বিশ্বের একমাত্র হাতে লেখা সংবাদপত্র ‘দ্য মুসলমান’! টানা ৯৪ বছর ধরে চেন্নাই থেকে প্রকাশিত হয়ে চলেছে।
নতুন পয়গাম: একটানা ৯৪ বছর ধরে তামিলনাডুর রাজধানী শহর চেন্নাই থেকে প্রকাশিত হয়ে চলেছে উর্দু দৈনিক ‘দ্য মুসলমান’। এটি বর্তমানে বিশ্বের একমাত্র হাতে লেখা সংবাদপত্র। ১৯২৭ সালে প্রথম প্রকাশের সময় যেমনটা ছিল অবিকল সেভাবেই এখনও নিয়মিতভাবে প্রকাশিত হয়ে আসছে এই পত্রিকাটি।
১৯২৭ সালে দেশ যখন ইংরেজদের অধীনে, সাইয়্যেদ আজাতুল্লাহ তখন বসবাস করতেন দক্ষিণ ভারতের মাদ্রাজে। তিনি ছিলেন শিক্ষিত ব্যক্তি। হিন্দি, উর্দু আর ফারসী ভাষায় দারুণ দক্ষতা ছিল তার। তিনিই প্রথম অনুভব করেন, মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র একটা পত্রিকা থাকা খুব দরকার, যেখানে মুসলমানদের সমস্যা, সংকট, চ্যালেঞ্জ, দাবি-দাওয়াগুলো উঠে আসবে, তাদের বঞ্চনার কথা লেখা হবে, যেখানে ধর্ম আর ধর্মীয় বিষয়াদি সম্পর্কে লিখবেন পণ্ডিতরা। সেই ভাবনা থেকেই হাতে লেখা সংবাদপত্র হিসেবে সেবছর যাত্রা শুরু হল ‘দ্য মুসলমান’-এর।
৯২ বছরে অনেক কিছুই বদলে গেছে, কিন্তু ‘দ্য মুসলমান’ বদলায়নি, সরে আসেনি তার প্রাচীন অবস্থান থেকে। একই ধারা বজায় রেখেছে পত্রিকাটি। বংশানুক্রমে এই পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন সাইয়্যেদ বংশের উত্তরসূরীরাই। আজাতুল্লহার মৃত্যুর পর সম্পাদকের দায়িত্ব নিয়েছিলেন তার ছেলে সাইয়্যেদ ফাজলুল্লাহ। ২০০৮ সালে ফাজলুল্লাহ’র মৃত্যু হলে তার একমাত্র সন্তান এবং সাইয়্যেদ আজাতুল্লাহ’র নাতি সাইয়্যেদ আরিফুল্লাহ পান সম্পাদকের দায়িত্ব। তারপর থেকে এই দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।
‘দ্য মুসলমান’ পত্রিকাটির মূল আকর্ষণ এর অসাধারণ ক্যালিগ্রাফি। খবর সাজানোর পাশাপাশি রঙ, তুলির বৈচিত্র্যে নানা ক্যালিগ্রাফি ফুটিয়ে তোলার কাজ করেন তিনজন ‘কাতিব’। রং আর বিভিন্ন কলম ও তুলি দিয়ে লেখা হয় শিরোনাম ও ছবির ক্যাপশন। তবে এখানে কোন খবরেরই বাইলাইন নেই।
চার পাতার কাগজের প্রথম পাতায় থাকে দেশ ও বিদেশের খবর। দ্বিতীয় পাতায় শুধুমাত্র সম্পাদকীয়। পরের পাতা দু’টিতে স্থানীয় খবর ও বিজ্ঞাপন। সম্পাদক সাইয়্যেদ আরিফুল্লাহ জানিয়েছেন, ব্রেকিং নিউজ সাধারণত এই দৈনিকে প্রকাশিত হয় না। কারণ এজন্য অনেক সময়, পরিশ্রম ও লোকবলের প্রয়োজন। মূলত সমাজের নানা বিষয়ের উপরই জোর দেওয়া হয় এই সংবাদপত্রে। ইসলামভিত্তিক খবর প্রথম পছন্দ হলেও সবরকম পাঠকের জন্যই খবর থাকে।
