিন বক্স, জুতো, মোজা। বড়দের জন্য রাখা হয়েছে শার্ট, প্যান্ট, গরম পোশাক, মাফলার, সোয়েটার, শাড়ি, কুর্তি এবং ব্যবহারযোগ্য বাসনপত্র। বাজারের প্রতিটি স্টল অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও আকর্ষণীয়ভাবে সাজানো, যাতে আগত মানুষ সহজেই নিজের প্রয়োজনীয় জিনিস বেছে নিতে পারেন।
সকাল ১০টা থেকে দুপুর ৩টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত বাজার খোলা থাকছে। ফলে কর্মব্যস্ত মানুষ থেকে শুরু করে গ্রামীণ এলাকার বাসিন্দারাও সুবিধামতো সময়ে এসে অংশ নিতে পারছেন। বাজার ঘিরে শিশুদের কোলাহল, প্রবীণদের কৃতজ্ঞ দৃষ্টি এবং স্বেচ্ছাসেবকদের নিরলস পরিশ্রম মিলিয়ে এক মানবিক উৎসবের আবহ তৈরি হয়েছে গোটা এলাকায়।
সংগঠনের কর্ণধার সত্যজিৎ চ্যাটার্জী জানান, এই উদ্যোগ কোনও একক প্রচেষ্টার ফল নয়, বরং অসংখ্য মানুষের সহযোগিতায় গড়ে ওঠা এক সামাজিক আন্দোলন। তাঁর কথায়, মানুষের ঘরে পড়ে থাকা অপ্রয়োজনীয় জিনিসই অন্য কারও জীবনে প্রয়োজনের সম্পদ হয়ে উঠতে পারে, এই ভাবনাকেই বাস্তবায়িত করাই তাঁদের লক্ষ্য। আগামী বছরগুলিতে এই ‘বিনা পয়সার বাজার’ আরও বড় আকারে আয়োজনের পরিকল্পনাও রয়েছে বলে জানান তিনি।
আদ্রার এই উদ্যোগ আবারও প্রমাণ করল, সহমর্মিতা ও ভাগ করে নেওয়ার সংস্কৃতি এখনও সমাজের গভীরে বেঁচে আছে। যেখানে অর্থ নয়, প্রয়োজনই হয়ে ওঠে বিনিময়ের মুদ্রা, সেখানে মানবিকতার জয় অনিবার্য। তিন দিনের এই বাজার যেন এক নীরব বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছে, সমাজ বদলায় বড় ঘোষণায় নয়, বদলায় ছোট ছোট হাতে ধরা সাহায্যের উষ্ণতায়।








