কেরালার আদালতে নতুন অধ্যায় রচিত দৃষ্টিহীন তরুণী বিচারক গড়লেন নজির
নতুন পয়গাম, তিরুবনন্তপুরম: দৃষ্টি নেই, তবু দৃষ্টিভঙ্গি অটুট। জন্ম থেকেই চোখে আলো না থাকলেও স্বপ্ন দেখার শক্তিকে কোনো দিন নিভতে দেননি কেরালার ২৪ বছরের আইনজীবী থন্যা নাথন সি। সেই অদম্য জেদের ফলেই এবার ইতিহাসের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে তিনি। কেরালা জুডিশিয়াল সার্ভিস পরীক্ষায় বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করে তিনি রাজ্যের প্রথম সম্পূর্ণ দৃষ্টিহীন মহিলা সিভিল জজ হিসেবে নিয়োগ পেতে চলেছেন। রাজ্যজুড়ে এই সাফল্যকে ঘিরে ইতিমধ্যেই উচ্ছ্বাসের ঢেউ উঠেছে আইন মহল থেকে সাধারণ মানুষের মধ্যে।
থন্যার এই যাত্রাপথ মোটেই সহজ ছিল না। জন্মগত দৃষ্টিহীনতা তাঁর শৈশবকে অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি কঠিন করে তুলেছিল। পড়াশোনার প্রতিটি ধাপে লড়াই ছিল সঙ্গী। তবু পরিবার ও শিক্ষকদের উৎসাহ, সঙ্গে নিজের অদম্য মনোবল তাঁকে এগিয়ে নিয়ে যায়। ব্রেইল পদ্ধতিতে বই পড়া, আধুনিক স্ক্রিন রিডিং সফটওয়্যারের সাহায্যে নথি বোঝা এবং ডিজিটাল প্রযুক্তিকে নিজের অস্ত্র বানিয়ে তিনি আইন শিক্ষার প্রতিটি স্তর সফলভাবে অতিক্রম করেন।
কান্নুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনশাস্ত্রে স্নাতক হওয়ার পর পেশাগত জীবনেও থেমে থাকেননি তিনি। আদালতের জটিল নথি, যুক্তি, ধারাবিবরণী সবই প্রযুক্তির সহায়তায় আয়ত্তে এনে নিয়মিত আইনচর্চা চালিয়ে গিয়েছেন। সহকর্মীরা বলেন, যুক্তি উপস্থাপনের সময় তাঁর আত্মবিশ্বাস এবং স্পষ্ট চিন্তাধারা অনেক সময় দৃষ্টিসম্পন্ন আইনজীবীদেরও পিছনে ফেলে দেয়।
২০২৫ সালে সুপ্রিম কোর্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ রায় এই সাফল্যের পথ আরও সুগম করে। সেই রায়ে স্পষ্ট জানানো হয়, শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে কোনো যোগ্য প্রার্থীকে বিচার বিভাগীয় চাকরি থেকে বঞ্চিত করা সংবিধানের সমতার মূলনীতির পরিপন্থী। আইনি সেই স্বীকৃতি থন্যার মতো বহু প্রতিভাবান তরুণ তরুণীর কাছে নতুন দরজা খুলে দেয়।
এই একই পরীক্ষায় সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত আর এক প্রার্থী জয়সন সাজন বিশেষ মেধা তালিকায় দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছেন। ফলে এবারের কেরালা জুডিশিয়াল সার্ভিস পরীক্ষা শুধু ফলাফলেই নয়, সামাজিক বার্তাতেও বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, থন্যা নাথনের এই সাফল্য কেবল ব্যক্তিগত জয় নয়, এটি দেশের বিচারব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্তিমূলক চিন্তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। দীর্ঘদিন ধরে বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষেরা যে অদৃশ্য প্রাচীরের মুখোমুখি হতেন, এই নিয়োগ সেই প্রাচীরে প্রথম বড় ফাটল ধরাল বলেই মনে করছেন অনেকে।
সামাজিক মাধ্যমেও থন্যার গল্প এখন অনুপ্রেরণার প্রতীক। অসংখ্য তরুণ তরুণী তাঁর সাফল্যকে নিজের স্বপ্নপূরণের সাহস হিসেবে দেখছেন। চোখে আলো না থাকলেও মননের আলো যে সমাজকে আলোকিত করতে পারে, থন্যা নাথন সি তারই জীবন্ত উদাহরণ হয়ে উঠছেন।