চেন্নাইয়ের ট্রিপলিকেন হাই রোডে দু’কামরার ছোট্ট দু’টি ঘরে প্রথম কাজ শুরু হয় ‘দ্য মুসলমান’-এর। চার পাতার কাগজটির সব খবর সাজিয়ে দেন আরিফুল্লাহ। এরপর রঙ-তুলি দিয়ে ক্যালিগ্রাফির কাজ শুরু করেন মুখ্য ‘কাতিব’ রহমান হোসেইনি। ১৯৮০ সালে তিনি এই পত্রিকার কাজে যোগ দেন। তারপর থেকে টানা ৪৫ বছর ধরে নিরলসভাবে শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর বেতন ২৫০০ টাকা। খবর লেখার দায়িত্বে রয়েছেন শাবানা ও খুরশিদ বেগম। প্রতিটি পাতা সাজানোর জন্য দিনে ৬০ টাকা করে বেতন পান তাঁরা।
দৈনিকের কাজ শুরু হয় সকাল ১০টা থেকে। দু’জন অনুবাদক খবরগুলো উর্দু ভাষায় লিখে দেন। ঘণ্টা দু’য়েক ধরে অনুবাদের কাজ চলে। তারপর ক্যালিগ্রাফি ও লেখার কাজ শুরু করেন তিন ‘কাতিব’। সন্ধ্যার মধ্যে খবরের কাগজ পৌঁছে যায় প্রায় ২২ হাজার পাঠকের হাতে। চেন্নাই ছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে আছে এই পত্রিকার গ্রাহক। দূরের পাঠকদের ডাকের মাধ্যমে পত্রিকা পৌঁছে দেয়া হয়।
চার পৃষ্ঠার এই সংবাদপত্রটির দাম মাত্র ৭৫ পয়সা। সাইয়্যেদ পরিবারের আয়ের মূল উৎস হচ্ছে প্রেসের ব্যবসা। এছাড়া পত্রিকায় আসা বিজ্ঞাপন থেকেও কিছু আয় হয়। ‘দ্য মুসলমান’ কোন বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে প্রকাশিত হয় না, মুসলমানদের একটা স্বতন্ত্র সংবাদপত্রের প্রয়োজনীয়তা থেকে দাদা সাইয়্যেদ আজাতুল্লাহ যে কার্যক্রম শুরু করেছিলেন, বংশ পরম্পরায় সেটা টিকিয়ে রেখেছেন উত্তরসূরীরা। ঐতিহ্যের সাথে তারা ব্যবসাকে মেলাতে চান না।
যুগের সাথে তাল না মিলিয়ে সকল প্রতিকূলতা পার করে প্রকাশিত হয়ে যাচ্ছে সম্পূর্ণ হাতে লেখা এই সংবাদপত্র। করোনার প্রকোপও এই পত্রিকাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। এই পত্রিকার প্রথম সংখ্যা উদ্বোধন করেছিলেন জাতীয় কংগ্রেসের অন্যতম নেতা ও মাদ্রাজ সেশনের সভাপতি মুখতার আহমেদ আনসারি।
রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, খেলার সংবাদ প্রায় সব খবরই তারা সংগ্রহ করেন।
মূলত স্প্রেডশিটে প্রকাশিত পত্রিকাটি ভাজ করে চার পাতার পত্রিকা প্রকাশিত হয়। তৃতীয় পাতায় থাকে কুরআনের আয়াত। একদম শেষ পৃষ্ঠায় বিজ্ঞাপন, স্থানীয় সংবাদসহ প্রায় সকল ধরনের সংবাদ প্রকাশিত হয়ে থাকে। পত্রিকাটি কুইল কলম ও কালিতে লেখা হয়।
এক পাতা লিখতেই একজন ক্যালিগ্রাফারের সময় লাগে প্রায় দুই ঘণ্টা। যদি কোনো ভুলও হয় তবুও পুরো পাতার কাজটিই নতুন করে করতে হয়। তারপর লিখিত কপিটি নেগেটিভে রূপান্তরিত করে সেখান থেকে পত্রিকাটি সরাসরি প্রিন্টিংয়ে পাঠানো হয়। পুরো পত্রিকাটি সাদা ও কালো হরফে সাজানো থাকে। রঙিন ডিজিটাল যুগেও এই সাদা-কালো সংবাদপত্রের চাহিদা এখনও কমেনি।








