খিদে, আগুন আর ভাঙনের কাব্যভূমি– অভীক মজুমদারের কবিতাভাষা
নতুন পয়গাম, কলকাতা: কবি ও অধ্যাপক অভীক মজুমদারের কাব্যগ্রন্থ ‘খিদে হাতে হেঁটেছি অনেক’ পাঠককে একাধিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায় এবং গভীর ভাবনার স্রোতে ডুবিয়ে দেয়। কয়েকটি লাইনে এই বইকে বেঁধে ফেলা কঠিন। তিনটি খণ্ড— নগর দরিয়া, একপলক খণ্ডকাল অনন্ত এবং বাসনায় আগুন দে রে—এই গ্রন্থকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে। প্রতিটি কবিতাই স্বতন্ত্র বিশ্লেষণের দাবি রাখে। স্বপ্নময় ও বেদনাবিধুর অনুভব, অতীত ও বর্তমানের দ্বন্দ্ব, স্মৃতি ও সত্তা, চেতন ও অবচেতনের মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা এই কবিতাগুলি এক অশরীরী অথচ তীব্র অস্তিত্বের ভাষ্য। এই কবিতার অলিগলিতে ঘুরতে ঘুরতে পাঠক ফিরে যান শৈশবের তর্ক, নিরীহ বিস্ময় আর অতীতের ঝড়ে। সভ্যতার বিস্মরণ, মানুষ ও পরিবেশের রূপান্তর, জ্ঞানের আলো নিভে যাওয়ার আক্ষেপ—সবই কবিতার শরীরে। রাজনীতি ও রাষ্ট্রনীতি নিয়ে কবির প্রশ্ন স্পষ্ট; বিচারব্যবস্থাকেও তিনি ন্যায়ের কাঠগড়ায় দাঁড় করান—
“মুহুরি পেশকার থেকে বিচারক আদালত নেতানেত্রী সকলেই
অর্থ থেকে নীতি মুছে,
রক্তাক্ত তোয়ালেগুলি স্রোতে ভাসিয়েছে।”
শিরোনামহীন কবিতাগুলি দাবানলের মতো এগিয়ে যায়। সেই আগুনে পুড়ে যায় কবিতার চেনা ফর্ম, আঙ্গিক, স্মৃতি, চেতন-অবচেতন—
“পোড়েন জনক। পোড়ে বাক্য, ছন্দ, যতি,
পোড়ে ধ্বন্যালোক।”
নতুন স্বরে কথা বলতে বলতে কবি পাঠকের সামনে রেখে যান অন্য কবিদের কবিতা—রেফারেন্সের মতো। লালন থেকে রবীন্দ্রনাথ, শক্তি চট্টোপাধ্যায় থেকে সুধীন্দ্রনাথ, জাঁ জেনে কিংবা জীবনানন্দ—এই ঝটিকা সফরে প্রায় সকলেই উপস্থিত। কবিতার ভেতর কবিতার এই বিস্ময়কর ব্যবহারে পাঠক অবাক না হয়ে পারেন না।
“গানটা কি বুঝতে পারছো? ‘শ্যামা’ বলার পর,
দু-সেকেন্ড থেমে, তবে ‘মায়ের পায়ে’…
লিখে এসব বোঝানো যাবে না।”
সত্যিই, লিখে বোঝানো যায় না—কোন নীরবতার মহাবিশ্বে কবি পাঠককে পৌঁছে দেন।
পরিচিত কবিতার ফর্মকে ভেঙেচুরে কবি একেবারে শেষ করে দেন। নতুন ফর্মে কবিতা লিখেছেন—এ কথায় নতুনত্বের ঠিকানা ধরা পড়ে না। তুলনামূলক সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে তাঁর পাণ্ডিত্যের ছাপ কবিতায় স্পষ্ট। বিষয় থেকে বিষয়ান্তর, আচমকা সন্ধ্যা নামার অনুভব, অগ্রজ কবিদের প্রতি কৃতজ্ঞতা—সবই ছড়িয়ে আছে কবিতার পরতে পরতে। উদ্ধৃতিগুলি পাঠকের শ্রম খানিক লাঘব করে, গবেষকদেরও। ফর্ম নয়, যেন কবি নিজেকেই ভেঙেচুরে কবিতার জন্য তৈরি করেছেন। হয়তো এই ভাঙাচোরা অবস্থাতেই নিজেকে প্রকাশের একমাত্র পথ খুঁজে পেয়েছেন—তাই তাঁকে ‘খিদে হাতে’ এতটা হাঁটতে হয়েছে।এই বইয়ের জন্য অভীক মজুমদার সম্ভবত বাচিক শিল্পীদের বিরাগভাজন হবেন। কারণ তাঁর কবিতা মঞ্চে পাঠের জন্য সহজ-সুস্বাদু নয়। আখ্যানধর্মী কবিতাগুলিতে একটি নয়, বহু ছবি—চর্মচক্ষে পড়া ছাড়া এগুলিকে মগজস্থ বা হৃদয়ঙ্গম করা কঠিন। পড়া নয়, যেন সহ্য করা। গোটা বইটি আসলে চেতনার ল্যান্ডস্কেপে একটি পোস্টমডার্ন মনোলগ—কবির সততা ও উদ্বেগের আগ্নেয়াস্ত্র। জাদু ও গোপন সাধনার মিলনে গড়ে ওঠা এক ধ্রুপদী বিনির্মাণ, আত্ম-অন্বেষণের নিরন্তর প্রয়াস—
“আত্মজীবনীর খসড়া।
এভাবে কবিতা লেখা সহজ ভেবেছো?
বিরাট ভ্যান্তাড়া।”
— উজ্জ্বল হালদার








